ওয়েবডেস্ক: আর কয়েক দিন পরেই ভোট দেবে গুজরাত। সাম্প্রতিক ইতিহাসে কোনো বিধানসভা নির্বাচনকে নিয়ে এত চর্চা হয়নি যেটা হচ্ছে গুজরাতকে নিয়ে। পাতিদার আন্দোলন এবং বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে বেশ চাপে পড়েছে বিজেপি। অন্য দিকে পাতিদার নেতা হার্দিক পটেল, দলিত নেতা জিজ্ঞেস মেবানি এবং ওবিসি নেতা অল্পেশ ঠাকুরকে পাশে পেয়ে উজ্জীবিত কংগ্রেস।

গুজরাতে বিজেপির গদি টলমল, এই আন্দাজ করে আগ্রাসী প্রচারের পথ বেছেছেন রাহুল গান্ধী। অন্য দিকে বিজেপি প্রচারের জন্য সারা দেশ থেকেই নিজেদের ‘হেভিওয়েট’দের নিয়ে আসছেন। কখনও প্রধানমন্ত্রী শুধুমাত্র গুজরাতি ভাষণ দিচ্ছেন তো কখনও হিন্দুত্বের জিগির তুলে গরম গরম ভাষণ দিচ্ছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। পালটা দিচ্ছে কংগ্রেসও। ভোট প্রচারে বিভিন্ন মন্দির ঘুরছেন রাহুল গান্ধী। নিজেকে শিবভক্ত হিন্দু বলেও দাবি করেছেন।

এই সব হল গুজরাত নির্বাচনের ওপরের ছবিটা, যেটা জাতীয় মিডিয়ায় খবর হচ্ছে। যেটা খবর হচ্ছে না, তা হল ভেতরের ব্যাপারস্যাপার। এখানে কিন্তু বিজেপির সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিচ্ছে কংগ্রেস, অন্তত প্রচারে। যতই রাহুল সভা করে যাক, তাদের সেরা বাজি এখন ৫১ বছরের কংগ্রেস নেতা ইন্দ্রনীল রাজগুরু। বর্তমান কংগ্রেস বিধায়ক এই ইন্দ্রনীলকে দিয়েই বিজয় রুপানির কাঁটা তুলতে চাইছে কংগ্রেস।

তাই কংগ্রেসের কাছে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ রাজকোট পূর্ব আসনটি ছেড়ে রাজকোট পশ্চিম আসনটিতে দাঁড়িয়েছেন তিনি, গত তিন দশকে যে আসনে অপ্রতিরোধ্য বিজেপি। পাঁচ বছর আগের নির্বাচনে রাজকোট পূর্ব আসনে জিতেই বিধায়ক হয়েছেন রাজগুরু।

গুজরাতের সব থেকে বৃহত্তম বিধানসভা আসন রাজকোট পশ্চিম। এখানে ভোটার তিন লক্ষেরও বেশি। যার মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার পটেল রয়েছেন। ব্রাহ্মণের সংখ্যা ২৫,০০০। ৩৫,০০০ ক্ষত্রিয় এবং ২৫,০০০ বানিয়া রয়েছেন। এ ছাড়াও জৈন সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যাও প্রায় দশ হাজার। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা এই আসনের বর্তমান বিধায়ক রুপানি একজন জৈন কিন্তু রাজগুরু একজন ব্রাহ্মণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্দিক পটেলের আন্দোলনের ফলে পটেলদের দশ থেকে পনেরো শতাংশ ভোট কংগ্রেসের দিকে যেতে পারে।

দুই যুযুধান নেতার চরিত্রেও ফারাক বিস্তর। এক দিকে রাজগুরু যেখানে নিজেকে আগ্রাসী, শক্তিশালী এবং ‘মাচো’ হিসেবে তুলে ধরছেন, সেখানে রুপানির চরিত্র নিতান্তই সাদামাঠা। এক দিকে রাজগুরুকে দেখে মনে হয় নিজের দলের থেকেও বড়ো তিনি, অন্য দিকে নিজেকে মোদী এবং অমিত শাহের ছত্রচ্ছায়ায় রেখেছেন রুপানি। দুই নেতার এই চারিত্রিক ফারাক নিজেদের প্রচারেও ফুটে উঠছে।

BJP
বিজেপির পোস্টার। এখানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ছবিই নেই।

এক দিকে কংগ্রেসের পোস্টারে শুধুমাত্র রাজগুরুর ছবি ছাড়া অন্য কারও ছবি নেই, অন্য দিকে রুপানির পোস্টারে অন্তত চার জনের ছবি দেখা যায়। মোদী, অমিত শাহ, বিজেপির রাজ্য সভাপতি জিতু ভাগানি এবং রুপানি নিজে। পোস্টারের স্লোগানেও কংগ্রেসের আগ্রাসী ভাবটা স্পষ্ট। রাজগুরুর সমর্থনে পড়া পোস্টারের স্লোগান হল, ‘মাঢ়ো মত রাজকোট নে, মাঢ়ো মত ইন্দ্রনীল নে’ (আমার ভোট রাজকোটকে, আমার ভোট ইন্দ্রনীলকে)। অন্য দিকে বিজেপির পোস্টারের স্লোগানগুলি হল, ‘রাজকোট বিজয় ভব’ (রাজকোট বিজয়ী হোক), ‘রাজকোট কা বেটা, রাজকোট কা নেতা’ (রাজকোটের ছেলে, রাজকোটের নেতা), ‘ভিকাস মতে ভোট দো’ (উন্নয়নের জন্য ভোট দাও) ইত্যাদি।

উন্নয়নের দিক থেকে রাজকোট অনেক পিছিয়ে। ১৯৮৫ থেকে রাজকোট পশ্চিম বিজেপির হাতছাড়া হয়নি। এই আসন থেকেই তিন জন মুখ্যমন্ত্রী পেয়েছে রাজ্য, কেশুভাই পটেল, মোদী এবং রুপানি। তবুও অভিযোগ, অমদাবাদ বা সুরাতের মতো শহরের থেকে উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে রাজকোট। মানুষের এই ক্ষোভকে কাজে লাগাতে চাইছে কংগ্রেস। প্রায় এক বছর ধরেই এর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন রাজগুরু।

স্থানীয়দের মতে, কাঁটা দিয়েই বিজেপি-কাঁটা তুলতে চাইছেন রাজগুরু। তাই এক বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে ছোটো ছোটো সভা করে এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করছেন তিনি। এক দিকে রুপানির প্রচারে সাহায্যের জন্য মাঠে নেমে পড়েছে বিজেপি, আরএসএস এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীরা। অন্য দিকে রাজগুরুকে সাহায্য করার জন্য মাঠে নামানো হয়েছে দিল্লির একটি পিআর সংস্থার কর্মীদের। সোশ্যাল মিডিয়াতেও প্রচার চলছে। এই কাজে অন্তত ৭০ জন যুবক-যুবতী রাজগুরুকে সাহায্য করছেন।

এ ভাবেই নতুন ভোটারদের সঙ্গে জনসংযোগ বাড়াচ্ছেন রাজগুরু।

কংগ্রেসের তরফ থেকে গত এক বছর ধরে পথনাটিকা, বাড়ি বাড়ি ভ্রমণ আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজকোটের যুবসম্প্রদায়ের জন্য আলাদা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। প্রথম বার ভোটার, এমন মানুষদের সঙ্গেও নিয়মিত দেখা করছেন রাজগুরু।

কিন্তু তিনি তো রাজকোট পূর্বের বর্তমান বিধায়ক, সেই আসনটি তুলনায় নিরাপদ, সেই আসন ছেড়ে এখানে দাঁড়িয়েছেন কেন? দ্য ওয়্যার নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে, রাজগুরু বলেন, “গতবার আমি রাজকোট পূর্বে দাঁড়িয়েছিলাম কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত, অক্ষম একজন লোককে হারাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার পর দেখলাম এই আসনটিতে আরও অক্ষম একজন জিতলেন, যিনি কিনা রাজ্যের প্রধান হয়ে গেলেন। তখন থেকেই তাঁকে হারানোর জন্য নিজেকে উদ্বুদ্ধ করছিলাম। তাই এই সিদ্ধান্ত।”

রাজ্যে এ বার কংগ্রেসের সম্ভাবনা অত্যন্ত ভালো বলেই মনে করেন রাজগুরু। তাঁর কথায়, “অন্য বার নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগেই জেগে উঠত কংগ্রেস। মাত্র কুড়ি শতাংশ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতাম আমরা। কিন্তু এ বার পরিস্থিতি ভিন্ন। অনেক আগে থেকে প্রচারে নেমেছি। কংগ্রেসকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ চোখে পড়ছে। বিজেপি কর্মীরাও তাদের দলের ওপরে ক্ষুব্ধ। এক দিকে তারা গরুকে মায়ের রূপে দেখে, অন্য দিকে এখানে ভালো গোশালা নেই। এ ছাড়া বিমুদ্রাকরণ এবং জিএসটি’র ফলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি তো হয়েইছে। এই সব কারণেই এ বার কংগ্রেসের সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি।”

আপাতত তাই রাজগুরুকে দিয়েই রুপানি এবং সামগ্রিক ভাবে বিজেপি কাঁটা তুলতে চাইছে কংগ্রেস।

সৌজন্য: দ্য ওয়্যার নিউজ

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here