ওয়েবডেস্ক: শৈশবে নিজের কাকার কাছে নিয়মিত যৌন নির্যাতনের শিকার হত মীরা। চকলেট দেওয়ার নাম করে বাথরুমে নিয়ে যেত কাকা। ইমতিয়াজ আলির ‘হাইওয়ে’ দেখতে গিয়ে বাস্তবের মীরারা সে দিন রাগে ফুঁসছিলেন সিনেমাহলে বসেই। ঠিক সময় প্রতিবাদ করতে না পারার রাগ। আমরা অনেকেই পারি না প্রতিবাদ করে রুখে দাঁড়াতে। বরং হেনস্থার শিকার হয়ে কুঁকড়ে যাই আরও। বলতে না পারা যন্ত্রণাগুলো বয়ে বেড়াতে হয় জীবনভর। সেই সব যন্ত্রণাকে অস্ত্র করে হঠাৎ প্রতিবাদে শামিল মেয়েরা। এ প্রতিবাদ মানছে না দেশ, কাল, সীমানার গণ্ডি। সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় পাতায় চলছে হ্যাশট্যাগ ‘মি টু’ (#MeToo) প্রচার। হলিউডের অ্যাঞ্জেলিনা জোলি থেকে মফস্‌সলের আটপৌরে গৃহবধূ, বাদ পড়ছেন না কেউ। স্বামী, প্রেমিক, বন্ধু, পরিবারের সদস্য, অফিসের বস, সহকর্মী কিংবা সম্পূর্ণ অচেনা কারও দ্বারা জীবনের কোনো না কোনো সময় শারীরিক অথবা মানসিক ভাবে অত্যাচারিত হয়েছেন, এমন মেয়েরা সব এসে জড়ো হচ্ছেন এক ছাতার তলায়, যার নাম #MeToo।


সমাজতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, এই প্রতিবাদ নিছক ফেলনা নয়। সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, জাতিগত এবং আর্থসামাজিক বৈষম্য পেরিয়ে মেয়েরা, মহিলারা নিজেদের কোথাও গিয়ে এক মনে করছেন। কোনো না কোনো ভাবে তাঁরা সবাই যৌন নিপীড়নের শিকার, এই বোধটা ছড়িয়ে যাচ্ছে মহিলাদের ভাবনায়। মানুষের মনের গঠন এক এক রকম। বিশেষ পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার ধরনও আলাদা। প্রতিবাদ করার ক্ষমতা সবার থাকে না। এ ক্ষেত্রে #MeToo প্রচার বেশ সুবিধাজনক বলে মনে করছেন অনেকে। পাঁচটা অক্ষর পর পর বসিয়ে বোঝানো যাচ্ছে ‘তুমি একা নও। আমিও শিকার হয়েছি’। নীরব থেকে প্রতিবাদ করা যায় না, বরং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। কিন্তু ২/৪ টে শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে অনেক বড়ো একটা প্রতিবাদের অংশ হতে পারছেন লক্ষ লক্ষ মহিলা, মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

‘মেনে নিতে নিতে এমন অবস্থা হয়েছে, এখন যৌন হেনস্থার শিকার না হলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়, – যাক! শ্লীলতাহানি থেকে তো বেঁচেছি’, গত ২৪ ঘণ্টায় এমন বেশ কিছু লেখায় ভরে গিয়েছে ফেসবুকের পাতা। #MeToo প্রচারের মাঝেই সোশ্যাল মিডিয়ায় রাতারাতি জনপ্রিয় হয়েছে অন্য একটি প্রচার – #HowIWillChange। এ প্রতিবাদ পুরুষদের। নারীদের বিরুদ্ধে নয়, নিজেদেরই বিরুদ্ধে। মহিলাদের অপর অত্যাচারের জন্য, তাঁদের ভুল বোঝার জন্য, অবিশ্বাস করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদেরই ধিক্কার দিচ্ছেন একদল পুরুষ।

মহিলাদের এমন প্রতিবাদ নিঃসন্দেহে সাহসী, তবে সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ইতিমধ্যে।  ভারতের মতো দেশে ডিজিটাল প্রতিবাদ ক’টা প্রাণকে ছুঁতে পারে? আর যাঁদের পারে না, তাঁদের হয়ে প্রতিবাদটা করবে কারা? প্রতিবাদের মঞ্চটা পাওয়া যাবে কোথায়? বৃহত্তর রাজনৈতিক-সামাজিক লড়াইকে বাদ দিয়ে অসংখ্য পিছিয়ে থাকা মেয়েদের পিতৃতন্ত্রের জোয়াল থেকে বের করে আনা সম্ভব কি না, উঠছে সে প্রশ্নও।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here