পটনা: দু’দিন ধরেই জল্পনাটা চলছিল, বুধবার সন্ধ্যায় নিশ্চিত হল। রাষ্ট্রপতি পদে বিজেপি প্রার্থী রামনাথ কোবিন্দকেই সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিল জেডিইউ। বুধবার বিকেলে সরকারি ভাবে তা জানিয়ে দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার।

রামনাথ কোবিন্দকেই সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মায়াবতীর বিএসপি। বুধবার নীতীশ কুমারের এই সিদ্ধান্তে বিরোধী ঐক্যে বড়োসড়ো ভাঙন ধরে গেল। নীতীশের এই সিদ্ধান্তের ফলে রামনাথের রাষ্ট্রপতি হওয়া যে সময়ের অপেক্ষা তা এখনই বলে দেওয়া যায়।

উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধীকে ফোন করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যাপারে বিরোধী শিবিরকে এক করার ডাক দিয়েছিলেন স্বয়ং নীতীশ কুমারই। সেই নীতীশই সোমবার সন্ধ্যায় সনিয়াকে ফের ফোন করেন। এ বার তিনি জানিয়ে দেন যে বিজেপির বাছাই করা প্রার্থীকেই সমর্থন করবে তাঁর দল।

বিরোধীপক্ষের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী বাছাইয়ের জন্য বৃহস্পতিবার একটি বৈঠক ডেকেছেন সনিয়া। সেই বৈঠকে জেডিইউ থাকবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন নীতীশ। যদিও জেডিইউ-এর আরও এক নেতা শরদ যাদব জানিয়ে দেন, বিহারে বিজেপি-বিরোধী মহাজোট বজায় থাকবে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে বিজেপির বিরোধিতাও করবে তারা।

শুধু জেডিইউ বা বিএসপিই নয়, বিরোধী শিবিরে আরও ভাঙন ধরতে চলেছে বলেছে খবর। সূত্রের খবর, কোবিন্দকে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে শরদ পাওয়ারের এনসিপি। অন্য দিকে মুলায়ম সিংহ যাদবও কোবিন্দকে সমর্থন করবেন বলেছেন। কোবিন্দকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করে মোক্ষম দু’টি চাল চেলেছে বিজেপি। এক দিকে বিরোধী শিবিরে ভাঙন যেমন ধরানো গিয়েছে তেমনি এক দলিতকে প্রার্থী করে দলিতদের সমর্থনও জোগাড় করা গিয়েছে।

এ দিকে কোবিন্দের প্রতি নীতীশের সমর্থনের প্রতিক্রিয়ায় বিহারের বিজেপি নেতা ভুপেন্দ্র যাদব বলেছেন, “এটা গণতন্ত্রের জয়।”

কিন্তু কেন কোবিন্দকে সমর্থনের পথে হাঁটলেন নীতীশ?

মহাদলিত সম্প্রদায়ের মানুষরা বিহারে নীতীশ কুমারের অন্যতম ‘ভোট ব্যাঙ্ক’। মহাদলিত রামনাথকে সমর্থন করা মানে সেই সম্প্রদায়ের মানুষের মন জয় করা। তবে ঘনিষ্ঠ মহলে নীতীশের দাবি, রাজ্যপাল থাকাকালীন নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করে গিয়েছেন কোবিন্দ। সাধারণত বিজেপির নিয়োগ করা রাষ্ট্রপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে কেন্দ্রের ‘কথামতো’ কাজ করার। সেই অভিযোগ কোবিন্দের বিরুদ্ধে নেই।

নরেন্দ্র মোদীর প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন এখনও অটুট, এটা ভালোই আন্দাজ করেছেন নীতীশ। গত বছর মোদী বিমুদ্রাকরণ ঘোষণা করার পর বিরোধীরা সমস্বরে এর বিরোধিতা করলেও, ব্যতিক্রম ছিলেন নীতীশ। তিনি আন্দাজ করেছিলেন গরিব মানুষরা বিমুদ্রাকরণের খুব একটা বিরোধী নয়। বিমুদ্রাকরণ ঘোষণার পরেও উত্তরপ্রদেশের ক্ষমতা দখল করে বিজেপি। বিমুদ্রাকরণের প্রতি নীতীশের সমর্থনের জবাব দিয়েছিলেন মোদীও। গত জানুয়ারিতেই পটনায় সফরকালীন মোদী বিহারে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য নীতীশের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

এর পাশপাশি রয়েছে বিহারের জোট সরকারের সমস্যাও। ২০১৫-এর অক্টোবরে ‘মহাজোট’ বিহারের ক্ষমতা দখলের পর রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী হন লালুর ছেলে তেজস্বী যাদব। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তেজস্বী এবং তাঁর ভাই তথা রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তেজপ্রতাপের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। এর ফলে তাঁরও যে জমি নড়বড়ে হতে পারে সেটা ভালোই আন্দাজ করতে পেরেছেন নীতীশ। বিষয়টিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ছেলেদের প্রতি লালু সমর্থন। এই প্রেক্ষাপটে তাঁদের পুরোনো সঙ্গী বিজেপির সঙ্গে সখ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন নীতীশ।

উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের পর সব বিরোধীই এই বিষয়ে একমত হয়েছে যে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ না হলে বিজেপিকে হারানো প্রায় অসম্ভব। ২০১৫-এর বিহারের ‘মহাজোট’কেই সামনে রেখেছিল বিরোধীরা। ওই ‘মহাজোট’-এর ফলে মোদী বারংবার নির্বাচনী প্রচারসভায় এলেও কোনো কাজ হয়নি। ‘মহাজোট’-এর হাওয়ায় কার্যত উড়ে গিয়েছিল বিজেপি।

বিমুদ্রাকরণের পর থেকেই বিজেপির সঙ্গে ‘সুসম্পর্ক’ বজায়ের চেষ্টা করছিলেন নীতীশ। নীতীশের বিজেপি-নীতির সমালোচনাও করেছে জোটসঙ্গী কংগ্রেস এবং লালুর আরজেডি। যদিও সেই অভিযোগ বারবার খণ্ডন করেছে বিজেপি। যদিও বিজেপি-বিরোধী নীতি নিয়ে ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে কী হয়েছিল তা ভালোই জানেন নীতীশ।

মোদীকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী করার পরেই বিজেপির সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয় নীতীশের। লোকসভা নির্বাচনের আগেই তাই বিজেপির সঙ্গে কুড়ি বছরের জোট ভাঙেন নীতীশ এবং তার ফল পেয়ে যান হাতেনাতে। লোকসভা নির্বাচনে মোদী হাওয়ায় বিহার থেকে মুছে গিয়েছিল বিরোধীরা (যদিও তার পরের বছর বিজেপি বিরোধী ‘মহাজোট’ ক্ষমতা দখল করে নেয়)। সুতরাং ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখেই নীতীশের এই চাল, এমনই মত বিশেষজ্ঞদের।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন