আলওয়ার: এ বছর মার্চের ঘটনা। স্বঘোষিত গোরক্ষকদের হাতে খুন হতে হয়েছিল হরিয়ানার পঞ্চাশোর্ধ দুধব্যবসায়ী পেহলু খানকে। মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে ছ’জনের নাম করে গিয়েছিলেন পেহলু। ওই ছ’জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হলেও, সেই মামলা বন্ধ করে দিয়েছে রাজস্থান পুলিশ। এমনই জানা গিয়েছে ইংরেজি দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস সূত্রে।

ওই সংবাদপত্রের প্রকাশিত খবর অনুযায়ী প্রবল চাপের মুখে পড়েই এই মামলা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। যে তদন্ত রিপোর্ট হিন্দুস্তান টাইমসের হাতে এসেছে তাতে বলা হয়েছে স্থানীয় গোশালার এক কর্মচারীর বয়ান এবং মোবাইলের রেকর্ড দেখেই নাকি ওই ছ’জনকে ‘ক্লিন চিট’ দিয়েছে পুলিশ। উল্লেখ্য, ছ’জনের মধ্যে তিন জন কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।

আরও পড়ুন: আলোয়ার পুলিশ পক্ষপাতদুষ্ট, পরিবারের দাবি মেনে জয়পুরে সরল পেহলু হত্যা তদন্ত

বয়ানে ওই গোশালার কর্মচারী জানিয়েছে, ঘটনার সময় ছ’জন অভিযুক্ত ওম যাদব (৪৫), হুকুম চাঁদ যাদব (৪৪), সুধীর যাদব (৪৫) জগমল যাদব (৭৫) নবীন শর্মা (৪৮) এবং রাহুল সাইনি (২৪) নাকি ওই গোশালাতেই ছিল। যেখানে পেহলুর ওপর আক্রমণ করা হয়েছিল, সেই জায়গাটি এই গোশালা থেকে ৪ কিমি দূরত্বে। এই গোশালাটি জগমল যাদবের।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, “পুলিশ-সহ ঘটনাস্থলে হাজির থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং গোশালার কর্মচারীদের বয়ানে বোঝা যাচ্ছে যে ঘটনার সময়ে এই ছ’জন অভিযুক্ত ঘটনাস্থলে ছিলই না। অভিযুক্তদের মোবাইলের কল রেকর্ড দেখেও সেটা বোঝা যাচ্ছে।” সেই সঙ্গে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “তদন্তকারী অফিসারের রিপোর্টের ভিত্তিতে এই ছ’জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এই ছ’জন কোনো ভাবেই দোষী হতেই পারে না।” এই ছ’জনকে রেহাই দিয়ে দুই নাবালক-সহ আরও ন’জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে তদন্তকারী দল।

আরও পড়ুন: গো-হত্যার গুজবে খুন: অভিযুক্তকে ভগত সিংহের সঙ্গে তুলনা করলেন গোরক্ষা নেত্রী

গত ১ সেপ্টেম্বর আলওয়ার পুলিশের কাছে তাদের তদন্ত রিপোর্ট পাঠায় সিআইডি এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চের যৌথ তদন্তকারী দল। সেখানে বলা হয়, যে হেতু ওই ছ’জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ঘটনাস্থলে থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাই অভিযুক্তের তালিকা থেকে তাদের নাম মুছে দেওয়া হোক। শুধু নাম মোছাই নয়, ওই অভিযুক্তের খুঁজে দেওয়ার ব্যাপারে ৫০,০০০ টাকার পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছিল পুলিশ। সেই পুরস্কারও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

আলওয়ারের পুলিশ সুপার রাহুল প্রকাশ হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, “অর্থমূল্যের পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, কারণ ওই ছ’জন অভিযুক্তকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে সিআইডি-সিবি।” এখানেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে পেহলুর পরিবার। তাদের অভিযোগ, যে ছ’জনের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, তাদের ঘটনাস্থলে থাকার যথেষ্ট প্রমাণ পেহলুর পরিবারের কাছে রয়েছে।

পেহলুর ছেলে, ওই ঘটনায় আহত ইরশাদ হিন্দুস্তান টাইমসকে বলে, “ওই ছ’জনই প্রথম আক্রমণ শুরু করে। ওরা নিজেরা নিজেদের নাম ধরে ডাকছিল। একজন বলছিল, ‘হুকুম, ওদের টেনে নামাও, ট্রাকটা ভাঙো’।” ইরশাদের কথায়, ঘটনার সময়ে সে ওম, হুকুম, সুধীর এবং রাহুলের নাম শুনেছে।

পুলিশ যে চাপের মধ্যে রয়েছে, সে কথা বলে ইরশাদ । সেই সঙ্গে ইরশাদের পণ, ন্যায়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেনই। যত দিন না ওই ছ’জন দোষী প্রমাণিত হচ্ছে, তত দিন চুপ থাকবে না পেহলুর পরিবার।

আরও পড়ুন: পেহলু-খুনের বিচার চেয়ে বসুন্ধরাকে চিঠি গোপালকৃষ্ণ-সহ ২৩ প্রাক্তন আইএএসের

বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট নয়, বরং পুলিশের সামনে তাঁর মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দিয়েছিলেন পেহলু। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশকে দেওয়া মৃত্যুকালীন জবানবন্দিও আদালত গ্রহণ করে। রাজস্থান হাইকোর্টের এক আইনজীবী বিনয় পাল যাদবের মতে, “পুলিশ কখনওই মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে এড়িয়ে যেতে পারে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য মৃত্যুকালীন জবানবন্দির অবদান অনস্বীকার্য। পুলিশে দেওয়া মৃত্যুকালীন জবানবন্দির ভিত্তিতে কারও সাজা হচ্ছে, এর উদাহরণ অনেক রয়েছে।”

১ এপ্রিল রাত ১১টায় তাঁর জবানবন্দি দিয়েছিলেন পেহলু। এর দু’দিন পর মৃত্যু হয় তাঁর। ওই জবানবন্দির ভিত্তিতে ওই ছ’জন ছাড়াও আরও দুশো জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা শুরু করে পুলিশ। পুলিশের মতে, বাকি যে ন’জনের বিরুদ্ধে ঘটনাস্থলে থাকার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলবে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন