হলদিঘাটের যুদ্ধে জিতেছিলেন প্রতাপ, ইতিহাস শেখাবে রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়

0
963

জয়পুর: ইতিহাস বলে, ১৫৭৬-এ হলদিঘাটের যুদ্ধে সম্রাট আকবরের সেনাবাহিনীর হাতে পরাস্ত হয়েছিলেন মহারানা প্রতাপ। তাঁর সেনাবাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পর প্রতাপ তাঁর প্রিয় ঘোড়া চেতকের পিঠে চেপে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। যুদ্ধে গুরুতর আহত চেতক তাঁর মনিবকে নিয়ে বেশি দূর যেতে পারেনি। কিছুটা দূরে গিয়ে সে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছিল। কিন্তু রানা প্রতাপ তাঁর প্রিয় মেবার উদ্ধারের চেষ্টা কখনও ছাড়েননি। আকবরের কাছে কখনও আত্মসমর্পণ করেননি। রাজস্থানের পাহাড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছেন মোঘলবাহিনীর বিরুদ্ধে। তাঁর ত্যাগ, তাঁর হার-না-মানা জেদ, তাঁর শৌর্য-বীর্য ইতিহাসের পাতায় তাঁকে অমর করে রেখেছে। বীরশ্রেষ্ঠ রানা প্রতাপ ভারতবাসীর মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

কিন্তু বিজেপি-শাসিত রাজস্থান একে যথেষ্ট বলে মনে করছে না। তাদের ধারণা, যুদ্ধে জয়টাই বড়ো কথা, তা সে যে ভাবেই হোক। তারা মনে করে, হলদিঘাটের যুদ্ধে মহারানা প্রতাপকে বিজয়ী না দেখাতে পারলে তাঁর প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করা হয় না। তাই ছাত্রদের এত দিনের ‘ভুল জানা’ সংশোধন করতে ময়দানে নেমে পড়েছে রাজস্থান। আগেই রাজ্যের দশম শ্রেণির টেক্সট বই সংশোধন করা হয়েছে। এ বার রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ স্নাতকোত্তর শ্রেণির জন্য নির্ধারিত পুস্তকতালিকায় এমন একটি বইকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যাতে হলদিঘাটের যুদ্ধে মহারানা প্রতাপকে বিজয়ী এবং সম্রাট আকবরকে পরাজিত দেখানো হয়েছে।

মহারানা প্রতাপ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাননি, এটা তো বলা যাবে না। কারণ ইতিহাসের যা সাক্ষ্যপ্রমাণ মজুত আছে, তাতে এটাই সত্যি। তা হলে প্রতাপ জিতলেন কী ভাবে? সংশোধিত স্কুলবইয়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধে যে প্রতাপই জিতেছিলেন, তার প্রমাণ তিনটি – এক, মোঘলবাহিনী রানা প্রতাপকে হত্যা তো দূরের কথা, তাঁকে ধরতেও পারেনি; দুই, প্রতাপ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চলে যাওয়ার পরেও মোঘলবাহিনী তাঁকে তাড়া করেননি এবং তিন, সম্রাট আকবর তাঁর দুই জেনারেল মান সিং ও আসফ খানের ওপর ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন।

হলদিঘাটের যুদ্ধে সম্রাট আকবরের জয় নিয়ে রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী বাসুবেদ দেবনানি গত মার্চে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, তিনি যদি জিতেই থাকেন, তা হলে কেন ছ’ বার মেবার আক্রমণ করেছিলেন? তিনি জোর গলায় বলেছিলেন, আসলে রাজপুত রানা প্রতাপই জিতেছিলেন।

গত মাসে রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের বোর্ড অব স্টাডিজ-এর বৈঠক বসে। তাতেই ঠিক হয়, স্নাতকোত্তর শ্রেণির দ্বিতীয় সেমেস্টারে ‘রাজস্থান থ্রু দ্য এজেস’ বলে যে ‘পেপার’ আছে, সেটি পড়ার জন্য যে যে বইয়ের নাম সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে ড. চন্দ্রশেখর শর্মার লেখা ‘রাষ্ট্র-রত্ন মহারানা প্রতাপ’ শীর্ষক বইটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, শর্মার বইয়ে রানা প্রতাপ সম্পর্কে নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং হলদিঘাটের যুদ্ধে তাঁকে বিজয়ী দেখানো ছাড়াও তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে।

বোর্ড আরও সিদ্ধান্ত করেছে, ওই পেপারে ‘ডিবেট অন দ্য আউটকাম অব ব্যাটল অব হলদিঘাটি’ শীর্ষক       একটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আকবরের ‘পরাজয়’ সম্পর্কে নতুন করে শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারটি প্রথম মাথায় আসে বিজেপি বিধায়ক মোহন লাল গুপ্তা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটেরও সদস্য। গত ফেব্রুয়ারিতে সিন্ডিকেটের বৈঠকে তিনি ওই প্রস্তাব তোলেন। তিনি প্রস্তাব দেন, ওঙ্কার সিং লাখোয়াতের লেখা ‘অতীত সে সাকশাতকার’ এবং হলদিঘাটের যুদ্ধের ওপর অধ্যাপক কে এস গুপ্তার লেখা আরেকটি বই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। পরে লাখোয়াত ইতিহাস বিভাগকে লিখে জানান, তিনি ওই নামে কোনো বই লেখেননি বা সম্পাদনাও করেননি। অধ্যাপক গুপ্তাও জানিয়েছেন, হলদিঘাটের যুদ্ধ নিয়ে তিনি কোনো বই লেখেননি, তবে তাঁর কয়েকটি গবেষণাপত্র আছে।

আলোচনার পর বোর্ডের মনে হয়েছে, “মহারানা প্রতাপ এবং হলদিঘাটের যুদ্ধ নিয়ে সাম্প্রতিকতম গবেষণাগুলো কী বলছে তা জানা দরকার” এবং সে কারণেই ড. চন্দ্রশেখর শর্মার বই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

আরএসএস-এর মতাদর্শ তুলে ধরার জন্য রাজস্থানের বিজেপি সরকারের নেতৃত্বে স্কুল স্তরের বিভিন্ন বই নতুন করে লেখা হচ্ছে। হিন্দুত্বের প্রবক্তা সাভারকরকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে গান্ধী ও নেহরুকে প্রায় মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসকে বলা হয়েছে, ব্রিটিশের ‘পালিত শিশু’। বিজেপি নেতারা বলছেন, আগে ছাত্রদের ‘বিকৃত’ ইতিহাস শেখানো হয়েছে। ‘কমিউনিস্ট’ ইতিহাসবিদরা যে সব নেতাকে উপেক্ষা করেছেন, সেই সব নেতাকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসছেন তাঁরা।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here