ঝাঁসি (উত্তরপ্রদেশ): “ম্যায়ঁ অপনি ঝাঁসি নহী দুঙ্গি” – ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন তিনি। সিপাহি বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নেমে শহিদ হয়েছিলেন তিনি। তিনি ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ (Rani Lakshmibai)। স্বাধীনতার ৭৫ বর্ষ পূর্তিতে দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ (azadi ka amrit mahotsav)। আসুন, আজ স্মরণ করা যাক সেই সংগ্রামী রানিকে।  

রানি লক্ষ্মীবাঈকে ভারতবর্ষের ‘জাতীয় বীরাঙ্গনা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ভারতে নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে তাঁকে চিত্রিত করা হয়েছে। সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর প্রথম নারীদলের নাম রেখেছিলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের নামে।

১৮২৮ সালের ১৯ নভেম্বর বারাণসীর মরাঠি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম লক্ষ্মীবাইয়ের। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল মণিকর্ণিকা। বাবার নাম মোরোপন্ত তাম্বে এবং মাতা ভাগীরথী বাঈ। মণিকর্ণিকাকে সবাই আদর করে ‘মনু’ নামে ডাকত। মাত্র চার বছর বয়সে তার মা মারা যান। মনু বাবার কাছে বিথুরে চলে আসে। এখানে দ্বিতীয় পেশোয়া বাজিরাওয়ের অধীনে কাজ করতেন তার বাবা।

পেশোয়া মনুকে বেশ পছন্দ করতেন এবং নিজের ছেলে নানা সাহেবের সঙ্গে যে রকম আচরণ করতেন মনুর সঙ্গেও সে রকমই আচরণ করতেন। মনু তার সমবয়সি বাচ্চাদের থেকে বেশ আলাদা ছিল। কিশোরীকাল থেকেই ঘোড়ায় চড়া, মার্শাল আর্ট, তরোয়াল চালানো ইত্যাদি খেলাধুলা ও অ্যাডভেঞ্চারে মেতে থাকত মনু।

১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় ঝাঁসির মহারাজা গঙ্গাধর রাও নেওয়ালকরের সঙ্গে। বিয়ের পর থেকেই মনু ‘রানি লক্ষ্মীবাঈ’ হিসাবে পরিচিত হন। কালক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ঝাঁসীর রানি’। বিয়ের পরেও কিন্তু লক্ষ্মীবাঈ খেলাধূলা ছাড়েননি। তিনি মেয়েদের নিয়ে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। তাদের ঘোড়ায় চড়া, তরোয়াল চালানো সহ যুদ্ধের সমস্ত রকম কসরত শেখানো হত।

১৮৫১ সালে লক্ষ্মীবাঈ-গঙ্গাধরের একটি পুত্রসন্তান হয়। নাম রাখা হয় দামোদর রাও। কিন্তু মাত্র চার মাস বয়সে সে মারা যায়। পুত্রশোক ভুলতে রাজা তাঁর জ্যাঠতুতো ভাইয়ের ছেলে আনন্দকে দত্তক নেন। রানিও তাতে সম্মতি জানান। নিজেদের প্রয়াত সন্তানের নামে তাঁরা আনন্দরও নাম রাখেন দামোদর।

ঝাঁসির মহারাজা গঙ্গাধর রাও ১৮৫৩ সালের ২১ নভেম্বর প্রয়াত হন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে বৈধব্য বরণ করেন রানি লক্ষ্মীবাঈ।

গঙ্গাধরের মৃত্যুর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁর দত্তক পুত্র দামোদরকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মেনে নেয়নি। গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি তাঁর স্বত্ব বিলোপ (ডকট্রিন অব ল্যাপ্স) নীতি প্রয়োগ করে জানিয়ে দেন, ঝাঁসির সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী নেই, তাই ঝাঁসিকে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হবে। এর উত্তরে রানি জানিয়ে দেন, “আমার ঝাঁসি আমি কখনোই দেব না।”  

১৮৫৪ সালে ঝাঁসির রানির নামে বার্ষিক ৬০,০০০ টাকা ভাতা হিসেবে মঞ্জুর করা হয় এবং ঝাঁসির কেল্লা ও প্রাসাদ ছেড়ে যেতে হুকুম জারি করা হয়।

ইতিমধ্যে ১৮৫৭ সালের ১০ মে ব্রিটিশবাহিনীর ভারতীয় সিপাহিরা বিদ্রোহ করে বসে। বিদ্রোহ শুরু হয় মেরঠে (মিরাট)। তার আঁচ এসে পড়ে ঝাঁসিতেও। নিজেকে রক্ষা করার জন্য একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ব্যাপারে ঝাঁসির ব্রিটিশ পলিটিক্যাল অফিসার ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার স্কিনের কাছে অনুমতি চান রানি। ক্যাপ্টেন স্কিনে রানির আবেদন মঞ্জুর করেন।

এ দিকে ঝাঁসিতে বিদ্রোহীরা ষাট জন ইংরেজকে হত্যা করে। রানি লক্ষ্মীবাঈ এই হত্যার সঙ্গে কোনো ভাবেই জড়িত ছিলেন না। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার সিপাহী বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করার পাশাপাশি ঝাঁসির বিদ্রোহীদের কড়া সাজা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

১৮৫৭ সালের আগস্ট থেকে রানির শাসনে ঝাঁসি শান্তিপূর্ণ ছিল। ১৮৫৮ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটিশ সৈন্যরা স্যার হিউজ রোজের নেতৃত্বে ঝাঁসি অবরোধ করে। পরের দিনই তারা ঝাঁসির ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র বাহিনী তার পালটা জবাব দেয়। ইতিমধ্যে রানির পক্ষ থেকে তাঁতিয়া টোপের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা যায়। ২০ হাজার সেনার বাহিনী ছিল তাঁতিয়া টোপের নেতৃত্বে। কিন্তু তারা ব্রিটিশবাহিনীকে পরাজিত করে ঝাঁসিতে ঢুকতে পারেনি।   

ব্রিটিশবাহিনী রানির শহরে প্রবেশ করে প্রাসাদের দিকে রওনা হয়। তারা প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক বেশি উন্নত ছিল। রানি বুঝেছিলেন, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি তাঁর দুর্গটি রক্ষা করতে পারবেন না। তাই এক রাতে তিনি তাঁর সন্তান দামোদরকে পিঠে নিয়ে প্রিয় ঘোড়া বাদলের পিঠে চেপে দুর্গ থেকে ঝাঁপ দেন। তাতে সন্তানসহ রানির প্রাণরক্ষা হয়, কিন্তু বাদল মারা যায়। গভীর রাতে তাঁর বিশ্বস্ত কয়েক জন রক্ষী পরিবৃত হয়ে রানি কাল্পিতে চলে আসেন। এখানে তাঁতিয়া টোপের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় রানির বাহিনী। এই কাল্পিতেই মিলিত হন বিদ্রোহের চার নেতা – রানি লক্ষ্মীবাঈ, তাঁতিয়া টোপে, বন্দার নবাব এবং নানা সাহেবের ভাইপো রাও সাহেব।   

২২ মে ব্রিটিশ বাহিনী কাল্পি আক্রমণ করে। তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রানিই নেতৃত্ব দেন। কিন্তু আবার পরাজিত হন। চার নেতা গোয়ালিয়র পালিয়ে যান। ইতিমধ্যে গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া মোরারের যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে আগরায় পালিয়ে গিয়েছেন। ভারতীয় বাহিনীর দখলে রয়েছে গোয়ালিয়র। বিদ্রোহীরা নানা সাহেবকে নতুন পেশোয়া ঘোষণা করে রাও সাহেবকে গোয়ালিয়রের গভর্নর পদে বসান। রানি বুঝেছিলেন ব্রিটিশরা সহজে ছাড়বে না। তাই সম্ভাব্য ব্রিটিশ আক্রমণ থেকে গোয়ালিয়রকে বাঁচাতে বিদ্রোহীদের আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করেন রানি, কিন্তু ব্যর্থ হন।

জেনারেল হিউজ রোজের বাহিনী ১৬ জুন মোরার দখল করে পরের দিনই গোয়ালিয়র আক্রমণ করেন। ১৭ জুন, ১৮৫৮ সালে ফুলবাগ এলাকার কাছাকাছি কোটাহ-কি সেরাইয়ে রাজকীয় বাহিনীর সাথে যুদ্ধ চালিয়ে শহিদ হন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ ।

যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশবাহিনীর নেতা জেনারেল হিউজ রোজ তাঁর প্রতিবেদনে লেখেন, “রানি তাঁর সহজাত সৌন্দর্য্য, চাতুর্য এবং অসাধারণ অধ্যবসায়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। সমস্ত বিদ্রোহী নেতানেত্রীর মধ্যে তিনিই ছিলেন সব চেয়ে বিপজ্জনক।”

আরও পড়তে পারেন

তৃতীয় গুলি ফাটিয়ে দিল মাথার খুলি, লুটিয়ে পড়লেন ‘গান্ধীবুড়ি’, তখনও তাঁর বুকে চেপে ধরা ত্রিবর্ণ পতাকা

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন