rbi

নয়াদিল্লি: রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আর কেন্দ্রীয় সরকারের ‘সম্পর্কে’ কি চিড় ধরেছে? বুধবার রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পর কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক যে ভাবে অসন্তোষ দেখিয়েছে তাতে সে রকমই ধারণা তথ্যাভিজ্ঞ মহলের। অর্থ মন্ত্রকের আশা ছিল, মুদ্রাস্ফীতির হার কম থাকায় সুদের হার কমানো হবে। ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যাঙ্কের মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) সদস্যরা অর্থ মন্ত্রকের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজি না হওয়ায় তথ্যাভিজ্ঞ মহলের সন্দেহ আরও জোরালো হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যে একটি স্বশাসিত সংস্থা সেটাই কি বোঝাতে চাইছেন ব্যাঙ্কের কর্মকর্তারা?

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর উর্জিত পটেলের নেতৃত্বাধীন ৬ সদস্যের এমপিসি বুধবার এক বিবৃতিতে জানায়, মুদ্রাস্ফীতির হার যে কমই থাকছে, সে ব্যাপারে সুনিশ্চিত হতে চায় ব্যাঙ্ক। তাই তারা সুদের হার কমাচ্ছে না। এই নিয়ে চার বার রেপো রেট এবং রিভার্স রেপো রেট একই রেখে দিল আরবিআই। রেপো রেট ৬.২৫ শতাংশে এবং রিভার্স রেপো রেট ৬ শতাংশে। অবশ্য এমপিসি-র এই সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত নয়। কমিটির এক বাইরের সদস্য আমদাবাদ আইআইএম-এর অধ্যাপক রবীন্দ্র ঢোলাকিয়া বিপরীত মত পোষণ করেন। যাই হোক রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এই সিদ্ধান্তে খুশি নয় অর্থ মন্ত্রক। মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রমানিয়ান খোলাখুলিই তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ধারণা ছিল, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য সুদের হার কমানো হবে।

মনোমালিন্যের ইঙ্গিত শুধু এটুকুতেই নয়। এমপিসি মিটিং-এর আগে অর্থ মন্ত্রক কমিটির সদস্যের সঙ্গে মিলিত হতে চেয়েছিল। কিন্তু সদস্যরা রাজি হননি।

সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এমপিসি দু’ দিন ধরে বৈঠক করে – মঙ্গলবার ও বুধবার। দ্বিতীয় দিনের মিটিং-এর পরে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময়ে অর্থ মন্ত্রকের সঙ্গে এমপিসি সদস্যদের বৈঠক প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে গভর্নর উর্জিত পটেল বলেন, “বৈঠক হয়নি। এমপিসি-র সব সদস্য অর্থ মন্ত্রকের অনুরোধ খারিজ করে দিয়েছিলেন।” একেবারে এক বাক্যের কড়া বিবৃতি, যা থেকে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের স্বশাসনের ব্যাপারটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্রের খবর, অর্থ মন্ত্রকের আধিকারিকরা এমপিসি-র বহিরাগত সদস্যদের সঙ্গে ১ জুন মিলিত হতে চেয়েছিলেন এবং পরের দিন ঠিক ছিল আরবিআইয়ের প্রধান ও সদস্যদের সঙ্গে মিটিং হবে। অর্থ মন্ত্রকের প্রতিনিধিত্ব করবেন অর্থনৈতিক বিষয়ক সচিব, মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রমানিয়ান এবং প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল। গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নীতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারি কর্তাব্যক্তিরা নিয়ম করে আরবিআইয়ের আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করে বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে উন্নতি আর মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। এমপিসি তৈরি হওয়ার অনেক আগে থেকেই এই অনুশীলন চলে আসছে, যখন স্বয়ং অর্থমন্ত্রী দেখা করতেন গভর্নরের সঙ্গে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ঘোষণার পর কেন্দ্রীয় সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, যদিও তিনি আরবিআইয়ের এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাচ্ছেন, তবু তাঁর মনে হয়, সুদের হার কমানোর সুযোগ ছিল। তিনি বলেন, “মুদ্রাস্ফীতির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে, শুধু যে খাতায়কলমে তার চেয়ে বেশ কমই চলছে তাই নয় প্রকৃত মুদ্রাস্ফীতিও যথেষ্ট কমেছে। এই পরিস্থিতিতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে আরবিআইয়ের পূর্বাভাসে বেশ ভুল থেকে যাচ্ছে।”

অর্থ মন্ত্রকের আধিকারিকদের সঙ্গে আরবিআইয়ের বৈঠকের প্রকৃতিটিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে রাজি নন অরবিন্দ সুব্রমানিয়ান। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের অখণ্ডতাকে ক্ষুণ্ণ করা এই মিটিং-এর উদ্দেশ্য নয়। “আমি মনে করি, আমাদের মধ্যে যত বেশি, সরকার তত বেশি ইনপুট দিতে পারবে।”

নীতি নিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এমপিসি ৬ ও ৭ জুন বৈঠকে বসার আগে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আছে। এ বারও ভালো বর্ষা ইঙ্গিত এবং তেলের দামও না বাড়ার সম্ভাবনা বেশি। এই পরিস্থিতিতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। সুদের হার কমানোর পক্ষে সওয়াল করে জেটলি বকেছিলেন, “উন্নতি বাড়াতে হবে, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এই পরিস্থিতিতে যে কোনো সুদের হার কমাতে চাইবেন, প্রাইভেট সেক্টরও তা-ই চায়। যাই হোক দায়িত্ব দেওয়া আছে এমপিসি-র। তাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রইলাম।”

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর আশায় জল ঢেলে দিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here