নয়ডা আবাসনে হামলা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের, দাবি আরএসএস সংগঠনের, উঠছে নানা প্রশ্ন

0
788

নয়ডা: পরিচারিকাকে সারা রাত আটকে রাখার অভিযোগে সম্প্রতি নয়ডার মহাগুন মডার্ন আবাসনে স্থানীয় গরিবগুর্বো মানুষজন যে হামলা চালিয়েছিল তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের তাণ্ডব বলে বর্ণনা করল আরএসএস-এর একটি শাখা সংগঠন। এই ঘটনা নিয়ে তারা সিবিআই তদন্ত দাবি করেছে। ইতিমধ্যে ওই ঘটনায় ১৩ জন বস্তিবাসীকে গ্রেফতার করা হলেও, যাঁদের বিরুদ্ধে বস্তিবাসীদের অভিযোগ, এফআইআর হওয়া সত্ত্বেও  তাঁদের গ্রেফতার করা হয়নি বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে।

ওই সংগঠনের দাবি, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ ভাবে মানুষ এনে তাদের বস্তি এলাকায় পুনর্বাসন দেওয়ার একটা চক্র সারা ভারত জুড়েই সক্রিয় রয়েছে। এদেরই একটা অংশ নয়ডার ওই আবাসনে তাণ্ডব চালিয়েছে। আরএসএস-এর অন্তর্ভুক্ত ওই সংগঠনটির এই দাবির পরেই নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মূল প্রশ্ন হল, সংগঠনের মাথারা কী করে বুঝলেন, সে দিন যারা ওই আবাসনে ইট-পাথর ছুড়েছিল তারা সবাই ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। কী করে বুঝলেন, তারা বাংলাদেশি, পশ্চিমবঙ্গের নয়।

আরও পড়ুন: পরিচারিকাকে আটকে রাখার অভিযোগ, নয়ডার আবাসনে হামলা

ঘটনার পরেই একই কথা বলেছিলেন মহাগুন মডার্ন আবাসনের বাসিন্দারা। তাঁরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, ওরা বাংলাদেশি। ওদের আর ঠিকে কাজে নেওয়া হবে না। আবাসনের বাসিন্দাদের ভাষায়, “ওরা বাংলাদেশি ঘুসপথিয়া (বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী)।” একই সুরে কথা বলেছেন ‘গ্রুপ অব ইন্টেলেকচুয়ালস অ্যান্ড অ্যাকাডেমিসিয়ান্স’ (জিআইএ) নামক ওই সংগঠনের তথ্যানুসন্ধানী দল। জিআইএ দেখেছে, জাল নথিপত্তর নিয়ে প্রচুর অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী শহরে কাজ করছে। নয়ডার ঘটনা থেকে শিক্ষা  নিয়ে উত্তর প্রদেশের প্রশাসন এদের ‘ঝেঁটিয়ে বিদায় করা’র কাজ শুরু করেছে।

তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্যরা কী করে বুঝলেন মহাগুন মডার্ন আবাসনে কাজ করতে আসা পরিচারক-পরিচারিকার দল বাংলাদেশি? ওঁরা তো বলছেন, ওঁরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন, ওঁরা ভারতবাসী, বাংলাদেশি নন। ওঁরা বলছেন, ওঁরা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। গ্রাম ছেড়ে চলে আসার কারণ দারিদ্র। কেউ এসেছেন ছ’ বছর আগে, কেউ বা আট বছর আগে। আরএসএস-এর দলটি ‘বাংলাদেশি’ আর ‘পশ্চিমবঙ্গীয়’-এর মধ্যে কী করে তফাত করল? ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনধারণ, খাওয়াদাওয়া – এঁদের তো সব কিছুই এক। তা হলে কোন মন্ত্রবলে এরা তফাত করল?

আরএসএস-অনুগত জিআইএ-র আহ্বায়ক মণিকা অরোরা বলেন, “শ’ পাঁচেক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর এক জনতা সে দিন আবাসন আক্রমণ করেছিল। ঘটনাটি বিশাল মাপের। এটাকে আইনশৃঙ্খলা জনিত ছোটো একটা ঘটনা বলে উড়িয়ে দলে চলবে না। আমাদের সন্দেহ, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ ভাবে মানুষ এনে আবাসিক এলাকার কাছে ঝুগ্‌গি-ঝোপড়িতে তাদের পুনর্বাসন দেওয়ার একটা চক্র দেশ জুড়েই সুনিপুণ ভাবে কাজ করে চলেছে। তাই নয়ডার ঘটনা নিয়ে সিবিআই তদন্ত দাবি করছি।”

মহাগুন মডার্ন আবাসনের ঘটনা নিয়ে তাঁরা একটা রিপোর্ট তৈরি করছেন এবং দু-এক দিনের মধ্যেই তাঁরা তা প্রকাশ করবেন বলে জানান অরোরা। তিনি বলেন, তাঁরা ওই রিপোর্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-এর কাছে পাঠাবেন।

আরও পড়ুন: নয়ডা হামলা: বাংলাদেশি পরিচারিকাদের নিষিদ্ধ করল অভিযুক্ত আবাসন

ওই দিনের ঘটনা নিয়ে মহাগুন মডার্ন আবাসনের বাসিন্দারা যে কথা বলেছিলেন, তারই প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছে মণিকা অরোরার মুখে। তাঁর দাবি, সিসিটিভি ফুটেজে নাকি দেখা গিয়েছে, জোহরা বিবি নামে ওই পরিচারিকাকে নাকি আবাসনে অভিযুক্ত মালিকের ফ্ল্যাটে আটকে রাখা হয়নি। সে ওই দিন রাতে প্রতিবেশী এক বয়স্কা মহিলার ফ্ল্যাটে ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশকর্মীরা জানিয়েছেন, আবাসনের ঘটনায় চারটি মামলা রুজু করা হয়েছে। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা সকলেই ওই বস্তির বাসিন্দা। জোহরা বিবির নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে বুধবারেই এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।

ফ্ল্যাট মালিকরা মণিকা অরোরাকে যে কথা বলেছেন, তিনি সেগুলিই সাংবাদিকদের শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “ফ্ল্যাট মালিকদের বয়ান অনুযায়ী যেটা সব চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক সেটা হল পরিচারিকা যে বাড়ি থেকে চুরি করেছিল, সেই বাড়িতেই হামলা চালাল জনতা। পরিবারটিকে ভয়ে বাথরুমে আশ্রয় নিতে হল। জনতার মধ্যেই ছিল আরও অনেক পরিচারিকা। তারা জানত পিছনে একটা কাচের দরজা আছে। তারা সেটি ভেঙে বাড়িতে ঢুকেছিল পরিবারের সদস্যদের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে। আবাসনের অন্য বাসিন্দারা এসে যাওয়ায় পরিবারটি বেঁচে যায়। জনতা ফ্ল্যাটের মালকিনকে ধর্ষণ এবং ছেলেকে পিটিয়ে মারবে বলে চিৎকার করছিল। এদের বিরুদ্ধে নারী নিগ্রহের অভিযোগ আনা উচিত।”

এই মণিকা অরোরা আরও বলেছেন, “পরের দিন সকালে ওই পরিবার থেকে ওই পরিচারিকাকে খাবার ও চা দেওয়া হয়। সে আবাসন থেকে বেরিয়ে এসে মিথ্যা কাহিনি সাজায়।” ঝুগ্‌গি-ঝোপড়িতে বাস করা ওই মানুষজনের কাছে কী করে বৈধ ভোটার কার্ড আর আধার কার্ড এল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মণিকা দেবী।

জিআইএ-র এই বক্তব্য ও দাবির পরে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে –

(১) আরএসএস-এর শাখা সংগঠনটির তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্যরা শুধুমাত্র ফ্ল্যাটমালিকদের কথা শুনেই তাঁদের অনুসন্ধান শেষ করলেন? তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা কী বলছেন, তা তো তথ্যানুসন্ধানী দলের বক্তব্য থেকে বোঝা গেল না। এ ভাবে এক পক্ষের বক্তব্য জেনে কি প্রকৃত তথ্য জানা নায়?

(২) তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্যরা কী করে বুঝলেন ফ্ল্যাটমালিকদের বক্তব্য বেদবাক্য আর ওই পরিচারিকার বক্তব্য গাঁজাখুরি?

(৩) তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্যরা কী করে বুঝলেন মহাগুন মডার্ন আবাসনে কাজ করতে আসা পরিচারক-পরিচারিকার দল বাংলাদেশি? ওঁরা তো বলছেন, ওঁরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন, ওঁরা ভারতবাসী, বাংলাদেশি নন। ওঁরা বলছেন, ওঁরা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। গ্রাম ছেড়ে চলে আসার কারণ দারিদ্র। কেউ এসেছেন ছ’ বছর আগে, কেউ বা আট বছর আগে। আরএসএস-এর দলটি ‘বাংলাদেশি’ আর ‘পশ্চিমবঙ্গীয়’-এর মধ্যে কী করে তফাত করল? ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনধারণ, খাওয়াদাওয়া – এঁদের তো সব কিছুই এক। তা হলে কোন মন্ত্রবলে এরা তফাত করল?

(৪) নয়ডার আবাসনগুলোয় যাঁরা কাজ করেন তাঁরা থাকেন নয়ডা মেট্রো রেললাইন আর সেক্টর ৭৮-এর আকাশচুম্বী আবাসনগুচ্ছের মাঝের জায়গাটায় ঝুগ্‌গি-ঝোপড়ি বানিয়ে। বেশির ভাগেরই পেশা নয়ডার ফ্ল্যাট বাড়িতে ঠিকের কাজ। কারও রোজগার মাসে ছ’ হাজার, কারও বা আট হাজার, কারও কারও তারও বেশি। এক দিন হাজার দশেক টাকা চুরি করে পাওয়ার লোভে এঁরা কি স্থায়ী পেশার জায়গাটি হারাতে চাইবেন? নিজেদের জীবনে বিপদ ডেকে আনবেন?

(৫) ঝুগ্‌গি-ঝোপড়িবাসীদের সকলেরই ভোটার আইডি কার্ড, আধার কার্ড রয়েছে। এই নথিগুলি যদি জাল হয়, তা হলে কি বুঝতে হবে জাল টাকা ছাপার অবৈধ চক্রের মতো জাল ভোটার আইডি কার্ড, আধার কার্ড বানানোর চক্র তৈরি হয়ে গিয়েছে এই দেশে?

(৬) আর এই নথিগুলি যদি জাল না হয় তা হলে কীসের ভিত্তিতে এঁদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর তকমা দেওয়া হচ্ছে?

আরও পড়ুন: ম্যাডাম বলেছিলেন আমাকে প্রচণ্ড মারবেন, ছাদ থেকে ফেলে দেবেন, বললেন জোহরা

বুধবারের ঘটনার পর নিজেদের ভারতীয় নাগরিক হিসাবে প্রমাণ করার জন্য নয়ডার সেক্টর ৪৯ থানায় সব নথিপত্র নিয়ে হাজিরা দিতে হচ্ছে ওই ঝুগ্‌গি-ঝোপড়ির বাসিন্দাদের। ভোটার আইডি কার্ড, আধার কার্ড এমনকি পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে দেওয়া নথি নিয়ে লাইন দিতে হচ্ছে থানায়। তাঁদের বক্তব্য, “এ ভাবে এক দিন নিজেদের ভারতীয় বলে প্রমাণ করতে হবে, তা স্বপ্নেও ভাবিনি।”

বুধবার রাতেই ওই বস্তিতে হানা দেয় পুলিশ। বিভিন্ন পরিবারের পুরুষ সদস্যদের তুলে নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবারের মধ্যে ওই বস্তির ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয় এবং বহু মানুষকে আটক করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশকর্মীরা জানিয়েছেন, আবাসনের ঘটনায় চারটি মামলা রুজু করা হয়েছে। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা সকলেই ওই বস্তির বাসিন্দা। জোহরা বিবির নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে বুধবারেই এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here