রায়পুর: আদিবাসী মহিলাদের ওপর যৌন নিগ্রহের প্রতিশোধ নিতেই সুকমা হামলা চালানো হয়েছে বলে সাফ জানিয়ে দিল মাওবাদীরা। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মাওবাদী) দণ্ডকারণ্য স্পেশ্যাল জোনাল কমিটি (ডিকেএসজেডসি) বৃহস্পতিবার দাবি করেছে, সংঘাত-এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা আদিবাসী মহিলাদের ওপর যে যৌন হিংসা চালাচ্ছে, তার বদলা নিতেই সুকমায় আক্রমণ হানা হয়েছে। দক্ষিণ ছত্তীসগঢ়ের সুকমায় জেলায় গত ৫০ দিনের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর যে পর পর আক্রমণ চালানো হয়েছে তার দায় স্বীকার করেছে নিষিদ্ধ সংগঠনটি। ওই হামলাগুলিতে ৩৭ জন সিআরপিএফ জওয়ান প্রাণ হারিয়েছেন।

ডিকেএসজেডসি-র মুখপাত্র ‘বিকল্প’ একটি অডিও ক্লিপ-এ বলেছেন, “মাওবাদীদের আত্মসমর্পণ নিয়ে ভুয়ো প্রচার এবং সরকারের ২০১৭ মিশনের জবাব দিতে সিপিআই (মাওবাদী)-র সামরিক শাখা পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি (পিএলজিএ) ২৪ এপ্রিল চিন্তাগুফা-বুরকপাল এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। আমরা পিএলজিএ, তার নেতৃত্ব ও কমান্ডারদের এবং দণ্ডকারণ্যের মানুষদের তাঁদের সক্রিয় সমর্থনের জন্য অভিনন্দন জানাই। ২০১৭-এর মার্চে ভেজি এলাকায় সিআরপিএফ-এর ওপর যে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, এই বুরকপাল হামলা তারই বিস্তৃত রূপ। এই আক্রমণগুলো প্রতিশোধমূলক, রক্ষণাত্মক; জন-বিরোধী নীতিগুলোকে পরাস্ত করা এবং জনমুখী সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই আক্রমণ।”

বিকল্প’ আরও বলেছেন, “সংঘাত-এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা আদিবাসী মহিলা ও মেয়েদের ওপর যে যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে, এই আক্রমণগুলোকে তারই বদলা হিসাবে দেখা উচিত। যৌন হিংসার যে অসংখ্য ঘটনা ঘটছে, যা যে কোনো সভ্য সমাজে একটা কলঙ্ক, সেই যৌন হিংসার জবাব হিসাবে এই আক্রমণগুলোকে দেখা উচিত। ভেজি আর চিন্তাগুফা-বুরকপাল আক্রমণকে আদিবাসী মহিলাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে প্রতিশোধমূলক আক্রমণ হিসাবে দেখা উচিত। সংঘাত-এলাকায় আদিবাসী জনগণ নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে যে অমানবিক অত্যাচারের শিকার হয়, তা থেকে তাঁদের মুক্ত করতে এই আক্রমণগুলো চালানো হচ্ছে।”

তাঁর দল যে সংঘাত-এলাকায় সড়ক, রেল ও মোবাইল টাওয়ার নির্মাণের বিরোধী, তা আরও একবার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন ডিকেএসজেডসি-র মুখপাত্র। তিনি বলেছেন, “সাধারণ মানুষকে ত্রাণ দেওয়ার অছিলায় সংঘাত-এলাকায় আধাসামরিক বাহিনী ও পুলিশকে রক্ষা করার জন্যই সড়ক, রেল ও মোবাইল টাওয়ার তৈরি করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর যাতায়াত সহজ করতে, সাধারণ মানুষকে শোষণ করতে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করতেই এ সব তৈরি করা হচ্ছে। এই খোলাখুলি লুঠের বিরোধিতা করতে এবং ওই সব সম্পদ সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা সুনিশ্চিত করতে এই প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালানো হচ্ছে।”

পিএলজিএ নিহত সিআরপিএফ জওয়ানদের দেহ বিকৃত করেছে বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা অস্বীকার করে মাওবাদীদের মুখপাত্র বলেন, “বরং সংঘর্ষে পিএলজিএ সদস্যদের মৃত্যু হলে তাঁদেরই দেহ বিকৃত করে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী।”

ছত্তীসগঢ়ে বিরোধী দল, সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর কয়েকটি গোষ্ঠী যে আক্রমণ চালাচ্ছে, তার উল্লেখ করে ডিকেএসজেডসি-র মুখপাত্র এই ‘অগণতান্ত্রিক আচরণ’-এর জন্য রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেছেন, “একটা অগণতান্ত্রিক ও ফাসিস্ত পরিবেশ তৈরি করার যে চেষ্টা হচ্ছে, ভেজি আর চিন্তাগুফা-বুরকপাল আক্রমণকে তারই বদলা হিসাবে দেখতে হবে। দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের ওপর যে শোষণ চলছে, পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদতে ও সক্রিয় সুরক্ষার মধ্যে থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদী, হিন্দুত্বা, ফাসিস্ত, সংঘী শক্তি ও বিজেপি সরকার তাদের সংস্কৃতি ও জীবনশৈলীর ওপর যে আক্রমণ হানছে, আমাদের আক্রমণ তারই বিরোধিতায়।”

ভেজি আর চিন্তাগুফা-বুরকপাল আক্রমণকে যথাযথ প্রেক্ষিতে দেখা এবং বোঝার জন্য ছত্তীসগঢ় ও দেশের সাংবাদিক এবং দেশপ্রেমী ও জনপন্থী শক্তির কাছে আবেদন জানিয়ে মাওবাদীদের মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা হিংসাশ্রয়ী মানুষ নই, কিন্তু প্রতিশোধ নিতে এবং সরকারের সমর্থনপুষ্ট সামন্ততান্ত্রিক শক্তি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কর্পোরেট হাউসগুলির বিরুদ্ধে শোষিত জনগণের সমর্থনে আমরা হিংসার আশ্রয় নিতে বাধ্য হই।”

সরকারি চাকরি ছেড়ে ‘জনগণের সংগ্রামে’ যোগ দেওয়ার জন্য ওই মুখপাত্র নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ান ও নিম্ন স্তরের পুলিশকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

মাওবাদীদের এই অডিও ক্লিপটি সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ছত্তীসগঢ় পুলিশের স্পেশ্যাল ডিরেক্টর জেনারেল ডি এম অবস্থি বলেছেন, তিনি বিষয়টি দেখবেন এবং এটা কতদূর প্রামাণ্য তা পরীক্ষা করবেন। ডিজিপি বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনী কোনো রকম অত্যাচার চালাচ্ছে না এবং এর কোনো  দৃষ্টান্ত নেই। যে ঘটনাগুলো নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে, মানবাধিকার কমিশন সেগুলি খতিয়ে দেখছে।”

শুনুন মাওবাদীদের বক্তব্য:

সৌজন্যে: দ্য হিন্দু

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here