ওয়েবডেস্ক: আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব কি শুধুই পদার্থ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সীমিত? আধুনিক সমাজ বিজ্ঞান কিন্তু বলে ইতিহাসও আপেক্ষিক। কারা বলছে, কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলছে, তার ওপর ভর করে রোজ রোজ বদলে যায় ইতিহাস। সাম্প্রতিক কালে টিপু সুলতানের জন্মজয়ন্তী পালন নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের পেছনেও রয়েছে ওই একই একপেশে ইতিহাসের ব্যাখ্যা। আগামী ১০ নভেম্বর কর্নাটক জুড়ে পালিত হওয়ার কথা টিপুজয়ন্তী। এমন সময় সে রাজ্যের এক বিজেপি নেতা তাঁদের দলের ট্র্যাডিশন বজায় রেখেই বলে ফেললেন ভারতের ইতিহাসে কালো দিন হিসেবে পালন হোক দিনটি। কারণ টিপু একজন ‘ধর্ষক’ এবং ‘গণহত্যাকারী’।

না, টিপু সুলতানের নীতি গভীরে গিয়ে উপলব্ধি করবেন আজকের রাজনীতিবিদরা, এমন আশা করা বৃথা। বিজেপি নেতার মন্তব্যের সমালোচনা হয়েছে সারা দেশ জুড়েই। তবে রাজনৈতিক স্তরে তা যতটুকু হয়েছে, ভোট ব্যাঙ্কের কথা মাথায় রেখেই। মুসলিম ভোট পেতে মরিয়া কংগ্রেস একে কাজে লাগাচ্ছে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে। ‘দুর্দিনে’ মুসলিমদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন কংগ্রেস নেতারা। অন্য দিকে ‘হিন্দু ভারত’-এর মহিমা ছড়াতে ব্যস্ত বিজেপি সমর্থন করছে টিপু-বিরোধীদের। কিন্তু ইতিহাস থেকে সরে আসছেন অথবা সরে থেকেছেন সবাই।

আরও পড়ুন: দেখে নিন ‘ধর্ষক এবং গণহত্যাকারী’ টিপু সুলতানকে নিয়ে কিছু অজানা তথ্য

টিপুর শাসনকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ইঙ্গ-মাইসোর যুদ্ধ। অথচ দেশে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় হিন্দুদের কোণঠাসা করতে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলাতেই তো পারতেন টিপু। করেননি। দক্ষিণ ভারতে নিজের আধিপত্য বিস্তারের সময় শৃঙ্গেরির মন্দির ধ্বংস করতেই পারতেন টিপু সুলতান। (নিজের আধিপত্য বিস্তারের সময় অন্য বংশের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক নিদর্শন শেষ করে দেওয়ার উদাহরণ মধ্যযুগের ইতিহাসে ঢের আছে)। কিন্তু হাজার বছর আগে শঙ্করাচার্যের তৈরি ‘হিন্দু’ মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন সবাই। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে। টিপু সেই ঐতিহ্য শুধু ধরে রাখেননি, নানা সময়ে উপহার পাঠাতেন মন্দিরে। একাধিক বার কর-মুক্ত জমিও দান করেছেন মন্দিরের উদ্দেশে। শৃঙ্গেরি মঠের স্বামীজিকে জগদগুরু বলে সম্বোধন করতেন তিনি।

এই ধর্মীয় ঔদার্যের পেছনে কিন্তু কোথাও ভোটব্যাঙ্কের সমীকরণ ছিল না। টিপুর সাম্রাজ্যকালেই বরং সব চেয়ে সমৃদ্ধি লাভ করেছিল এই মন্দির। যার ফলস্বরূপ মারাঠাদের চোখ পড়ে এর ওপর। হ্যাঁ, সেই মারাঠা, যাদের কিনা ভারতের প্রথম হিন্দু সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়ে থাকে। মন্দিরের সম্পত্তি লুঠ করেন মারাঠারা। একাধিক ব্রাহ্মণকে হত্যা করেন, পাশাপাশি নষ্ট করে ফেলেন হাজার বছরের পুরোনো বিগ্রহ। এই অবস্থায় মন্দিরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বামীজি চিঠি লেখেন টিপুকে। হতাশ করেননি সুলতান। হিন্দুদের দ্বারা আক্রান্ত এক মন্দির নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে মুসলিম সম্রাটের আর্থিক সাহায্যে, ভাবা যায়! এখন বরং ভাবা যায় ‘হিন্দু’ মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকলে রাজ্যের পর্যটন পুস্তিকা থেকে বাদ পড়তে পারে তাজমহলের নাম।

গত শতাব্দীর শেষ দশকে কর্নাটকে ‘হিন্দুত্ব’-এর রমরমা শুরু হল যখন, তখন থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীনতাসংগ্রামী টিপু সুলতান হয়ে গেলেন অত্যাচারী মুসলমান সম্রাট। হ্যাঁ টিপু সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করেছেন। যখন তখন যুদ্ধ করেছেন। নিঃসন্দেহে তিনি অপরাধী। কিন্তু ওই একই অপরাধে অপরাধী মারাঠারাও। টিপু বরাহ মন্দির আক্রমণ করে মাইসোর বংশের প্রতীক বদলেছিলেন। কিন্তু সেখানে ধর্মীয় নীতি প্রাধান্য পায়নি। নিজের আধিপত্য বিস্তার করাই ছিল মূল লক্ষ্য। টিপু যা যা করেছেন, তা ভালো না খারাপ, সে আলাদা প্রসঙ্গ। কিন্তু তাঁর পেছনে অহেতুক সাম্প্রদায়িক কারণ তুলে ধরার সচেষ্ট প্রয়াস রয়েছে। প্রশ্ন উঠুক সেখানেও।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here