alwar lynching

ওয়েবডেস্ক: গত বছর এপ্রিলে এই আলোয়ারেই গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছিল পেহলু খানের। তার পর আলোয়ারের পরিস্থিতি যে খুব একটা বদলায়নি সেটা প্রমাণিত হল গত শনিবার রাকবর খানের খুন হয়ে যাওয়ার ঘটনায়।

এই ঘটনার কিছু দিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট কড়া হাতে এই ঘটনাগুলি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ যে কারও কানেই যায়নি সেটা বোঝা গেল এই ঘটনায়। আলোয়ার থেকে হরিয়ানায় নিজের গ্রামে দু’টি গোরু নিয়ে যাচ্ছিলেন রাকবর এবং তাঁর বন্ধু আসলাম। পথে স্বঘোষিত গোরক্ষকদের হাতে আক্রান্ত হন তিনি। আসলাম কোনো রকম ভাবে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলেও, মৃত্যু হয় রাকবরের।

আরও পড়ুন গোরক্ষকদের তাণ্ডব বন্ধ করার দায় ঘুরিয়ে মুসলিমদের ওপরেই চাপালেন আরএসএস নেতা

এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে রাকবরের পরিবারে। গোরুগুলোকে শুধুমাত্র দুধ ব্যবসার জন্য রাকবর নিয়ে যাচ্ছিলেন সেটা পরিষ্কার করে দেন তাঁর স্ত্রী অশমীনা। তিনি বলেন, “আমদের সব থেকে ছোটো ছেলেটা সবে দু’বছরে পড়ল। কিছু দিন আগেই ও পরিষ্কার করে ‘আব্বা’ বলতে শিখেছে। রাকবর এই ঘটনায় এতটা খুশি ছিল যে পরের ঈদটা খুব ভালো ভাবে পালন করার কথা বলছিল। আলোয়ারের খানপুরে রাকবর গিয়েছিল ভালো ছাগলের জন্য কিন্তু সেখানে গিয়ে গোরুর দরদাম দেখে খুশি হয় সে। দুটো দুধেল গোরু কেনার আনন্দে আমাকে ফোন করে সে। বলে আমাদের এখন চারটে গোরু হয়ে যাবে। আমাদের ভাগ্য বদলে যাবে। আমাদের দুধের ব্যবসা আরও বড়ো হবে। আমাদের জীবন পালটে যাবে। কিন্তু কে জানত ঘটনাটা এ রকম দিকে মোড় নেবে। ওরা আমার সাতটা সন্তানকে অনাথ করে দিল।”

ঠিক কী হয়েছিল ঘটনাটা?

গোরক্ষকদের থেকে কোনো ভাবে পালিয়ে আসা আসলাম পুলিশের কাছে যে বয়ান দিয়েছেন তাতে তিনি সাত জন অভিযুক্তের কথা বলেছেন। তাঁর কথায়, অভিযুক্তদের হাতে লাঠি এবং অস্ত্রশস্ত্র ছিল। বিনা প্ররোচনায় তাঁদের ওপরে হামলা চালানো হয়।

পাঁচজন অভিযুক্তের নাম পুলিশের কাছে বলেছিলেন আসলাম। এঁদের মধ্যে তিনজন বিজয়, ধর্মেন্দ্র এবং নরেশ।

ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার গুরুগ্রাম-আলোয়ার রোড অবরোধ করেছিলেন রাকবারের গ্রামের বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ রাজস্থান থেকে শুধুমাত্র দুধ ব্যবসার জন্য গোরু নিয়ে আসা হলেও মুসলিমদের টার্গেট করা হয়।

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ

আলোয়ারের লালওয়ান্ডিতে যেখানে রাকবর এবং আসলামকে টার্গেট করা হয়, তার থেকে রামগড় প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র মাত্র চার কিমি দূরে। অথচ এই দূরত্ব পৌঁছোতে আড়াই ঘণ্টা লাগিয়ে দিয়েছিল পুলিশ। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রথম রাকবরকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। থানায় যখন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তখনও তাঁর জ্ঞান ছিল। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়।

আরও পড়ুন আলোয়ার গণপিটুনিকাণ্ডে পুলিশের ‘নিষ্ঠুরতা’ নিয়ে সরব রাহুল, তীব্র তোপ কেন্দ্রকে

পুলিশের বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ রয়েছে যে প্রথমে গোরুদের বাঁচাতেই গিয়েছিল তারা। কারণ শুক্রবার রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ তাদের কাছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তরফ থেকে দায়ের করা এফআইআরে বলা হয়, “কয়েকটি গোরু পাচার হচ্ছে।” সুতরাং আক্রান্তকে বাঁচাতে না, প্রথমে গোরু ‘পাচার’ রুখতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল পুলিশ।

এমনকি আহত রাকবরকে নিয়ে থানায় যাওয়ার পথে চায়ের জন্যও দাঁড়ায় তারা। চায়ের দোকানি লাল চাঁদ বলেন, “একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছিল। গাড়ি চালক বাইরে এসে চার কাপ চা নিয়ে গেল। গাড়ির মধ্যে কারা ছিল আমি জানি না।”

ভোর চারটে নাগাদ রাকবরকে নিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁছোয় পুলিশ। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইন-চার্জ ডঃ হাসান আলি খান বলেন, “ভোর চারটের সময়ে আমার কর্মীরা আমাকে ফোন করে। আমি দেখি একজন রোগী এসেছে, কিন্তু সে তখনই কার্যত মৃত। তার সঙ্গে তিনজন পুলিশকর্মী এবং আরও দু’জন ছিল। এই দু’জনের মধ্যে একজন শিখ ব্যক্তিও ছিল।” উল্লেখ্য, পরমজিৎ নামক সেই ব্যক্তিকে পরে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এই ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসায় রীতিমতো চাপে আলোয়ার পুলিশ। ঘটনায় অভিযুক্ত কেউই পার পাবে না বলে আশ্বস্ত করেছে আলোয়ারের পুলিশ সুপার রাজেন্দ্র সিংহ। তিনি বলেন, “আমরা তদন্তে সব দিক খতিয়ে দেখব। কোনো তরফ থেকে কোনো গাফিলতি খুঁজে পেলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ পার পাবে না।”

আরও পড়ুন গণপিটুনি রুখতে প্রয়োজনে আইন আনা হবে, লোকসভায় বললেন রাজনাথ

বিশেষ আমল দিচ্ছেন না কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা

এই ঘটনাকে সে ভাবে কোনো গুরুত্ব দিয়ে যে তাঁরা দেখছেন না, সেটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের কথায়। এই ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল বলেন, “এই ধরনের ঘটনা তো নতুন কিছু নয়। ভারতের ইতিহাসে এ রকম ঘটনার উদাহরণ অনেক আছে।” ১৯৮৪-এর শিখ বিরোধী দাঙ্গাকে সব থেকে বড়ো গণপিটুনির ঘটনা বলেও আখ্যা দেন তিনি। নরেন্দ্র মোদীর শাসনকে কালিমালিপ্ত করার জন্যই এই ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সৌজন্য: দ্য লজিকাল ইন্ডিয়ান

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here