হেগ: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই কুলভূষণ যাদবের মৃত্যুদণ্ড পাকিস্তান কার্যকর করে ফেলতে পারে, এই আশঙ্কা প্রকাশ করে ভারত ওই মৃত্যুদণ্ড অবিলম্বে স্থগিত রাখার দাবি জানাল।

চরবৃত্তির অভিযোগে ধৃত ও মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত প্রাক্তন ভারতীয় নৌ অফিসার কুলভূষণ যাদবের বিষয়টি নিয়ে সোমবার হেগে আইসিজে-র ১১ সদস্যবিশিষ্ট বেঞ্চের সামনে শুনানি চলে। দু’ দফায় দেড় ঘণ্টা করে মোট তিন ঘণ্টা সওয়াল-জবাব চলে। প্রথমে ভারতকেই বলার সুযোগ দেওয়া হয়। পরের দেড় ঘণ্টায় পাকিস্তান তার বক্তব্য পেশ করে।  এ দিনের শুনানির পরে অন্যতম বিচারক রনি আব্রাহাম বলেন, আদালত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার রায় দেবে। কবে এই রায় দেওয়া হবে তা যথা সময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। আইসিজে-র রায়  প্রতিপক্ষ দু’টি দেশই মানতে বাধ্য। এবং সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যায় না।

শুনানির শুরুতেই ভারতের বিদেশ দফতরের যুগ্ম সচিব দীপক মিত্তল বলেন, যাদব যথাযথ আইনি সহযোগিতা পাননি এবং তাঁকে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগও করতে দেওয়া হয়নি। পাকিস্তানের বিচারকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে মিত্তল বিচারকদের সঙ্গে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন।

শুনানিতে ভারতের আইনজীবী হরিশ সালভে বলেন, ভারত ভিয়েনা কনভেনশন মেনে চলে। কুলভূষণ যাদবের বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিনিধিদের দেখা করতে না দিয়ে পাকিস্তান ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে।

সালভে বলেন, “ভারত দৃঢ় ভাবে জানাচ্ছে যাদবকে তাঁর দেশের দূতাবাসের সাহায্য নিতে দেওয়া হয়নি। কেন তা দেওয়া হল না, পাকিস্তান তার কারণও জানায়নি। কুলভূষণের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ করা হয়েছে, ভারতকে তার কপিও দেওয়া হয়নি। সুতরাং অভিযোগগুলো সঠিক কিনা, ভারত তা খতিয়ে দেখার সুযোগও পায়নি। যে অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি হয়, সেই অভিযোগের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত রক্ষাকবচ থাকা দরকার। এ ব্যাপারে ভিয়েনা কনভেনশনে অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। ভারত দৃঢ় ভাবে মনে করে, ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করা সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে চুক্তি ও কনভেনশনের আওতায় যে সব বিষয় পড়ে, তার সব কিছু ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় পড়ে।”

ভারতের সওয়ালের জবাবে পাকিস্তানের আইনজীবী খওয়ার কুরেশি বলেন, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কুলভূষণকে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি বলে ভারত যে অভিযোগ করেছে, তা সঠিক নয়। ভিয়েনা কনভেনশন যুদ্ধবন্দিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, গুপ্তচরদের জন্য নয়। কুরেশির অভিযোগ, ভারত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতকে ‘রাজনৈতিক থিয়েটারের মঞ্চ’ হিসাবে ব্যবহার করছে।

উল্লেখ্য, ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রাক্তন অফিসার কুলভূষণ যাদবকে গত বছরের মার্চ মাসে বালোচিস্তান থেকে গ্রেফতার করে পাক সেনা। অভিযোগ, ভারতের হয়ে গুপ্তচরের কাজ করছিলেন তিনি। এক বছর বিচারের পর কিছু দিন আগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয় পাক সেনা আদালত। এই ঘটনায় উত্তেজনার পারদ চড়ে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে। ভারত দাবি করে ইরানে ব্যবসা করতেন কুলভূষণ, সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানকে কুলভূষণ যাদবের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখতে বলল আন্তর্জাতিক আদালত

এই তরজার মধ্যেই, কুলভূষণের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা বা এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলে ঘোষণা করার দাবিতে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয় ভারত। ভারতের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে, গত সপ্তাহে কুলভূষণের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখতে পাকিস্তানকে নির্দেশ দেয় হেগের আন্তর্জাতিক আদালত। যদিও সেই নির্দেশ তারা মানতে বাধ্য নয় বলে জানিয়েছে পাকিস্তান। কারণ, এটা তাদের ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র সঙ্গে জড়িত বিষয়।

১৮ বছর আগে, ১৯৯৯ সালে শেষ বার আন্তর্জাতিক আদালতে মুখোমুখি হয়েছিল ভারত-পাক। সে বার পাকিস্তানের নৌবাহিনীর একটি বিমানকে কচ্ছের রণ অঞ্চলে গুলি করে নামিয়েছিল ভারত। মৃত্যু হয়েছিল পাক নৌবাহিনীর ১৬ সদস্যের। ভারতের বক্তব্য ছিল, বিমানটি ভারতের আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছিল। ঘটনার প্রতিবাদে ৬ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যায় পাকিস্তান। অন্য দিকে ভারতের বক্তব্য ছিল, ঘটনার জন্য পাকিস্তান ‘একাই দায়ী’, আন্তর্জাতিক আদালতের কোনো অধিকার নেই বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করার। ২০০০ সালে ৪ দিনের বিচার প্রক্রিয়া শেষে ভারতের দাবি মেনে নেয় আদালত।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here