sambhu

 

শম্ভু সেন: 

রেলের আধিকারিকরা বলছেন উত্তর ভারতে ট্রেনগুলো দেড় থেকে আঠারো ঘণ্টা দেরিতে চলছে। হিসাব যা-ই হোক, আসল কথা হল শীত পড়তে না পড়তেই কুয়াশার জন্য বিভিন্ন ট্রেন অবিশ্বাস্য দেরিতে চলছে। যার ফলে বহু ট্রেন বাতিল করতে হচ্ছে।

রেলের তরফে বলা হয়েছে, শুক্রবার উত্তর ভারতে ৯৫টি ট্রেন হয় বিলম্বে চলছে আর না হয় তাদের ‘রিশিডিউল’ করা হয়েছে। অর্থাৎ ট্রেন ছাড়ার সময় পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিউদিল্লি –কালকা শতাব্দী শুক্রবার ৮ ঘণ্টা ৪০ মিনিট দেরিতে কালকায় পৌঁছেছে। যে ট্রেন সকাল পৌনে ১২টা নাগাদ পৌঁছনোর কথা, সেই ট্রেন পৌঁছেছে রাত ৮টা ২৫ মিনিটে। যাত্রীদের হয়রানির এক শেষ। এখানেই শেষ নয়, এর পরিণতিস্বরূপ শনিবার এই ট্রেন বাতিল হয়েছে।

অতনু মিত্র শুক্রবার সপরিবার এলাহাবাদ থেকে হাওড়া ফিরছেন। তাদের ট্রেন দিল্লি কালকা মেল বিকেল ৫-২০ মিনিটে এলাহাবাদ আসার কথা। রাত্রি সাড়ে ১১টা নাগাদ ফোনে জানালেন তখনও সেই ট্রেন এলাহাবাদ থেকে প্রায় ১০০ কিমি দূরে। স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলতে পারেননি শেষ পর্যন্ত কত রাতে ট্রেন এসে পৌঁছবে। অবশেষে নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টা পর, রাত আড়াইতে নাগাদ এলাহাবাদ পৌঁছোয় কালকা। উদয়ন আভা তুফান এক্সপ্রেসের রাত ১০টা নাগাদ এলাহাবাদ এসে পৌঁছনোর কথা। ন্যাশনাল ট্রেন এনকোয়ারি বলছে সেই ট্রেন ১৫ ঘণ্টা দেরিতে চলছে। তবে এই বিলম্ব যে আরও বাড়বে না সেই নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না রেল কর্তৃপক্ষ। 

এখন কোন কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, সেই হিসাবটাই ঘুলিয়ে ফেলেছে ভারতীয় রেল। রেল লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ হয় না, আদ্যিকালের কোচ দিয়ে ট্রেন চালানো হয়, সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ হয় না, ট্রেনে যাত্রীদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। এর ওপর শীত পড়তেই না পড়তেই উত্তর ভারতে অত্যধিক বিলম্বে ট্রেন চলছে। এই রোগ চিরন্তন, আদ্যিকালের। কিন্তু এই একুশ শতকেও এই রোগ নিরাময়ের কোনো চেষ্টা হয় না। এই সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ না করে এখন নজর পড়েছে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজের দিকে, যার সঙ্গে সাধারণ ট্রেনযাত্রীদের দূরতম সম্পর্ক। কামরায় ওয়াইফাই-এর ব্যবস্থা, স্টেশনে স্টেশনে স্বচ্ছ ভারত অভিযান, লোকসান দিয়ে দোতলা ট্রেন চালানো, প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন সেমি-বুলেট, বুলেট ট্রেন চালানোর বন্দোবস্ত করা ইত্যাদি। রেলের রেললাইন, কোচ, সিগন্যালিং ইত্যাদি যে সম্পদ আছে তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টাকা খরচ করা হচ্ছে না। ক্ষয়ে যাওয়া সম্পদ বদলানোর কাজ হচ্ছে না। ট্রেনে পুরোনো কোচের জায়গায় এলএইচবি কোচ দেওয়ার কাজ খুব ঢিমেতালে চলছে। অতি সম্প্রতি কানপুরের কাছে ইন্দোর-পটনা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ১৫০ জন যাত্রীর। লাইনে ফাটল ছিল বলে প্রাথমিক ভাবে অনুমান। উপরন্তু কোচগুলো ছিল সেই ইন্টিগ্র্যাল কোচ ফ্যাক্টরির বানানো।

রেল কারিগরি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুরোনো ধাঁচের আইসিএফ (ইন্টিগ্র্যাল কোচ ফ্যাক্টরি) কোচগুলো বদলে ফেলে সব ট্রেন যদি লিঙ্কে হফমান বুশ (এলএইচবি) কোচ দিয়ে চালানো যেত, তা হলে ইন্দোর-পটনা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনা এত মারাত্মক হত না। ২০১১-এর মধ্যে দফায় দফায় সব মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেনের কোচ বদলে ফেলা হবে বলে নীতিশ কুমারের আমলে ভারতীয় রেল পরিকল্পনা করেছিল। এই এলএইচবি কোচ জার্মান প্রযুক্তিতে তৈরি। এর সব চেয়ে বড়ো সুবিধা হল, ট্রেন বেলাইন হলে বা দুটি ট্রেনে সংঘর্ষ হলে এই কোচ উলটে যায় না, বা অন্যের উপরে চেপে যায় না, মাটিতে বসে যায়। এই কোচে আগুন লাগলে, কোনো বিষাক্ত বা কালো ধোঁয়া বেরোয় না। আইসিএফ কোচগুলো দুর্ঘটনাপ্রবণ। এগুলো ঘণ্টায় ৮০-৯০ কিমির বেশি গতিতে যাওয়ার কথা নয়। অথচ সে দিন ইন্দোর-পটনা এক্সপ্রেস চলছিল ঘণ্টায় ১১০ কিমি গতিতে। রেললাইনে ছোটোখাটো ফাটল থাকলেও এই আইসিএফ উলটে যেতে পারে, বড়ো দুর্ঘটনা হলে অন্য কোচের ছাদে উঠে পড়তে পারে।

আর খরচের একটা ব্যাপার আছে। একটা পুরোনো ধাঁচের কোচ তৈরি করতে যেখানে দেড় কোটি টাকা খরচ হয়, সেখানে একটি এলএইচবি কোচ তৈরি করতে আড়াই কোটি টাকা খরচ হয়। মজার কথা হল রাজধানী, শতাব্দী, দুরন্ত এক্সপ্রেসের মতো মুষ্টিমেয় কিছু ট্রেনে এই জার্মান কোচ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এই সব ট্রেন তো রেলের মোট ট্রেন সংখ্যার কয়েক শতাংশ মাত্র। আমজনতার যে সব ট্রেন, সেগুলো চলছে সেই আইসিএফ কোচে। ফলে এই সব ট্রেনে দুর্ঘটনাও হয় বেশি।

কিন্তু রেলের তো ভাঁড়ে মা ভবানী, দেউলিয়া অবস্থা। ভারতীয় রেলের আর্থিক অবস্থা কেমন, সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রাক্তন রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী।           

দীনেশ ত্রিবেদী পরিষ্কার হিসেব দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কী ভাবে ভারতীয় রেল দেউলিয়া হওয়ার মুখে পৌঁছে গিয়েছে। রেলের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে কিছু দিনের মধ্যেই কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য রেলকে টাকা ধার করতে হবে। কারণ রেলের মোট ক্ষতির পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি দাঁড়িয়েছে। রেলের টাকা নেই, তাই ডেপ্রিসিয়েশন রিজার্ভ ফান্ড (ডিআরএফ) আর ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ডিএফ) ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে। রেল চালাতে দৈনিক যা খরচ হয়, তা জোগাড় করতে পারছে না রেল। আদ্যিকালের যন্ত্রপাতি-সরঞ্জাম (রেললাইন, কোচ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা ইত্যাদি) বদলানোর জন্য ডিআরএফ-এ টাকা রাখতে হয়। এই পুরোনো সরঞ্জাম বদলের জন্য বছরে গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। তার বদলে ২০১৬-এর বাজেটে ডিআরএফ-এ ৩২০০ কোটি টাকার সংস্থান করা হয়েছে। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে জেনেবুঝে রেলে সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে আপস করা হচ্ছে, পুরোনো সরঞ্জাম বদলের কাজ স্থগিত থেকে যাচ্ছে।

আর এই অর্থের অভাবের জন্য রেলে বহু পদে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বন্ধ। কর্মীর অভাবে রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না, নজরদারি হচ্ছে না। যাঁরা লাইনে নেমে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন সেই গ্যাংম্যান, ট্র্যাকম্যান বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের পদ ক্রমশই উঠিয়ে দিচ্ছে রেল। রেল সূত্রের খবর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেলমন্ত্রিত্বের সময় থেকে সুরেশ প্রভুর জমানা পর্যন্ত এক লক্ষেরও বেশি চতুর্থ শ্রেণির পদ খালি রয়ে গিয়েছে। এই সব কর্মীর কাজই হলো, পায়ে হেঁটে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত লাইন পরীক্ষা করা। অল ইন্ডিয়া রেলওয়েমেনস ফেডারেশনের সভাপতি শিবগোপাল মিশ্রের মতে, এই সব কর্মী এতটাই অভিজ্ঞ হন যে, লাইনে ধাতব দণ্ড দিয়ে আওয়াজ করে বুঝে যান তা ঠিক আছে কি না। কিন্তু নতুন নিয়োগ প্রায় বন্ধ থাকায় এখন একজন গ্যাংম্যানকেই দু’-তিন জনের কাজ করতে হচ্ছে। ফলে কাজের ক্ষেত্রে ত্রুটি থেকে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকছে। ফলে সবাই এখন বলতে শুরু করেছে, রেলের নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা ওই পদগুলো উঠিয়ে দেওয়ায় রেলের নিরাপত্তাও কমছে আর সেটাই স্বাভাবিক।

কুয়াশায় ট্রেন চালানোর ব্যাপারটির সঙ্গেও যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি জড়িত। যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে সেটা সুনিশ্চিত করতে গিয়ে ট্রেন পরিষেবাই বানচাল হতে বসেছে। প্রতি শীতেই এটা হয়, এ বারেও তার অন্যথা হচ্ছে না। প্রতিবারই নড়েচড়ে বসে রেল কর্তৃপক্ষ। কুয়াশায় ঠিকঠাক ট্রেন চালানোর ব্যাপারটি কী করে সম্ভব করা যায় তা নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। এখন অন্তত তিন মাস গোটা উত্তর ভারতে এই অবস্থা চলবে। নাকাল হবেন সাধারণ যাত্রী। কিন্তু ভারতীয় রেলের ঘুম কবে ভাঙবে প্রশ্ন সেটাই।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here