জয়ন্ত মণ্ডল

ক’দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট খুব ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। যেখানে এক দিকে হিটলার আর তাঁরই পাশে মোদীর ছবি। উপরে প্রশ্ন- “বলুন তো হিটলারের সঙ্গে মোদীর তফাত কী”? উত্তরও লিখে দিয়েছেন, পোস্ট-কারী নিজেই। “হিটলার একবার সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন”। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ ধরনের অনেক ‘কুৎসা’ই হয়ে থাকে। আবার কুৎসা-রোধে আইনি পদক্ষেপের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এই পোস্টটার জন্য কেউ আটক হয়েছে কি না, তা জানা নেই।

একই ভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিরও দীর্ঘদিনের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রেডিওতে অনুষ্ঠান করেন। তাঁর দলের নেতারা গ্রামের মানুষের জন্য রেডিও বিলি করেন। মন-কি-বাতে হাজার হাজার শব্দ উচ্চারণ করেন, অথচ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন না। এ হেন অভিযোগ সংবাদিকদের সামনে বসেই ক’দিন আগে (গত ১৪ ডিসেম্বর, সুপ্রিম কোর্টের রাফাল রায়ের দিন) তুলেছিলেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী।

সেই প্রধানমন্ত্রীই টানা ৯৫ মিনিট অনর্গল বলে গেলেন। তবে সাংবাদিক বৈঠকে নয়। একটি বৃহৎ সংবাদ সংস্থার সম্পাদকের সামনে। সেই সাক্ষাৎকার ভিডিওয়। যার পুরোটাই দেখার সৌভাগ্য হয়নি অনেকের। তবে সংস্থার টুইটার হ্যান্ডলে বাছাই করা অংশের চলমান সাক্ষাৎকারের অংশ বিশেষ দর্শনের সুযোগের হয়েছে টুইতারিয়েতদের। তাঁরাই এখন তির্যক সব প্রশ্ন তুলছেন।

সেই বাছা বাছা অংশ নিয়ে বড়ো-ছোটো-অতিছোটো সংবাদ মাধ্যমগুলিও গোগ্রাসে গেলানোর চেষ্টা করেছে পাঠক-দর্শককুলকে। সে সব প্রতিবেদনও দিনভর ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখানেও সেই তির্যক প্রশ্ন। মোদী মুখ খুললেন বটে, কিন্তু জ্বলন্ত ইস্যুগুলোকে বড্ড বেশি এড়িয়ে গেলেন। ক্ষমতায় আসার আগে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর সাড়ে চার বছরে সে সবের কতটা পূরণ করতে সক্ষম হলেন, সে সবের ধার ধারলেন না। বদলে বলে চললেন, তিনি দেশের জনতা (তাঁর কথায় এক দিকে জনতা, অন্য দিকে মহাজোট)-র জন্য, মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য কী কী মহান কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত করেছেন, তারই ফিরিস্তি। এ সব কথা উঠে আসছে সোশ্যাল মিডিয়াতেই।

উল্লেখ্য, একই দিনে কংগ্রেস নেতা আনন্দ শর্মাও মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। টুইট করে শর্মা জানান, “নতুন বছরের প্রথম দিনটাতেও প্রধানমন্ত্রী মানুষকে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিতে ছাড়লেন না। তবে সাজানো একটা সাক্ষাৎকার দিয়ে মানুষকে বোকা বানানো যাবে না। সাহস থাকলে সংসদে আমাদের মুখোমুখি হোন।”

বছরের প্রথম দিনের ওই সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে নোটবন্দি থেকে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, রামমন্দির থেকে রাফাল চুক্তি, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর উর্জিত পটেলের পদত্যাগের আসলি কারণ, অথবা ৭০ বছরে একটা পরিবার কী ভাবে দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে ইত্যাদি প্রায় সববিষয়ই ছুঁয়ে গিয়েছেন তিনি।

এ ধরনের বক্তব্য থেকে একটা কথা পরিষ্কার, প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে ওই সমস্ত ইস্যু নি‌ঃসৃত হলেও আদতে তিনি বলছেন বিজেপিরই কথা। বলতেই পারেন। কিন্তু তাই বলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা বিজেপির উদ্দেশে যে সব অভিযোগ বরাবর করে থাকে, সে সবের জবাব দিতে হল শেষে কি না তাঁকে! তাঁর দল আছে, দলের তাবড় নেতৃত্ব আছেন, তাঁরাই তো যথেষ্ট। সোশ্যাল মিডিয়া বলছে, তিনি কী করবেন বলেছিলেন, আর কী করেছেন, সে সবের বদলে ওই কংগ্রেস কী অভিযোগ করল অথবা রাহুল গান্ধী কী অভিযোগ করলেন, সে সবের জবাব দেওয়ার জন্য দেড়ঘণ্টার বেশি সময় নষ্টই করলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সব নাকি ‘গটআপ’! কিন্তু ওই সংবাদ সংস্থা তো বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদেরও সাক্ষাৎকার যত্ন সহকারে প্রকাশ করে। তখন তো কেউ এ ধরনের অভিযোগ করেন না। তা হলে প্রধানমন্ত্রীর বেলায় ‘গটআপ’ হতে যাবে কেন, এ ভাবে কুৎসা না ছড়ানোই ভালো।

কেন, ‘গটআপ’ কেন? কেউ কেউ এমনও বলছেন, সাক্ষাৎকার দেখে না কি তাঁদের মনে হয়েছে, ওই অনুষ্ঠানে ‘প্রশ্নকর্তা’ আর ‘উত্তরদাতা’ একজনই!

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here