ভারতে বর্ষার হাল: বন্যা-ধসে উত্তরপূর্বে মৃত ৮০ , অনাবৃষ্টির কবলে দক্ষিণ ভারত

0
568
শ্রয়ণ সেন

যত দিন এগোচ্ছে ভারতে বর্ষার খামখেয়ালিপনা ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। দেশের এক প্রান্ত যখন বন্যার করাল গ্রাসে, অন্য প্রান্ত তখন এক ফোঁটা জলের জন্য ছটফট করছে। এক দিকে যখন বেশি বৃষ্টির কোঙ্কন উপকূলে এখনও উল্লেখযোগ্য কোনো বৃষ্টি হয়নি, তখন মরুরাজ্য রাজস্থানে বর্ষা বাড়তি।

শুধু পশ্চিমবঙ্গের কথাই ধরা যাক। গত এক সপ্তাহে ভালো বৃষ্টির ফলে যখন কলকাতায় বৃষ্টি তিরিশ শতাংশ বাড়তি, ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গের অন্য সব জেলায় জারি রয়েছে বৃষ্টির ঘাটতি। রাজ্যের ২৩টি জেলার মধ্যে ছ’টি জেলায় বৃষ্টি বাড়তি, স্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে আটটি জেলায় এবং বাকি ন’টি জেলায় বৃষ্টি এখন ঘাটতিতে চলছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, সারা ভারতেরই বৃষ্টির দশা অনেকটা এ রকমই। অথচ পুরো ভারতের হিসেব নিলে দেখা যাবে দেশে বর্ষার ঘাটতি মাত্র এক শতাংশ।

এক বার দেখে নেওয়া যাক দেশের অঞ্চলভিত্তিক বর্ষার হাল

পূর্ব-উত্তরপূর্ব ভারত: বন্যায় উত্তরপূর্বে মৃত ৮০, বৃষ্টির ঘাটতি ঝাড়খণ্ডে

ভারতের এই অঞ্চলেই সব থেকে বেশি খামখেয়ালি আচরণ করছে বর্ষা। এক দিকে যখন বন্যা এবং ধসের কবলে পড়েছে অসম, অরুণাচল প্রদেশ এবং মণিপুর, তখন বৃষ্টি খুব কম ঝাড়খণ্ডে।

বর্ষার শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত বন্যায় অসম-অরুণাচল-মণিপুরে মৃতের সংখ্যা ৮০ ছুঁয়েছে। তিন রাজ্য মিলিয়ে ৫৮টি জেলা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছে। ব্রহ্মপুত্র এবং তার শাখা নদীগুলি ফুলেফেঁপে ওঠায় জলের তলায় চলে গিয়েছে অসমের আড়াই হাজার গ্রাম। জলের তলায় চলে গিয়েছে এক লক্ষ ছ’হাজার লক্ষ হেক্টর কৃষিজমি। ২৩১টি ত্রাণশিবিরে সরানো হয়েছে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের ৭৫ শতাংশই চলে গিয়েছে জলের তলায়।

অন্য দিকে মণিপুরে বন্যা এবং ধসের ফলে ১৩১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের পাঁচটি জেলায় মোট কুড়ি শতাংশ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত। অন্য দিকে ধসে বিপর্যস্ত অরুণাচল প্রদেশের জনজীবন। অসম থেকে অরুণাচল যাওয়ার তিনটে রাস্তার মধ্যে দু’টি রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রাজধানী ইটানগরের ধসপ্রবণ এলাকাগুলি থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানোর নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিন রাজ্য পরিদর্শন করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব’ আখ্যা দিয়েছেন।

অন্য দিকে ঝাড়খণ্ডে বৃষ্টির ঘাটতি কুড়ি শতাংশ ছুঁয়েছে। জুলাই মাসের শেষের দিনগুলোও যদি বৃষ্টি না হয়, তা হলে রাজ্যে খরা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে আবহাওয়া দফতরের আশ্বাস, জুলাইয়ের দ্বিতীয় ভাগে ভালো বৃষ্টি পাবে রাজ্য। তবে তুলনায় বৃষ্টির অবস্থা খুবই ভালো বিহারে। এখানে বর্ষা এখন চোদ্দো শতাংশ বাড়তি।

উত্তর ভারত: বৃষ্টি বাড়তি, আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা

বৃষ্টির পরিমাণ ধরলে সব থেকে ভালো জায়গায় রয়েছে উত্তর ভারত। আবহাওয়া দফতরের বৃহস্পতিবারের হিসেব বলছে বেশির ভাগ অঞ্চলেই বৃষ্টি বাড়তি। বিশেষ করে কাশ্মীর এবং পশ্চিম রাজস্থানে, সেখানে বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের থেকে যথাক্রমে ৭৩ এবং ৬২ শতাংশ বেশি। অন্য দিকে স্বাভাবিকের থেকে যথাক্রমে ৩৭ শতাংশ এবং ৪৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে পঞ্জাব এবং হরিয়ানায়। স্বাভাবিকের থেকে বাড়তি বৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য রাজ্য উত্তরাখণ্ড এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে। শুধুমাত্র হিমাচল প্রদেশ, পূর্ব রাজস্থান এবং পূর্ব উত্তরপ্রদেশে এখনও পর্যন্ত বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের কোঠায় থাকলেও আগামী কয়েক দিনের যা পূর্বাভাস, তাতে সেই অঞ্চলগুলিতেও স্বাভাবিকের মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বর্ষা।

এখনও পর্যন্ত বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও গঙ্গা, যমুনা এবং বাকি নদীগুলিতে জলস্তর বাড়তে শুরু করেছে। বৃষ্টি চলতে থাকলে বন্যার মুখোমুখি হতে পারে উত্তরভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা। ধসের কবলে পড়তে পারে পার্বত্য রাজ্যগুলি।

মধ্য এবং পশ্চিম ভারত: ঘাটতি থাকলেও, পরিস্থিতির ক্রমশ উন্নতি

এই অঞ্চলে এক দিকে যেমন রয়েছে অত্যধিক বৃষ্টি হওয়া কোঙ্কন উপকূল, তেমনই রয়েছে অনাবৃষ্টির কারণে কৃষক আত্মহত্যার জন্য কুখ্যাত বিদর্ভ অঞ্চল।  এ বার এখনও পর্যন্ত কোঙ্কন উপকূলে বৃষ্টি স্বাভাবিক হলেও, বাড়তি বৃষ্টি হওয়াই রেওয়াজ। অন্য দিকে বিদর্ভ অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি পৌঁছেছে ২৭ শতাংশে। পশ্চিম মধ্যপ্রদেশের অবস্থাও সঙ্গিন। এখানে বৃষ্টির ঘাটতি ২২ শতাংশ। উল্লেখ্য, কিছু দিন আগে কৃষক বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল যে মান্দসৌর, সেই শহরও এই অঞ্চলেও অবস্থিত। অন্য দিকে বর্ষা এক্কেবারে স্বাভাবিক গুজরাতে।

তবে বৃষ্টির ঘাটতিতে থাকা এলাকার জন্য সুখবর। এই মুহূর্তে একটি নিম্নচাপ রয়েছে পশ্চিম মধ্যপ্রদেশের ওপর। এর ফলে আগামী ২-৩ দিন মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত এবং মহারাষ্ট্র জুড়ে ভারী থেকে অতি ভারী তো বটেই, এমনকি চরম অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দফতর।

দক্ষিণ ভারত: জলের আকাল কেরল, কর্নাটক, তামিলনাড়ুতে

জলের সঙ্কটের জন্য কিছু দিন আগেই খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিল চেন্নাই। জুন থেকে সেপ্টেম্বর, এই চার মাস এমনিতেও খুব একটা বেশি বৃষ্টি হয় না তামিলনাড়ুতে। কিন্তু এ বার পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে গত বর্ষাতেও ওই অঞ্চলে বৃষ্টি না হওয়ায়। তামিলনাড়ুতে স্বাভাবিক ভাবেই কম বৃষ্টি হলেও, কেরল অন্যতম বেশি বৃষ্টির রাজ্য। কিন্তু সেখানে এ বার বৃষ্টির ঘাটতি ২৪ শতাংশ। তবে এ বারই নতুন নয়, বেশ কয়েক বছর ধরেই বৃষ্টির ঘাটতির মুখে পড়ছে কেরল। একই অবস্থা দক্ষিণ কর্নাটকে। সেখানে বৃষ্টির ঘাটতি ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। আবহাওয়া দফতরের মতে এখনই দক্ষিণ কর্নাটক এবং কেরলে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। পরিস্থিতি এ রকম চলতে থাকলে রাজ্যগুলিতে খরা ঘোষণা করার পথে হাঁটতে পারে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার।

তবে বর্ষা স্বাভাবিক আচরণ করছে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলঙ্গানায়। উল্লেখ্য, বিগত কয়েক বছরে কমবৃষ্টি পাচ্ছে এই দুই রাজ্য। সেখানে এ বারের পরিস্থিতি বেশ আশাব্যঞ্জক। আগামী ৩-৪ দিনেও এখানে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়ে রেখেছে আবহাওয়া দফতর।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here