justice kolse-patil and justice sawant
বিচারপতি কোলসে-পাটিল ও বিচারপতি সবন্ত। ছবি সৌজন্যে স্ক্রল.ইন।

ওয়েবডেস্ক: ভিমা-কোরেগাওঁয়ে জাতপাত নিয়ে সংঘর্ষ ঘটার ঠিক আগের দিন, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পুনেতে কারা এলগার পরিষদের আয়োজন করেছিলেন?

পুনে পুলিশ জানিয়েছে, পরিষদের আয়োজন করেছিলেন নিষিদ্ধ মাওবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যরা। উদ্দেশ্য ছিল, “বিদ্রোহী চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দেওয়া”, ভিমা-কোরেগাওঁয়ে হিংসায় উসকানি দেওয়া এবং “সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে” দেশ জুড়ে “ফ্যাসিস্ট-বিরোধী ফ্রন্ট” গঠন করা।

কিন্তু পুনের দুই খ্যাতিমান বিচারক প্রাক্তন বিচারপতিদ্বয় বি জি কোলসে-পাটিল এবং পি বি সবন্ত জানিয়েছেন, তাঁরাই এলগার পরিষদের “প্রধান সংগঠক এবং একমাত্র তহবিলদাতা”। বিচারপতি কোলসে-পাটিল বলেন, “আমরা গোড়া থেকেই খোলাখুলি এ কথা বলে আসছি।” চরমপন্থার বিরুদ্ধে সক্রিয় কর্মী হিসাবে কাজ করার জন্য কোলসে-পাটিল ১৯৯০ সালে বোম্বে হাইকোর্টের বিচারপতির পদ থেকে অবসর নেন। “সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা ছড়িয়ে দিতেই আমরা এলগার পরিষদের আয়োজন করেছিলাম”, জানান কোলসে-পাটিল।

আরও পড়ুন পাঁচ সমাজকর্মীর পর মাওবাদী-ষড়ষন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে পুলিশের নজরে একাধিক কংগ্রেস নেতা!

ভিমা-কোরেগাওঁয়ের হিংসাত্মক ঘটনায় এক ব্যক্তি প্রাণ হারান। এলগার পরিষদে যে বৈপ্লবিক বক্তৃতা দেওয়া হয়েছিল সেই বক্তৃতাকে ভিমা-কোরেগাওঁয়ের হিংসাত্মক ঘটনার জন্য দায়ী করে পুনের এক ব্যবসায়ী জানুয়ারিতে একটি এফআইআর দায়ের করেন। তখন থেকেই পুনে পুলিশ সারা দেশ জুড়ে বেশ কিছু মানবাধিকার কর্মীর বাড়িতে হানা দিয়েছে। দশ জন সক্রিয় কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন ভরভরা রাও, গৌতম নবলখা, সুধা ভরদ্বাজ, অরুণ ফেরেরা এবং ভার্মন গনজালভেস। এঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ, এঁরা সবাই নিষিদ্ধ মাওবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির “সক্রিয় সদস্য”। এমনকি পুলিশের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে হত্যার ষড়যন্ত্রে এঁরা যুক্ত।

বিচারপতি সবন্ত ও বিচারপতি কোলসে-পাটিলও মনে করেন ষড়যন্ত্র একটা আছে, তবে তা হল নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির নির্দেশিত এবং সেই ষড়যন্ত্র হল রাষ্ট্রের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে যাঁরা খোলাখুলি বলেন সেই সব সক্রিয় কর্মীকে গ্রেফতার করে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া।

আরও পড়ুন ‘শোবার ঘরের দরজা খুলে রেখে ঘুমোন’, গৃহবন্দি সমাজকর্মীর মহিলা সঙ্গীকে বলল পুলিশ!

বিচারপতি কোলসে-পাটিল বলেন, “যে সব সক্রিয় কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁদের বেশির ভাগের সঙ্গে এলগার পরিষদের কোনো সম্পর্ক নেই।” এবং তিনি দাবি করেন, এঁদের গ্রেফতার হওয়ার আগে ভিমা-কোরেগাঁও মামলায় অভিযুক্তদের বেশির ভাগকেই তিনি চিনতেন না। “তবে হ্যাঁ, আমরা খোলাখুলি লোককে বলি আমরা বামপন্থী এবং যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁরাও মোটামুটি আমাদের আদর্শেই বিশ্বাস করেন। তাঁরা যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ।”

আদালতে পেশ করার দিন ধৃত ১০ জনের বিরুদ্ধে পুনে পুলিশ সুদূরপ্রসারী অভিযোগ আনার পরে স্ক্রল.ইন-কে বিচারপতি কোলসে-পাটিল এবং বিচারপতি সবন্ত সব কিছু ব্যাখ্যা করেন। তাঁদের বক্তব্য, আসলে সরকার বিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করতে চায়। সেই জন্যই ভিমা-কোরেগাঁওয়ের ঘটনাকে সামনে রেখে এই গ্রেফতারি। কেন তাঁরা এ রকম বিশ্বাস করেন, তা তাঁরা বুঝিয়ে বলেন স্ক্রল.ইন-কে।

“আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সংবিধানকে রক্ষা করা”

হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার আগে কোলসে-পাটিল যেমন সরকারি কৌঁসুলি ছিলেন ঠিক তেমনই ছিলেন বিবাদী পক্ষের আইনজীবী। ৪৭ বছর বয়সে তিনি অবসর নেন। এবং গত ২৮ বছর ধরে বিভিন্ন গণ আন্দোলনের, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষদের আন্দোলনের জন্য প্রচার চালাচ্ছেন।

বিচারপতি সবন্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসাবে ১৯৯৫ সালে অবসর নেন। তার পর থেকে তিনি সামাজিক সক্রিয়তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন। যে তিন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গা নিয়ে স্বাধীন ভাবে তদন্ত করেছিলেন, বিচারপতি সবন্ত তাঁদের অন্যতম। তাঁদের সেই রিপোর্টে গুজরাতের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর তীব্র সমালোচনা করা হয়।

কোলসে-পাটিল বলেন, সেই থেকে তিনি এবং সবন্ত ভারতে হিন্দুত্ব শক্তির বিরুদ্ধে এক যোগে কাজ করে যাচ্ছেন। “আমরা যা করি কেন তা সরকার পচ্ছন্দ করে না, তার প্রেক্ষাপট হল এইটাই”, বলেন কোলসে-পাটিল।

আরও পড়ুন ‘আইনের ওপরে পূর্ণ আস্থা রয়েছে,’ হায়দরাবাদে ফিরে বললেন ভরভরা রাও

কোলসে-পাটিল বলেন, এলগার পরিষদ প্রথম নয় যে তাঁরা সাম্প্রদায়িকতা এবং হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি নিল। “পুনের শনিবারওয়াড়ার সেই জায়গাতেই ২০১৫ সালের অক্টোবরে আমরা এমনই একটা কর্মসূচি নিয়েছিলাম”, জানালেন কোলসে-পাটিল। সেই কর্মসূচিতে আরএসএস-মুক্ত ভারত গড়ার ডাক দেওয়া হয়েছিল।

হিন্দুত্ব গোষ্ঠীগুলির, বিশেষ করে গোরক্ষকদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ বাড়ার কারণে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা মনে করেছিলেন, তাঁদের নিজেদের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আরও বড়ো মাপের কর্মসূচি নেওয়া দরকার। তাঁরা ‘এলগার পরিষদ’ নামটা বেছে নিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন বাংলাদেশ যা আজ ভাবে, ভারত ভাবে কাল! গ্রেফতারি প্রসঙ্গে তীব্র কটাক্ষ তসলিমার

“‘এলগার’ কথার মানে হল সজোর আমন্ত্রণ বা সজোর ঘোষণা। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সংবিধান ও জাতিকে বাঁচানো”, বললেন বিচারপতি সবন্ত। সবন্ত অবশ্য অসুস্থতার জন্য সে দিনের সমাবেশে যেতে পারেননি । “দক্ষিণপন্থী শক্তি আমাদের বর্তমান সংবিধানকে মানে না। তারা না বিশ্বাস করে গণতন্ত্রে, না বিশ্বাস করে সমাজতন্ত্রে, না বিশ্বাস করে ধর্ম নিরপেক্ষতায়।”

speakers in elgaar parishad
এলগার পরিষদে জিগনেশ মেবানি (একেবারে বাঁ দিকে), রাধিকা বেমুলা (বাঁ দিক থেকে তৃতীয়), ওমর খালিদ (একেবারে ডান দিকে) প্রমুখ। ছবি সৌজন্যে স্ক্রল.ইন।

কৌশলগত কারণেই সবন্ত এবং কোলসে-পাটিল এলগার পরিষদের দিন হিসাবে ৩১ ডিসেম্বর বেছে নিয়েছিলেন। কারণ তার পরের দিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ দলিত নাগরিকের পুনের কাছে ভিমা-কোরেগাঁওয়ে আসার কথা, ১৮১৮ সালের সেই ঘটনার ২০০ বছর পূর্তি উদযাপন করতে। ২০০ বছর আগে এই দিনটিতে মূলত মাহারদের এক বাহিনী নিয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তুলনায় শক্তিধর পেশোয়া বাহিনীকে যুদ্ধে পরাস্ত করেছিল, জাতপাতের নীতি নিয়ে চলার জন্য যে পেশোয়া রাজত্বের যথেষ্ট কুখ্যাতি ছিল।

“যে হেতু একই আদর্শের মানুষজন ভিমা-কোরেগাঁওয়ে ২০০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে শামিল হতে যাচ্ছে সে হেতু কবীর কলা মঞ্চের (সাংস্কৃতিক সংগঠন) (লেখক) সুধীর ধওয়ালে এবং আরও কয়েকটি সংগঠনকে অনুরোধ করেছিলাম এলগার পরিষদের জন্য লোক সমাবেশ করতে”, বলেন কোলসে-পাটিল। কার্যত ২৬০টি সংগঠনের একটি জোট এলগার পরিষদের জন্য কাজ করেছিল। কোলসে-পাটিল এবং সুধীর ধওয়ালে ছাড়াও এলগার পরিষদে রাজনীতিবিদ প্রকাশ অম্বেডকর এবং জিগনেশ মেবানি এবং দলিত অধিকার রক্ষার সক্রিয় কর্মী রাধিকা বেমুলার বক্তৃতা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল।

“চোরাগোপ্তা জরুরি অবস্থা”

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা মনে করেন, এলগার পরিষদকে মাওবাদী ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করে এবং তাকে ভিমা-কোরেগাঁও হিংসাত্মক ঘটনার জন্য তাদের দায়ী করে আসলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার হিন্দুত্বের সমালোচকদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করছে।

“যাঁরা বর্তমান শাসনের সমালোচনা করেন বা বিরোধিতা করেন, তাঁদের চুপ করিয়ে দিতে হবে। আর সেটা সম্ভব হবে এই গ্রেফতারির ঘটনা ঘটিয়ে”, বলেন বিচারপতি সবন্ত। “২০১৯-এর লোকসভা ভোটের প্রস্তুতি হিসাবেই এ সব করা হচ্ছে। এ ছাড়া আমি এর আর কোনো উদ্দেশ্য দেখতে পাচ্ছি না।”

আরও পড়ুন ‘প্রেসার কুকারে বিস্ফোরণ হবে, যদি…’ সমাজকর্মী গ্রেফতারে মন্তব্য প্রধান বিচারপতির

লেখক-সামাজিক কর্মী অরুন্ধতী রায় গ্রেফতারির ঘটনাকে “জরুরি অবস্থা ঘোষণার মতোই” বলে বর্ণনা করেছেন। অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে একমত হয়ে সবন্ত এই গ্রেফতারিকে “চোরাগোপ্তা জরুরি অবস্থা” বলে বর্ণনা করেন। সবন্ত বলেন, “ইন্দিরা গান্ধী অন্ততপক্ষে আইনের ধারা মোতাবেক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। এই সরকার সেটা করতে পারবে না। কারণ তারা তো সেই সময়ে জরুরি অবস্থার সব চেয়ে বড়ো সমালোচক ছিল।”

দেশ জুড়ে গোরুকে নিয়ে যে সব হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে তার জন্য দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলির সমালোচনা করে সবন্ত বলেন, “আজ যা ঘটছে তা খুবই খারাপ। কারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু এবং দলিতরা খুন হচ্ছে। হিন্দুত্ব গোষ্ঠীগুলো যে কোনো ধরনের অপরাধ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের এখনও গ্রেফতার করা হচ্ছে না। এখানেই তো রাষ্ট্রের যোগসাজশ প্রমাণ হয়ে যায়।”

আরও পড়ুন ভিমা কোরেগাঁও হিংসায় জড়িত সন্দেহে ভরভরা রাও-সহ একাধিক সমাজকর্মী আটক

দৃষ্টান্ত হিসাবে মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেফতারের প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন কোলসে-পাটিল। তিনি বলেন, হিন্দুত্বের নেতা মিলিন্দ একবোটে এবং শম্ভাজি ভিড়ের বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের হয়েছে তা থেকে জনগণের নজর ঘোরাতে মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেফতার করা হল। একবোটে আর ভিড়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০১৭-এর ডিসেম্বর তাঁদের জ্বালা-ধরানো বক্তৃতার জন্যই ভিমা-কোরেগাঁওয়ে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে। তাঁদের গ্রেফতার করার ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত তাঁদের আটক করা হয়নি।

“বছরের পর বছর ধরে একবোটে আর ভিড়ে বিষ ছড়িয়ে চলেছেন, অথচ সরকার চাইছে জনগণের দৃষ্টি মাওবাদীদের দিকে ঘোরাতে”, বলেন কোলসে-পাটিল।

কোলসে-পাটিল ও সবন্ত বলেন, এলগার পরিষদের সংগঠক হিসাবে তাঁদের বাড়িতে হানা দেওয়া হলে বা গ্রেফতার করা হলে তাঁরা মানসিক ভাবে প্রস্তুত রয়েছেন। তবে সবন্ত দাবি করেন, একটা কারণের জন্যই এটা এখনও পর্যন্ত ঘটেনি। “তারা আমাদের পিছনে লাগেনি, কারণ তারা জানে আমাদের গ্রেফতার করলে এই কর্মসূচি মাওবাদীরা সংগঠিত করেছিল তাদের এই অভিযোগ তো আর টিকবে না।”

সবন্তের মতে, পুনে পুলিশের কাছে সব চেয়ে বড়ো পরিহাস হল তাদের অভিযোগ। তারা বলেছে, সরকারের সুস্থিতি নষ্ট করতে এবং ভারতের সার্বভৌমত্ব জলাঞ্জলি দিতে একটা “ফ্যাসিস্ট-বিরোধী ফ্রন্ট” গড়ার ষড়যন্ত্র করছিলেন গ্রেফতার হওয়া সমাজকর্মীরা। “এতেই বোঝা যাচ্ছে, ফ্যাসিস্টরাই দেশ শাসন করুক, এটাই তারা চায়”, বলেন সবন্ত।

সৌজন্যে স্ক্রল.ইন 

 

 

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন