rbi

ওয়েবডেস্ক: বিস্ফোরণটা ঘটিয়েই ফেললেন আরবিআইয়ের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন। তাঁর সর্বশেষ বই, ‘আই ডু হোয়াট আই ডু’-তে তিনি লিখেছেন, গত বছর ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর কার্যকাল শেষ হয়। বিমুদ্রাকরণের সিদ্ধান্ত তাঁর কার্যকালে নেওয়া হয়নি সে কথা সাফ জানিয়েছেন রাজন।

রাজনের বক্তব্যের সঙ্গে যদি গত দু’ সপ্তাহের সরকারি এবং আরবিআইয়ের রিপোর্ট মেলানো যায়, তা হলে দেখা যাবে, বিমুদ্রাকরণের বিরোধীরা যা বলে আসছিলেন, আদতে সেটাই হয়েছে। প্রথমত, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই একেবারে হঠকারী ভাবে বিমুদ্রাকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, তখন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এমন দুরবস্থা হয়নি, যে রাতারাতি এ রকম ঘোষণা করতে হয়েছিল।

বিমুদ্রাকরণের প্রভাবে আদতে কী হল? ভারতের বৃহত্তর অর্থনীতি ধসে পড়ল। ২০১৬-এর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর, এই তিন মাসে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) হার ছিল ৭ শতাংশ। ২০১৭-এর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সেটা কমে দাঁড়ায় ৬.১ শতাংশে। পরের তিন মাসে তা আরও কমে হয়েছে ৫.৭ শতাংশ। বিমুদ্রাকরণ ঘোষণার পরে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল, অল্পস্বল্প হলেও তা এখনও চলছে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও সমস্যা। অনেক ব্যবসায়ী এখন নতুন বিনিয়োগের দিকে পা বাড়াচ্ছেন না। এত তাড়াতাড়ি অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন এসে যাবে, সেটা এখন ভাবাও যাচ্ছে না।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে লাইভ মিন্ট জানিয়েছে, জিডিপিতে বেসরকারি উদ্যোগের অবদান জানুয়ারি-মার্চে ছিল ৬৬.২ শতাংশ। পরবর্তী তিন মাস, অর্থাৎ এপ্রিল-জুনে তা কমে হয় ৬২.৩ শতাংশ। এই ঘাটতির প্রভাব অবশ্য ততটা বোঝা যায়নি, কারণ ওই একই সময় সরকারি খরচ কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সরকারি খরচের ওপর কোনো ভরসা করা যায় না। সেটা কখনও বাড়ে, কখনও কমে। তবে সব থেকে ভয়াবহ ব্যাপার হল আর্থিক ঘাটতি। ২০১৭-১৮-এর অর্থবর্ষের প্রথম চার মাসে ৯২.৪ শতাংশ ছুঁয়েছে এই ঘাটতির পরিমাণ।

‘স্বল্পমেয়াদী লাভের আশায় দীর্ঘমেয়াদী লোকসান করা অনুচিত’, বিমুদ্রাকরণের ব্যাপারে কেন্দ্রকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন রাজন। বিমুদ্রাকরণের ভালো দিক, খারাপ দিক, বিকল্প ব্যবস্থার ব্যাপারে কেন্দ্রকে যাবতীয় তথ্য দিয়েছিলেন রাজন। এর পাশাপাশি যদি সরকার বিমুদ্রাকরণের পথে হাঁটে, তা হলে কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত সে ব্যাপারেও কেন্দ্রকে উপদেশ দিয়েছিলেন রাজন। ঠিকঠাক প্রস্তুতি না নিলে কী সমস্যা তৈরি হতে পারে, সে ব্যাপারেও কেন্দ্রকে ওয়াকিবহাল করেছিলেন তিনি।

এর থেকে একটা ব্যাপার প্রমাণিত। রাজনের কোনো কথাই শোনেননি প্রধানমন্ত্রী।

৮ নভেম্বর, প্রধানমন্ত্রী বিমুদ্রাকরণ ঘোষণার সময়ে একটা কথা বলেছিলেন, কালো টাকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। কিন্তু কালো টাকার কোনো হদিশ কি পাওয়া গেল? সম্প্রতি আরবিআইয়ের প্রকাশিত একটি রিপোর্টে জানা গিয়েছে বাতিল নোটের ৯৯ শতাংশই ফিরে এসেছে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায়। অর্থাৎ কালো টাকার কারবারিরা, তাদের টাকাকে ‘সাদা’ করে নেওয়ার জন্য নতুন উপায় বের করে ফেলেছে।

তা হলে কী এমন ঘটল, যার জন্য এ রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে হল? জঙ্গি কার্যকলাপে রাশ টানা, জাল নোটের রমরমা বন্ধ করা এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার জন্যই বিমুদ্রাকরণের সিদ্ধান্ত, এমনই জানিয়েছিল আরবিআই। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য কি সফল হয়েছে?

তা হলে কার কথায় বিমুদ্রাকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? রাজনের আরবিআই যে বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলে গিয়েছিল, সেই দিকে কি কেন্দ্র একবারেও চোখ বুলিয়েছিল। যদি ৩ সেপ্টেম্বরের পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তা হলে এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হল কেন?

এর থেকেই আসছে সেই ধাঁধা। ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। যত দিন যাবে তত কিন্তু বাড়তে থাকবে দাবিটা। কে এই বিমুদ্রাকরণের সিদ্ধান্ত নিল?

নিজের স্বার্থেই সরকারের উচিত বিমুদ্রাকরণের ব্যাপারে সব কিছু খোলাখুলি বলে দেওয়া। এতে ব্যর্থ হলে আরও একটা কলঙ্কের গন্ধ বাতাসে ভাসতে শুরু করেছে।

সৌজন্য: হিন্দুস্তান টাইমস

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here