শিমলার ম্যাল।

শিমলা: ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে জনসংখ্যার শতাংশের বিচারে সব থেকে বড়ো হিন্দু রাজ্য হিমাচল প্রদেশ। এ রাজ্যের ৯৫ শতাংশের কিছু বেশি বাসিন্দা হিন্দু। তা সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদী দলগুলি নিজের দাবি খাটাতে পারছে না এ রাজ্যে। রাজধানী শিমলার নাম পরিবর্তন নিয়ে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাবলিই এর প্রমাণ।

বিজেপি এবং আরএসএসের তরফ থেকে কয়েক দিন ধরেই দাবি করা হচ্ছিল শিমলার নাম বদল করে শ্যামলা করে দেওয়া হবে। এই দাবির স্বপক্ষে তাদের যুক্তি ছিল, শিমলা নামটি ব্রিটিশদের দেওয়া। আর অন্য দিকে ভগবান কালীর একটি রূপ হচ্ছে শ্যামলা।

সাধারণ মানুষের মত

কিন্তু উত্তরপ্রদেশে যেটা সম্ভব হল, সেটা হিমাচলে খাটল না। মুঘলসরাইয়ের নাম বদলে দিনদয়াল উপাধ্যায় নগর হোক বা ইলাহাবাদ থেকে প্রয়াগরা, উত্তরপ্রদেশের অধিকাংশ মানুষ কোনো বিরোধিতা করেনি। কিন্তু শিমলার নাম পরিবর্তন নিয়ে বিরোধিতা করেছেন হিমাচলের মানুষ। এই নাম পরিবর্তন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমীক্ষা করে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা এবং স্থানীয় কিছু সংগঠন। সেখানে দেখা যায়, ৯০ শতাংশ মানুষই এই নাম পরিবর্তনের বিরোধী। মানুষের এই ভাবমূর্তি দেখেই ভোল বদল করেন হিমাচলের মুখ্যমন্ত্রী জয়রাম ঠাকুর। রাজধানীর নাম পরিবর্তনের কথা কখনোই ভাবা হয়নি বলে সাফ জানিয়ে দেন তিনি।

আরও পড়ুন কেরলে শবরীর প্রতীক্ষা বিজেপির, হিন্দু ভোট সিপিএমের কবজায়
জনপ্রিয় শক্তিপীঠ। সারাহানের ভীমা কালী

হিমাচলের হিন্দুত্ব হিন্দি বলয়ের থেকে আলাদা 

এই নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের পেছনে অন্য কারণ ছিল। গত কয়েক বছর ধরেই এই রাজ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। কারণ হিমাচলের মানুষ নিজেদের মতো করে হিন্দু ধর্মকে দেখে। অন্য রাজ্যের থেকে এখানে হিন্দু দর্শন একদমই আলাদা। এ রাজ্যে দশ হাজারেরও বেশি মন্দির রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মন্দিরই প্রভাব বেশি শৈব এবং শাক্তদের। অর্থাৎ শিব এবং শক্তিকেই এখানকার মন্দিরগুলিতে উপাসনা করা হয়। অন্য দিকে বৈষ্ণব এবং আদি শঙ্করাচার্যের প্রভাব কম এ রাজ্যে। আবার হিন্দুত্ববাদী দলগুলিতে প্রভাব বেশি বৈষ্ণব এবং আদি শঙ্করাচার্যেরই।

এ ছাড়াও এ রাজ্যে এক একটি অঞ্চলে, এক একজন আদি পুরুষকে গুরু মেনেও দেবতা রূপে পুজো করা হয়। ঠিক যেমন বাবা বালক নাথ পূজিত হন রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তে। আর উত্তরাংশে পূজিত হন মাহাসু দেবতা। এই সব ক্ষেত্রে শৈবদের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। আবার অন্য দিকে ঠিক একই ভাবে প্রভাব বেশি শাক্তদেরও। সেই কারণেই দেশের অন্য সব মন্দিরের থেকে হিমাচলের জ্বালামুখী, চিন্তপূর্ণি, ভীমাকালী, নয়নাদেবী, হিড়িম্বাদেবীকে শক্তিশালী মনে করেন রাজ্যের বাসিন্দারা।

হিন্দি বলয়ের থেকে এ রাজ্যের হিন্দুত্ব একদম আলদা বলেই এখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না হিন্দুত্ববাদী দলগুলি।

মণিমহেশ। হিমাচলের এক শৈব স্থান।

পাঁঠার মাংস খাওয়ার রীতি 

হিমাচলের হিন্দুত্বের আরও একটা বৈশিষ্ট্য হল পাঁঠা বলি। স্থানীয় উৎসবে পাঁঠা বলির এবং সেটা দিয়ে ভুঁড়ি-ভোজেরও চল রয়েছে এ রাজ্যে। কিন্তু এই পাঁঠার মাংসকে কেন্দ্র করে হিমাচলে কোনো দিন কোনো ধর্মীয় উত্তাপের সৃষ্টি হয়নি। গোষ্ঠী সংঘর্ষের ঘটনা এ রাজ্যে বিরল।

রামমন্দির, অযোধ্যাকে নিয়ে যে ভাবে বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে, তার বিন্দুমাত্র কোনো প্রভাব নেই হিমাচলের মানুষের মধ্যে। সেটা না থাকার জন্যই যে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি এ রাজ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, শিমলা-শ্যামলা বিতর্ক থেকেই সেটা প্রমাণ হয়ে যায়।

সৌজন্য: দ্য কুইন্ট

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here