খবর অনলাইন : ৬৫ বছরের অমান চমর তাঁর ফুটিফাটা জমির ধারেই বসেছিলেন। গত বছর চাষ করেছিলেন, তেমন ফলন হয়নি, অল্পস্বল্প গম হয়েছিল। এ বার রবি মরসুমে আর চাষ করেননি। কারণ করে কোনও লাভ ছিল না। জল নেই। পুকুর শুকিয়ে কাঠ, আর তাঁর মতো চাষির পক্ষে বোরওয়েলের খরচা বহন করা সম্ভব নয়।

ঝাঁসি শহর থেকে চমরের গ্রাম রাজপুরা ৬০ কিলোমিটার পুবে। অঞ্চল বুন্দেলখণ্ড। গত কয়েক বছরে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় চরম দুর্দশাগ্রস্ত এখানকার মানুষ। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে শস্যের, চাষ করাই অলাভজনক হয়ে উঠেছে। ঝাঁসি, ললিতপুর, মাহোবা, বান্দা, জালাউন, হামিরপুর, চিত্রকূট -– এই সাত জেলা নিয়ে উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড অংশ। এখানকার মানুষ অধিকাংশই দরিদ্র। তার ওপর উপর্যুপরি খরায় তাঁরা মরতে বসেছেন। ২০১৩-এর এপ্রিল থেকে ২০১৫-এর জুন পর্যন্ত ৩৫০০ জন আত্মঘাতী হয়েছেন। এই হিসেবটা সরকারিই।

চমরের পরিবারের লোকজনদের হয়তো অনাহারেই মরতে হত, যদি না তাঁর ছেলে নয়ডায় গিয়ে ডেলি লেবারের কাজ পেত। ছেলে চাষের কাজেই বাবাকে সাহায্য করত। ছেলে বাইরে কাজ পাওয়ায় হয়তো চমরের পরিবার বেঁচেছে, কিন্তু তাঁর গবাদিপশু বাঁচানো যায়নি। জমিতে চাষ হয়নি, তাই পশুখাদ্য মেলেনি জমি থেকে। তা হলে গবাদিপশু বাঁচাতে বাজার থেকে কিনতে হয় পশুখাদ্য। কিন্তু এত দাম, কেনার সামর্থ্য নেই চমরদের।

চমরের গ্রামে কমবয়সিদের আর খুব একটা দেখা যায় না। তারা সবাই কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যাচ্ছে। কেউ ঝাঁসি, কেউ বা লখনউ, আবার কেউ দিল্লি-নয়ডা।

স্থানীয় এনজিও ‘প্রভাস’ সমীক্ষা করে দেখেছে, গত ১০ বছরে ৬২ লক্ষ মানুষ কাজের খোঁজে বুন্দেলখণ্ড ছেড়ে চলে গিয়েছেন। রোজ হাজার ছয়েক করে মানুষ, বেশির ভাগ চাষি, এই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। “আপনি দিল্লির যে কোনও নির্মাণ এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখুন, দেখবেন প্রতি ৩ জন মানুষের মধ্যে এক জন বুন্দেলখণ্ডী” –- বললেন বান্দার সমাজকর্মী আশিস সাগর।

সাগরের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে খিসনি খুর্দের অভিজ্ঞতা। ঝাঁসি জেলারই গ্রাম খিসনি খুর্দ। খিসনি খুর্দের অবস্থা রাজপুরার থেকেও ভয়ঙ্কর। প্রতি পরিবারের এক জন করে নয়, গোটা পরিবারই চলেছে গ্রাম ছেড়ে। এ রকমই এক জন ভগীরথ আদিবাসী। ৫৫ বছরের ভগীরথ ও তাঁর পরিবারের ২০ জন সদস্য কাজের সন্ধানে, বিশেষ করে একটু খাওয়ার জল পাওয়ার আশায় চলেছেন ২৫০ কিলোমিটার দূরের মরেনা শহরে। কিন্তু গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত আদিবাসী পরিবারকে নিতে হয়েছে অনেক কষ্ট করে। কারণ তাঁরা ছেড়ে যাচ্ছেন ৪ একর জমি আর গবাদিপশু। “আমাদের যদি অন্তত পানীয় জলটুকু থাকত, আমরা গ্রাম ছেড়ে যেতাম না। শহরে গিয়ে জলটা তো পাব। আর কিছু কাজ তো করতে হবে। গত দু’ বছর বৃষ্টি নেই। আমাদের চার একর জমিতে এক দানাও শস্য হয়নি। আমাদের গবাদি পশুও ভগবানের ভরসায় ছেড়ে গেলাম” –- বলছিলেন ভগীরথ।

ঝাঁসি জেলার ২৪টা গ্রাম জলশুন্য। খিসনি খুর্দে চারটে বোরওয়েলের মধ্যে তিনটে শুকিয়ে কাঠ। তাই গ্রামের মানুষদের মাইলের পর মাইল যেতে হয় খাবার জল আনার জন্য।

এই অঞ্চলের গ্রামগুলো থেকে দলে দলে মানুষজন চলেছে শহরের দিকে। কিছু দিন আগেও দেখা যেত প্রতি পরিবারের এক জন করে কাজের খোঁজে চলে যাচ্ছেন শহরে গোটা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য। খরার জন্য চাষ করা যায়নি। তাই বিকল্প কাজের সন্ধান। কিন্তু ইদানীং পরিবার কে পরিবার জমিজিরেত ফেলে শহর অভিমুখী। কারণ এক ফোঁটা খাবার জলও যে নেই।

খিসনি খুর্দ গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য শহিন বানো বলেন, জল সংকটের দরুন গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে অর্ধেক পরিবার। প্রশাসনের অফিসারেরা বলছেন ‘জলের ট্যাংকার পাঠাচ্ছি’, কিন্তু আজ কোনও ট্যাংকার এই গ্রামে আসেনি।

এই অভিযোগ কিন্তু মানতে নারাজ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। ঝাঁসি জেলা প্রশাসন এই গ্রামগুলোতে যে বড়ো ধরনের জল সংকট আছে, তা মানতেই চান না। তাঁদের দাবি, সমস্যা বাড়তে পারে ভেবে তাঁরা আগাম ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছেন। কালেক্টর অজয় কুমার শুক্ল বলেন, “আপনারা বলছেন জল সংকটের জন্য গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছেন মানুষজন। কিন্তু ঝাঁসি জেলায় এ রকম একটা ঘটনাও তো আমার নজরে আসেনি।”

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, প্রশাসন যদি জেগে ঘুমোয়, তা হলে গরিবগুর্বো মানুষগুলোর গাঁ-ছাড়া হওয়া ছাড়া কোনও পথ নেই।

সৌজন্যে : www.Bundelkhand.in, NDTV


মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here