নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: তৃণমুল কংগ্রেস কর্মী খুনের ঘটনায় এক সঙ্গে ১৮ জন সিপিএম নেতাকর্মীর যাবজ্জীবন সাজা ঘোষনা করলো বর্ধমান আদালত। পঞ্চায়েত ভোটের আগে যা পূর্ব বর্ধমান জেলা সিপিএমের কাছে বড়ো ধাক্কা। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন পঞ্চায়েত নির্বাচনে সিপিএমের প্রার্থী।

বুধবার আদালত যাবজ্জীবন সাজা ছাড়াও প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাস কারাবাসের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। খুনের পাশাপাশি মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জমায়েতের ধারায় বিচারক ধৃতদের ৩ বছর জেল ও ২ হাজার টাকা জরিমানার নির্দেশ দিয়েছেন। সাজাপ্রাপ্তরা জরিমানার টাকা না দিতে পারলে আরও এক মাস জেল খাটতে হবে। দুটি সাজাই একসঙ্গে চলবে।

পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে দুই তৃণমূলকর্মী খুনের ঘটনায় মঙ্গলবারই ১৮ জন সিপিএম নেতাকর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করার পর বুধবার সাজা ঘোষণা করেন বিচারক। এদিন আদালতে উৎসাহী মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বুধবার বর্ধমানের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক শেখ মহম্মদ রেজা সাজা ঘোষণার আগে প্রত্যেকের বক্তব্য শোনেন। সাজাপ্রাপ্তরা নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করে। এদিন সাজা ঘোষণার পর সাজাপ্রাপ্ত পরিবারের লোকজন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মঙ্গলবারই অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করে বর্ধমানের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক শেখ মহম্মদ রেজা মন্তব্য করেছিলেন, গালিগালাজ, মারধর, মারাত্মকভাবে জখম করা, ভাঙচুরের মতো কিছু ধারায় আনা অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ সরকার পক্ষ। তবে মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বেআইনি জমায়েত, খুন, পরিকল্পনায় লিপ্ত থাকার মত ধারায় ওই ১৮জনের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে সাক্ষীদের বয়ানে। সেই কারণে ১৮জনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ওইদিন অর্থাৎ মঙ্গলবারই বিচারক আরও মন্তব্য করেছিলেন, খুনের ধারায় (৩০২) ফাঁসি অথবা যাবজ্জীবন সাজার বিধান রয়েছে। মঙ্গলবারের পর বুধবার এই মামলার যাবজ্জীবন সাজা ঘোষণা করেন বিচারক। বুধবার রায় ঘোষণা করতে গিয়ে বিচারক মন্তব্য করেন, দিবালোকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে পাঁচু দাস ও ঈশা মল্লিককে খুন করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ সমাজের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ ধরণের জঘন্য অপরাধে শাস্তি দিয়ে একটা বার্তা দেওয়া জরুরি যাতে অপরাধীরা সাজার বিষয়ে সচেতন হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর খুনের ঘটনাটি ঘটে। ওইদিন সকাল থেকেই জামালপুরের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায় সিপিএম। বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন জড়ো করে তাঁরা।  মুইদিপুর গ্রামে পচা মার্কেট এলাকায় তৃণমূলের কর্মীসমর্থকদের সকাল ৭ টা থেকে ১১টা পর্যন্ত মারধর করা হয়। লাগাতার হামলায় সাহেব সাঁতরা, শ্যামাপদ দে সহ বেশ কয়েকজন তৃণমূল কর্মী গুরুতর জখম হন। দুপুরে সামান্য বিরতি দিয়ে বিকেল থেকে ফের এলাকা দখলে নামে সিপিএমের বাহিনী। স্থানীয় সিপিএম নেতা মিলন মালিকের নেতৃত্বে দলের লোকজন তাণ্ডব শুরু করে এলাকায়। তৃনমূল কংগ্রেস কর্মীদের বাড়ি-পার্টি অফিস ভাঙচুর করা হয়। রেশালাতপুর গ্রামের দিঘিরপাড়, উজিরপুরের রুইদাস পাড়ায় বাড়ি বাড়ি হামলা চালানো হয়। গ্রামের তাঁতিপাড়ায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয় পাঁচু দাসকে। সেখানে তাঁকে খুন করা হয়। এরপর অমরপুর গ্রামের ঈশা মল্লিককেও সেখানে তুলে আনা হয়। একইভাবে তাঁকেও খুন করা হয়। পাল্টা প্রতিরোধ করতে গিয়ে তিরবিদ্ধ হন সত্য কুণ্ডু। এদিনই রাতে নিহত পাঁচু দাসের ভাইপো প্রবীর দাস জামালপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনার তদন্তে নামে। ঘটনার তদন্ত সম্পূর্ণ করে জামালপুর থানার তদন্তকারী অফিসার সুজিত ভট্টাচার্য ২০১১ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে চার্জশিট পেশ করেন। তারপরই মঙ্গলবার আদালত ১৮ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে। বুধবার ধৃতদের যাবজ্জীবন সাজা দেন বিচারক। সাজাপ্রাপ্তদের নাম মিলন মালিক, মনোজ মালিক, ঝন্টু মালিক, সুদেব মালিক, লখিরাম সরেন, রাম মান্ডি, সরোজিত মাঝি, সুজিত মাঝি, কার্তিক মাঝি, বিকাশ মালিক, বিশ্বনাথ দলুই, উজ্জ্বল সাঁতরা, কমল পোড়েল, জয়ন্ত পোড়েল, অশান্ত পোড়েল, হাবল সাঁতরা, উদয় মাঝি ও রণজিত মাঝি। এদের বাড়ি জামালপুর থানার অমরপুর, উজিরপুর, রেশালাতপুর, মুইদিপুর প্রভৃতি জায়গায়। সব মিলিয়ে ১৬ জন এই মামলায় সাক্ষ্য দেন। মারধরে জখমরা ঘটনার কথা আদালতের কাছে তুলে ধরেন। তৃণমূলের জেলার সাধারণ সম্পাদক তথা জামালপুরের প্রাক্তন বিধায়ক উজ্জ্বল প্রামাণিক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “বাম আমলে কী ধরনের সন্ত্রাস হত এই ঘটনা তারই প্রমাণ। সিপিএম কতটা হিংস্র, নৃশংস ছিল তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই জোড়া খুনের ঘটনা। সিপিএমের মুখে আর সন্ত্রাসের অভিযোগ শোভা পায় না।” সাজাপ্রাপ্তদের আইনজীবী স্বপন ব্যানার্জি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে।”

তবে সিপিএমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় এই রায়ের পঞ্চায়েত ভোটে কোনো প্রভাব পড়বে না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here