জলপাইগুড়ি জেলে মারধর, অনশনে ৪০০ বিচারাধীন বন্দি

0
1551

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : সাজাপ্রাপ্ত বন্দির হাতে প্রহৃত এক বিচারাধীন বন্দি। প্রতিবাদ জানিয়ে অনশনে প্রায় ৪০০ বিচারাধীন বন্দি। সংকটে জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ।

দুই দলের মধ্যে ঠান্ডা লড়াইটা বহু দিনের। বৃহস্পতিবার তা চরম আকার নেয়। এ দিন বিকেলে আদালত থেকে ফেরার পর সংশোধনাগারের গেটে নিয়ম অনুযায়ী খানা-তল্লাশি চলছিল বিচারাধীন বন্দিদের। সংশোধনাগারের কর্মীদের পাশাপাশি সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের দিয়েও এই কাজ করানো হচ্ছিল। সেই সময় শুভজিৎ বিশ্বাস নামে এক বিচারাধীন বন্দিকে মঙ্গল মুণ্ডা নামে এক সাজাপ্রাপ্ত বন্দি মারধর করে বলে অভিযোগ।

সংশোধানাগারের দাবি অনু্যায়ী, তল্লাশির সময় শুভজিতের কাছ থেকে বিড়ির প্যাকেট উদ্ধার হয়। নিয়ম অনুযায়ী কোনো নেশাজাত দ্রব্য সংশোধনাগারের ভেতর নিয়ে যাওয়া যায় না। এই নিয়ে মঙ্গল মুণ্ডার সঙ্গে বচসা বাধে শুভজিতের। তখন মঙ্গল শুভজিৎকে মারধর করে বলে অভিযোগ। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সংশোধনাগারের বিচারাধীন বন্দিরা। তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। প্রায় ৪০০বন্দি অনশন শুরু করেন। অভিযুক্তের শাস্তির দাবিতে জেল কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপি দেওয়া হয় তাঁদের তরফে। শুক্রবার সকালেও অনশন চালিয়ে যান তাঁরা।

এর পরেই বিপদে পড়ে সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ। কারণ যাঁদের আদালতে হাজির হওয়ার তারিখ রয়েছে, তাঁদের খালি পেটে আদালতে পাঠানোর নিয়ম নেই। এর পর বুঝিয়েসুজিয়ে কয়েক জনকে খাইয়ে আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু বাকিরা অনশন চালিয়ে যেতেই থাকেন।

আদালতে হাজিরা দিতে এসেছিলেন কিরণ মাহালি নামে এক বিচারাধীন বন্দি। তিনি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত মঙ্গল মুণ্ডার শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা অনশন চালিয়ে যাবেন।

তবে এই ঘটনা যে শুধু বিড়ি নিতে বাধাকে কেন্দ্র করে তা নয়। কিরণ মাহালি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত মঙ্গল শুভজিৎ এর কাছে টাকা চেয়েছিল। টাকা দিলে বিড়ি সংশোধনাগারের ভেতর পৌঁছে দেওয়া হবে এমন আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। তাতে রাজি না হওয়াতেই উচিত শিক্ষা দিতে শুভজিৎকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।

বস্তুত, ঘটনা আরও গভীরে। আদালতে আসা বিক্রম রাউত নামে আর এক বিচারাধীন বন্দি জানিয়েছেন, সংশোধনাগারের ভেতর নিয়মিত টাকার লেনদেন চলে। তার বদলে বিভিন্ন ‘সুবিধা’ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কোনো নতুন বিচারাধীন বন্দি এলেই তাঁর কাছে পৌছে যান সাজাপ্রাপ্ত কোনো বন্দি। তাঁর আর্থিক অবস্থা বুঝে বিভিন্ন ‘অফার’ দেওয়া হয়। ভালো খাওয়া, থাকার জন্য ভালো ওয়ার্ড। এমনকি চাইলে মিলবে মোবাইলে কথা বলার সুযোগও।

দীর্ঘদিন ধরে থাকতে থাকতে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা নিজেদের মধ্যে দল তৈরি করে সংশোধনাগারকে নিজেদের আয়ত্তে রাখার চেষ্টা করেন। দাগী অপরাধী হওয়ায় এঁদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পায় না কেউ। কেউ তাদের ‘অফার’-এ রাজি না হলে চলে হুমকি, এমনকি মারধরও। অভিযোগ কিছু কারারক্ষীও এঁদের সাহায্য করেন। বিনিময়ে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয় পাওয়া টাকার।

যদিও এই সমস্ত অভিযোগই উড়িয়ে দিয়েছে সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সূত্রের খবর, গত মাসেই বিচারাধীন বন্দিরা জেল সুপারকে একটি স্মারকলিপিও দিয়েছিলেন এই অনৈতিক কাজেকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে। যদিও সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা। সমস্তটাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার রাজীব রঞ্জন।

এ দিকে এই ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়েছে সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ। এই মুহূর্তে ১৪৪০ জন বন্দি রয়েছেন এখানে। তাঁদের খাবারের জন্য প্রায় ৯০ হাজার টাকা প্রতি দিন করচ হয়। এঁদের মধ্যে ৪০০ জন বৃহস্পতিবার রাত থেকে অনশন শুরু করায় তাঁদের জন্য রান্না করা খাবার নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার টাকা।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে শুক্রবার রাতে জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে আসেন এআইজি কারা (উত্তরবঙ্গ) কল্যাণ কুমার প্রামাণিক। জেলার রাজীব রঞ্জন জানিয়েছেন, এআইজি’র নির্দেশে অভিযুক্ত মঙ্গলকে শাস্তিস্বরূপ একটি বিশেষ সেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিচারাধীন বন্দিদের অভিযোগও শুনেছেন তিনি। আশ্বাসও দিয়েছেন। তবে ওই চার দেওয়ালের ভেতরে দীর্ঘদিনের এই অন্ধকার কবে কাটবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here