ex students in front school

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর পর ১৯৪৮ সালে গড়ে উঠেছিল জলপাইগুড়ি রাষ্ট্রীয় বালিকা বিদ্যালয়। গুটিকয়েক ছাত্রী নিয়ে চলতে শুরু করেছিল লাল-সাদা বাড়িটি। অনেক রাস্তা পেরিয়ে ৭০ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সেই বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য নষ্ট করার অভিযোগ, আবেগে আঘাতের অভিযোগ নিয়ে পথে নেমেছে্ন বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীরা। কারণ, স্মৃতিবিজড়িত সেই লাল-সাদা বাড়িটি হঠাৎ করেই নীল-সাদায় উদ্ভাসিত।

রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক পুরোনো সরকারি ভবন তার রঙ পালটে নীল-সাদা হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ কম হয়নি। কিন্তু বিদ্যালয়ের রঙ হঠাৎ পালটে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নামগুলো।

the school as it was
স্কুল আগে যেমন ছিল।

এমনিতেই জলপাইগুড়ির অধিকাংশ প্রাচীন স্থাপত্যগুলি ইংরেজ আমলে তৈরি এবং তা লাল-সাদা রঙের। তা সেই জলপাইগুড়ি জেলা আদালত হোক বা জেলাশাসকের বাংলো। এমনকি ফণীন্দ্রদেব ইনস্টিটিউট বা জিলা স্কুলের মত নামী স্কুলগুলি এখনও লাল-সাদা। মাঝেমধ্যেই স্থাপত্যগুলির সংস্কার হলেও তার রঙ পরিবর্তন হয়নি প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখেই। প্রাক্তনীদের প্রশ্ন, তা হলে রাষ্ট্রীয় বালিকা বিদ্যালয়ের রঙ পালটে নীল-সাদা কেন?

গত মার্চ মাসে একটি সরকারি নির্দেশিকায় জেলার বিদ্যালয়গুলিকে নতুন করে রঙ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতেই জলপাইগুড়ি শহরের ক্লাব রোডে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ও নতুন করে রঙ করা হয়। কিন্তু দেখা যায় লাল-সাদা রঙ পালটে নীল-সাদা করে ফেলা হয়েছে। ঘটনা ধীরে ধীরে জানাজানি হতেই ক্ষোভ বাড়তে থাকে শহরে। একজোট হন বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীরা। বৃহস্পতিবার তাঁরা বিদ্যালয়ে এসে বিক্ষোভও দেখান।

সোহিনী রায় কর নামে এক প্রাক্তন ছাত্রীর কথায়, “রঙ পালটে দিয়ে চেনা বিদ্যালয়টাকেই যেন হঠাৎ অচেনা করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনায় আবেগে আঘাত লেগেছে।”

পৌষালি মুখোটি নামে আরও এক প্রাক্তনীর দাবি, সরকারি নির্দেশিকায় কী রঙ করা হবে তার কোনো উল্লেখ নেই। সংস্কারের সময় পুরোনো রঙেই তো সংস্কার করা যেত বিদ্যালয়ের।

তা হলে রঙ পালটাতে হল কেন? ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সাগরিকা দত্তের সাফাই, এতে তাঁর নিজের কোনো ভূমিকা নেই। জেলা শাসকের দফতর থেকে যেমন নির্দেশ এসেছে তা-ই করা হয়েছে।

যদিও গুঞ্জন উঠছে অন্য রকম। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সাগরিকা দত্ত বর্তমান শাসকদল ঘনিষ্ঠ, বলছেন অনেকেই। সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রথম সারিতেই দেখা যায়। শাসকদলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদেই পিএসসি পরীক্ষা না দিয়েও সরাসরি এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার পদ করায়ত্ত করেছেন তিনি, অভিযোগ রয়েছে এমনই। তাঁর কাজে যোগদানের সময় এই নিয়ে বিস্তর বিক্ষোভ-অভিযোগ করেছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষিকারাই।

the school as it is now
স্কুল এখন যা হয়েছে।

শাসকদলকে তুষ্ট রাখতেই আশীর্বাদধন্য প্রধান শিক্ষিকার নীল-সাদা বিদ্যালয় উপহার, বলছেন ওই বিদ্যালয়েরই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষিকা।

তবে প্রাক্তনীরাও তাঁদের দাবিতে অনড়। “অন্য রঙ লাগাচ্ছে ঐতিহ্যে কাদা/গভর্নমেন্ট গার্লস মানেই লাল-সাদা” — এই স্লোগানে নিজেদের দাবি গোটা জেলায় ছড়িয়ে দিতে চান তাঁরা।

পৌলমী চন্দ নামে এক প্রাক্তন ছাত্রীর স্পষ্টট দাবি, লাল-সাদা বাড়ি ফেরত চাই। তাঁরা জানিয়েছেন, নতুন করে রঙ হোক, প্রয়োজনে খরচ তাঁরা চাঁদা করে তুলে দেবেন।

শুধু প্রাক্তনীরাই নন,শহরের অনেকেই এই রঙ করার ঘটনাকে আপত্তির নজরে দেখছেন। প্রদীপ চৌধুরী নামে বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা জানিয়েছেন, বড়ো হয়ে দেখা ইস্তক স্কুল-বাড়িটির হঠাৎ এ ভাবে বদলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না।

বৃহস্পতিবার প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে দেখা করে প্রাক্তনীরা জানিয়ে এসেছেন ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেওয়া হোক বিদ্যালয়ের। নচেৎ তাঁরা ‘অনেক দূর’ পর্যন্ত যেতেও রাজি। তাঁদের দাবির স্বপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে শহরের নাগরিকদের কাছ থেকে সই সংগ্রহ করা হয়। শৈশবে বাবা-মায়ের আঙুল ধরে প্রথম পা রেখে দেখা বিদ্যালয়টিকে ‘অন্য রকম’ দেখতে চাইছেন না তাঁদের কেউই।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন