বেগুনকোদর (পুরুলিয়া) : ‘আহট’, ‘সস কয়ি হ্যায়’ কেমন একটা ভূত ভূত শোনাচ্ছে না। তার পর ধরুন যদি বলি সিঙ্গাপুরের বিসান এমআরটি স্টেশন, কানাডার ওয়াটার ফ্রন্ট স্টেশন বা ধরুন আয়ারল্যান্ডের কলোনি স্টেশন। এই সব স্টেশনের নাম কেন বলছি? না, বেড়াতে যাওয়ার জন্য নয়। বলছি কারণ এই সব ক’টির সঙ্গেই ভূতের একটা সংযোগ আছে। আসতে আসতে শরীরটা হিম হয়ে আসছে? গায়ে কাঁটা দিচ্ছে? সঙ্গে প্রতক্ষ্য অভিজ্ঞতার গল্প শোনার ইচ্ছা হচ্ছে তাই তো? তবে এগুলোতো বিদেশি ভূতের আখড়া। দেশি স্টেশনেও ভূত আছে তা জানেন কি? এখন তেমনই একটা স্টেশনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার গল্পই বলব।

তেমনই একটা স্টেশন হল পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের কাছে বেগুনকোদর। পুরুলিয়া টাউন থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অনেকেই শুনেছেন এর নাম। বিগত প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে এই স্টেশন ভৌতিক স্টেশন নামেই পরিচিত। বা বলা ভালো কুখ্যাত। সম্প্রতি এই কন কনে ঠাণ্ডায় এই স্টেশনে রাত কাটিয়েছেন ন’ জন যুক্তিবাদী সাহসী মানুষের একটি দল। বলব তাঁদেরই চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার কথা।

তখন ১৯৬৭ সাল। তখনকার স্টেশন মাস্টার এক রাতে সাদা শাড়ি পরা এক মহিলাকে লাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেন। সেই মহিলা আত্মহত্যা করেন। তার পর সেই স্টেশন মাস্টারেরও মৃত্যু হয়। এই ঘটনা দু’টি কে মিলিয়ে দু’য়ে দু’য়ে চার করেই স্টেশনটা স্বাভাবিক জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার পর থেকে এখানে না থামত ট্রেন না নামতেন কোনো যাত্রী। দেশের ১০টি ভৌতিক স্টেশনের তালিকায় নাম উঠে যায় এই জায়গার।

অবশেষে ২০০৯ সালে রেলমন্ত্রী থাকাকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই স্টেশন আবার চালু করেন। কিন্তু তা হলে কী হবে? বিকেল পাঁচটার পর এখানে আর কেউ থাকে না।

এ হেন স্টেশনে এই দলটি এক রাতে ছিলেন। সঙ্গে ছিল শক্তিশালী ডিজিট্যাল কম্পাস আর ক্যামেরা আর টর্চ। এঁরা সকলেই পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্য।

এই দলের এক জন নয়ন মুখোপাধ্যায় বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১১টা থেকে তাঁরা এই স্টেশনে ছিলেন। পরের দিন সকালের আলো ফোটা পর্যন্ত। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী সারা রাতে এখানে কোনো মহিলার আত্মারও দেখা মেলেনি। এমনকি এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি যেটাকে ভৌতিক বলা যেতে পারে। শুধু পাশের কুয়োতে একটা সাপ দেখা গেছে মাত্র।

স্টেশন বাড়ির পিছন থেকে সারা রাত ধরে শুধু অদ্ভুত সব শব্দ কানে এসেছে। রাত দু’টোর সময় পিছনের দিকের ঝোপঝাড়গুলোতে আলো ফেলতে চার-পাঁচ জন মানুষকে সেখানে লুকিয়ে থাকতে দেখা গেছে। তাদের পিছনে ধাওয়া করতেই তারা পালিয়ে যায়। মজার ব্যাপার হল ভৌতিক স্টেশন হিসেবে প্রচার হওয়ায় অনেকেই সেখানে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে আসেন। সেই সময় স্থানীয় কিছু মানুষ নানা রকম অদ্ভুত শব্দ করে তাঁদের ভয় দেখায়। তাঁরা ভয় পেয়ে জিনিস পত্র ফেলে রেখেই সেখান থেকে পড়ি কি মরি করে পালিয়ে যায়। আর তখন তারা ওই সব জিনিসপত্র চুরি করে নেয়।

নয়নবাবু বলেন, স্টেশন চত্ত্বরে শক্তিশালী ক্যামেরা কম্পাস সবই লাগিয়ে রাখা হয়েছিল বিভিন্ন দিকে তাক করে। কোনো কিছুতেই তেমন ভৌতিক কিছু ধরা পরেনি।

এঁদের এই অভিযানে সঙ্গ দিয়েছিল পুরুলিয়ার পুলিশবাহিনী।

জেলার সুপারিন্টেনডেন্ট অব পুলিশ জয় বিশ্বাস বলেন, এই দলের পক্ষ থেকে পুলিশি নিরাপত্তার জন্য আবেদন জানানো হয়েছিল। তাতে রাজি হয়েছিলেন তাঁরা। তিনি বলেন, এলাকাবাসিরা যে এই স্টেশনকে ভুতের আখড়া মনে করে সে খবর পুলিশ প্রশাসন জানে। সম্প্রতি এখানে রাতের বেলায় টহলদারিও শুরু করা হয়েছে। শুধু তাই নয় মানুষকে এই ধারণা থেকে বের করে আনার জন্য প্রচারও করা হচ্ছে।

পুরুলিয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অলোক প্রসাদ রায় বলেন, এই বিষয়ে সুপারিন্টেনডেন্ট অব পুলিশকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলেছেন তিনি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here