শুধু ভোট কেন্দ্রের পরিচয় নিয়েই দাঁড়িয়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের নাম দেওয়া “বোধনা” নিকেতন

0

সমীর মাহাত, ঝাড়গ্রাম: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত বাঁশতলার “বোধনা” নিকেতন বন্ধ হয়ে গিয়েছে ২৭ বছর আগে। সরকারি অনুমোদন না মেলায়, সেটি বন্ধের অন্যতম কারণ বলে জানা গিয়েছে। তবুও প্রশাসনিক ভাবে এই প্রতিষ্ঠানের নাম খাতায়-কলমে আছে। কেন না এটি এলাকার ভোট গ্রহণ কেন্দ্র।

অনুমতি দং হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানটি এখন “জন শিক্ষা প্রসার সমিতি” নামে একটি সংস্থার অধীনে রয়েছে। সরকার বদলের পর অনুমোদন ও প্রতিষ্ঠান চালু রাখার জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কাছেও আবেদন জানান কর্তৃপক্ষ। মহকুমাশাসক কর্তৃক খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহের কাজও শুরু হয়। তার পর সেই একই অবস্থা।

এই প্রতিষ্ঠানের আদি তথ্য হল, “তিরিশের দশকে ব্যারিস্টার গিরিজাভূষণ মুখার্জি যান বাঁশতলা। তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ছিল। রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে তিনি রবীন্দ্রনাথ প্রদত্ত “বোধনা” নিকেতন নামে মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য এক স্কুল খোলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের প্রতিনিধি হয়ে এলেন আরেক বাঙালি মনীষী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথের শুভেচ্ছাবার্তায় ‘লুপ্তম্ সর্বম্ দৈববশাৎ,নবীভূতম্ পুনঃ কুরু”, অর্থাৎ, যা দৈববশে লুপ্ত হয়ে গেছে, তাকে পুনরায় জাগাও।

অতঃপর গিরিজা ভূষণের চেষ্টায় বোধনা স্টেশন তৈরি হয়। দো-তলা স্কুলবাড়ি, পাশে হোস্টেল। তবে স্কুলটি যে কারণেই হোক, স্বল্পায়ু হয়। গিরিজাভূষণ চলে যান কলকাতা। স্টেশনটির নাম হয় বাঁশতলা, ডাকঘরের নাম রয়ে গেছে বোধনা। সত্তরের দশকে হাওড়ার ব্যবসায়ী তারাপদ সাউ এসে এখানে একটি কড়াই তৈরির কারখানা ও কৃষি খামার গড়েন।

একই সঙ্গে “বোধনানিকেতন”কে”নবীভূতম” করার ইচ্ছা জাগে তাঁর। ১৯৭৩ সালে সেবায়তনে সাহিত্য সম্মেলনে আসেন দেশগৌরব আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং নাট্যকার মন্মথ রায়। তারাপদবাবুর আমন্ত্রণে এঁরা এলেন বোধনাতে।

স্বাধীনতার ২৬ বছর বাদে এক গরিব, অনুন্নত, পিছিয়ে পড়া মানুষ অধ্যুষিত এলাকায় অকর্মক স্কুলবাড়ি দেখে ওঁদের বুকে বাজে- স্কুল চালু করতে হবে। ৩ জানুয়ারি ‘৭৩ স্বয়ং সত্যেন বসু নিজে সাফাই কাজে কোদাল ধরেন। তারাপদবাবুর প্রয়াত স্ত্রীর নামে স্কুলের নাম হল, “বোধনা লীলাবতী শিক্ষা সদন “। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সত্যেন বসু ও সুনীতিকুমার।(তথ্যঃ “কিন্তু কেন?” মহাশ্বেতাদেবী, ১৯৯৮,১৫ ডিসেম্বর, আজকাল পত্রিকা)।

জন শিক্ষা প্রসার সমিতির কর্ণধার নব্যেন্দু হোতা বলেন, ৮৫ সালে সুশীল গুপ্তকে দিয়ে স্কুল চালু করা হল। সেই সময় পাঁচকড়ি দে-র তত্ত্বাবধানে বাঁধগোড়া ও এই স্কুলটির ইন্সপেকশন শুরু হয়। বাঁধগোড়া অনুমোদন পেল। এই স্কুল পেল না। রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি হল। ৯২ সাল পর্যন্ত স্কুল চালানো হয়েছিল। এই সরকারের মুখ্যমন্ত্রীকেও অনুমোদনের আবেদন জানানো হয়েছে। আমাদের স্কুল বাড়ি ও জায়গার অনুমতি দং আছে। বাকি জায়গা বোধনা ট্রাস্টের। যে ভাবেইই হোক স্কুল চালু কেউ করতে চাইলে আমাদের আপত্তি নেই। কেননা এখানে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি জড়িত আছে। আপাতত এখানে শিশুদের জন্য একটি হোম চালু করার লক্ষ্যে আছি।”

এই দীর্ঘকায় ইতিহাসের বর্তমান পরিণতির ফল স্বরূপ বাঁশতলা, বরবাড়ি, গোদারাস্তা টিয়াকাটি, টুকরুভোলা, নলবনা, জামবেদিয়ায়, দামোদরপুর, হদহদি-সহ বিভিন্ন গ্রামের পড়ুয়ারা উচ্চ ও মধ্যশিক্ষার জন্য জঙ্গল পথে ঝাড়গ্রাম, মানিকপাড়া ও বাঁধগোড়ার দূরবর্তী প্রতিষ্ঠানই ভরসা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here