গঙ্গার ভাঙনের মুখে খড়দহের একাংশ, সন্ত্রস্ত কুলীনপাড়ার বাসিন্দারা

0
794
পায়েল সামন্ত

সুদূর মুর্শিদাবাদের কোনো গ্রামাঞ্চল নয়। খোদ কলকাতা লাগোয়া খড়দহের একটি পুর ওয়ার্ড। সেখানেও থাবা বসিয়েছে বহতা নদী। গঙ্গার ভাঙনে ত্রস্ত ২২ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া নদীবাঁধকে প্রতি দিন একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে ভাগীরথী। মাটির পর ভিটে উজাড় হওয়ার আশঙ্কায় বাঁধ সংস্কারের দাবি তুলেছেন এই ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। কিন্তু, প্রশাসন তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ।

তখন এই এলাকা বৃহত্তর কলকাতা হয়ে ওঠেনি। ব্রিটিশ আমলে খড়দহ ছিল রবীন্দ্রনাথের পদধূলিধন্য। নদীতীরের নিভৃতিতে যে বাড়িতে রবি ঠাকুর সময় কাটাতেন, সেটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এই পুর এলাকার একাংশের বাসিন্দারা এখন একই আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। কী সমস্যা খড়দহের ২২ নং ওয়ার্ডের কুলীনপাড়ার বাসিন্দাদের? সরেজমিনে দেখতে সেই এলাকায় পৌঁছে গিয়েছিল খবর অনলাইন।

এই গঙ্গার এক পাশে উত্তর চব্বিশ পরগনার খড়দহ, অন্য দিকে হুগলির রিষড়া। প্রাকৃতিক নিয়মে প্রতিনিয়ত ভাঙে নদীর পাড়। কিন্তু, মানুষের লোভ প্রকৃতির বিপর্যয় আরও বাড়ায় বই-কি। এক পাড়ে যথেচ্ছ বালি তোলা হচ্ছে। অন্য পাড়ে ভাঙন রুখতে সাজানো ইঁট আলগা হয়ে গিয়েছে। সেই ইঁট ধরে রাখে যে তার, তা চুরি হয়ে গিয়েছে। এর ফলে ভারতী সংঘের কাছে ২২ নং ওয়ার্ডে নদীর পাড় ভেঙে গিয়েছে অনেকটাই। এক সময় ৫০-৬০ ফুট দূরে যে গঙ্গা কলকলিয়ে বইত, এখন তা যেন এলাকাবাসীর শিয়রে যমের মতো নিঃশ্বাস ফেলছে।

এই ওয়ার্ডের ১৮টি বাড়ি বিপর্যয়ের আশঙ্কায় দিন গুনছে। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও ভরা কোটাল নদীকে বসতিগুলির প্রায় তিন মিটারের মধ্যে এনে ফেলেছে। প্রতিটি রাত আতঙ্কে কাটছে, বৃষ্টি হলে আশঙ্কার পারদ চড়ছে। যে কোনো দিন এই বাড়িগুলিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে ভাগীরথী। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনকে এই ঘোর বিপদের কথা জানালেও লাভ হয়নি।

এমনই এক বাড়ির বাসিন্দা গৌরগোপাল পাল। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এই এলাকার বাসিন্দা। তিনি জানালেন, “২০১৫ থেকেই এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। নগরায়নের ক্রমবর্ধমান চাপের ফলশ্রুতিতে এই ভাঙন। তাই এই ভাঙন রুখতে এর আগে এলাকায় আমরা গাছ লাগানোর পদক্ষেপও নিয়েছিলাম। কিন্তু তাতেও নদীকে ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রশাসনের তরফে শ্মশানের দিকে নদীবাঁধের আংশিক মেরামতির কাজ চললেও বাকি অংশের কাজ এখনও বিশ বাঁও জলে। অথচ এ দিককার পাড়ের অংশে ফাটলের চিহ্ন স্পষ্ট। যে কোনো মুহূর্তে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়তে পারে।”

ভাঙনকে ক্রমশ বিভীষিকার মতো হয়ে উঠতে দেখেছেন এলাকার বাসিন্দা দেবব্রত দাস, মনোজকুমার মিশ্ররা। ২০১৫-য় ভাঙনের প্রথম থাবা। তার পর থেকে গত দু’ বছরে এলাকার মানুষ চোখের সামনেই বড়ো বড়ো গাছ তলিয়ে যেতে দেখেছে। স্থানীয় বাসিন্দা অভিষেক সিংহ জানালেন, যে বিস্তীর্ণ অংশ এই দু’ বছরে গঙ্গা গ্রাস করেছে, সেখানে এক সময় খেলে বেড়াতেন তাঁরা। এখন ছোটো ছোটো ছেলেদের ক্লাব-সংলগ্ন খেলার মাঠের অস্তিত্ব সংকটে। এমনকি বল কুড়োনোর জায়গাটুকুও নেই। বল এখন গঙ্গাবক্ষেই পড়ে সরাসরি। আশঙ্কিত বাবা-মায়েরা তাই সন্তানকে আজকাল খেলার মাঠে পাঠানোর ঝুঁকিটিও নিতে চাইছেন না। ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’-এ রাইচরণের খোকাবাবুর হারিয়ে যাওয়ার পুনরাভিনয় দেখতে কেই বা চান?

২২ নং ওয়ার্ডে গঙ্গার পাড় সংলগ্ন এলাকার ঘরবাড়ির কথা বাদ দিলেও এখানে রয়েছে একাধিক আশ্রম এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। অদূর ভবিষ্যতে ভূমিধসের প্রকোপ থেকে তারাও হয়তো রেহাই পাবে না। মহিলা পরিচালিত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের এক সদস্যা বললেন, “একটা বাড়িতে আগুন লাগলে অন্যটাও রেহাই পায় না। তাই উদ্বেগটা থাকেই। এই মুহূর্তে সকলের হয়তো অসুবিধে না হলেও গঙ্গার গ্রাস সবাইকেই চিন্তায় রেখেছে বই-কি!”

রবি ঠাকুর ছাড়াও শ্রীচৈতন্য বা রানি রাসমণির স্মৃতি জড়িয়ে খড়দহের এই অঞ্চলের সঙ্গে। এক কালে পাথুরিয়াঘাটার জমিদারি এস্টেট বলে পরিগণিত এলাকা আজ ইতিহাস থেকে মুছে যাওয়ার পথে। গঙ্গার পাড়-সংলগ্ন ক্লাব ভারতী সংঘের প্রাক্তন সম্পাদক বিলাস ভট্টাচার্যের বক্তব্য, “৮০ সাল নাগাদ যে ভাঙন দেখা গিয়েছিল, তা তৎকালীন সেচ দফতরের সহায়তায় রোধ করা গিয়েছিল। তার পর থেকে বহুকাল যাবৎ এ চত্বরের নদীবাঁধে সংস্কারের চিহ্নমাত্র নেই।”

বাসিন্দাদের অভিযোগ, দু’ বছর আগে যখন ভাঙনের তাণ্ডব প্রথম শুরু হয়, তখন মহকুমাশাসক-সহ বহু সরকারি প্রতিনিধি পরিদর্শনে এসেছিলেন। তাঁরা আশ্বাস দেন, নদীর পাড়ের সংস্কারের জন্য টাকা বরাদ্দ করা হবে। কিন্তু দু’ বছর কেটে গিয়েছে। কাজই শুরু হয়নি।

স্থানীয় কাউন্সিলার সুপ্রিয় মুখার্জি এই অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে জানালেন, “ভোটের সময় মাননীয় সাংসদ এলাকা পরিদর্শনে এলে তাঁকেও বিষয়টি অবহিত করেছি, তিনি আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে ফল কিছু হয়নি। দু’ বছর আগে ৫০০ বালির বস্তা দিয়ে বাঁধকে সাময়িক ভাবে রক্ষা করা গিয়েছিল, কিন্তু স্থায়ী ভাবে সরকার কোনো কাজ না করলে আমাদের কিছু করার থাকে না।”

গঙ্গার জল দূষণ ও ভাঙন রুখতে কেন্দ্রীয় সরকার স্বচ্ছ গঙ্গা প্রকল্পের সূচনা করেছে। অথচ এই কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই অভিযোগের আঙুল তুলে পুরপিতা বললেন, “২০১৫-তে পিটিশন জমা দেওয়া হয়েছিল। শোনা গিয়েছিল, বাঁধ সংস্কারের জন্য টাকাও বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু সবটাই শোনা কথা। পৌরসভায় কোনো লিখিত অনুমোদন আসেনি।”

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here