নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : ফের কাঠগড়ায় জলপাইগুড়ির কোরক হোম। এক আবাসিকের পালানো, তার জেরে অন্য তিন নাবালক আবাসিককে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ এবং সেই সব ঘটনা চেপে রাখার চেষ্টা। সব মিলিয়ে ফের বিতর্কের শিরোনামে এই সরকারি হোমটি।

মূলত উদ্ধার হওয়া, পরিবারহীন, বা দরিদ্র পরিবারের শিশুরা এই হোমে থাকে। সেই সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়া নাবালকদেরও এখানে রাখা হয়। বর্তমানে এখানকার আবাসিককের সংখ্যা ১৪০জন।

গত বুধবার ১৩ বছরের এক আবাসিক হোমের উঁচু পাঁচিল টপকে পালিয়ে যায়। অভিযোগ উঠেছে, সেই খবর চেপে গিয়েছেন হোমের সুপার। পদাধিকার বলে জেলাশাসক রচনা ভগত এই হোমের চেয়ারম্যান। তাকে বা নারী শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতরেও ঘটনা জানানো হয়নি।প্রায় ২০ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার কোতোয়ালি থানায় এ নিয়ে অভিযোগ করা হয়।

এদিকে ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া আবাসিকের ঘরে থাকা অন্য তিন নাবালককে ব্যাপক মারধোর করা হয় বলে অভিযোগ। তারা ওই কিশোরকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে এই অভিযোগ তুলে হোম সুপার দেবব্রত দেবনাথ, স্টোরকিপার শেখর রায় এবং ওয়েলফেয়ার অফিসার রিনি মিত্র তাদের মারধর করেন বলে অভিযোগ। নির্যাতিত এক কিশোর জানিয়েছে, বুধবার রাতে উপরতলার একটি ঘরে ঢুকিয়ে তাদের উইকেট,লাঠি দিয়ে মারধোর করা হয়। হোমের এক কর্মী জলন্ধর রায় জানিয়েছেন,তারা বাধা দিলেও হোম সুপার তা শোনেননি। মারের চোটে ওই তিন নাবালকের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কালশিটে পড়ে গিয়েছে, যার চিকিৎসা পর্যন্ত করা হয়নি।এখনও আতঙ্কিত এক কিশোর জানিয়েছে, মুখ খোলার জন্য তাদের ফের মারধর করা হতে পারে।

korok-home-super
ক্যামেরা দেখে পালাচ্ছেন হোম সুপার দেবব্রত দেবনাথ

শুধু আবাসিকরা নয়, হোম সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে হোমের বেশ কয়েকজন কর্মীও। জলন্ধর রায়ের অভিযোগ, কোনো ঘটনা ঘটলেই তাদের উপর দায় চাপিয়ে দেন এই নতুন হোমসুপার। নাবালক পালানোর সময় ডিউটিতে না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে শোকজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বরুন চন্দ্র বর্মণ নামে এক কর্মী ।

এদিকে ঘটনায় উঠেছে বেশ কিছু প্রশ্ন। হোমে বেশ কয়েকটি সিসিটিভি লাগানো রয়েছে,যার মনিটার খোদ হোম সুপারের ঘরে। সূত্রের খবর, বুধবার দুপুর ১টা১১নাগাদ ওই নাবালাক হোম সুপারের কোয়াটারের পেছনের প্রাচীর টপকে পালায়। সেই ছবিও সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে। সেই সময় হোম সুপারের নিজের অফিসেই থাকার কথা। তাহলে সেই পালানোর ঘটনা সিসিটিভিতে হোম সুপারের চোখে ধরা পড়ল না কেন? তখন তিনি আদতে কোথায় ছিলেন? পুলিশকে বা সংশ্লিষ্ট দফতরে ঘটনা জানাতে ২০ঘণ্টা সময় লাগল কেন?

rachana-bhagat
জেলাশাসক রচনা ভগত

রাতের বেলায় তিন নাবালককে মারধরই বা করা হল কেন? তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও সত্য জানা যেত।যদিও এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি এখনও।

ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে হোম সুপার দেবব্রত দেবনাথ এবং ওয়েলফেয়ার অফিসার রিনি মিত্রি সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে থেকে প্রায় পালিয়ে যান। হোমের এক মহিলা কর্মীকে কেন হোমে সংবাদমাধ্যম ঢুকেছে তার কৈফিয়ত চেয়ে পুলিশ ডাকার হুমকি দেন।

সমস্ত ঘটনা নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষুদ্ধ জলপাইগুড়ির জেলাশাসক রচনা ভগত। তিনি জানিয়েছেন,আবাসিক পালানোর ঘটনা না জানানোর জন্য ইতিমধ্যেই শোকজ করা হয়েছে হোমের সুপার দেবব্রত দেবনাথকে। তার বক্তব্য, সময়মতো পুলিশকে ঘটনা জানালে হয়ত ওই নাবালককে উদ্ধার করা যেত।

তবে তিন নাবালককে মারধোর করার কথা জেলাশাসক জানতেন না। সেটা শোনার পর একজন অতিরিক্ত জেলাশাসককে তদন্ত করতে আজ সন্ধ্যায় হোমে পাঠিয়ে দেন। সূত্রের খবর, তার কাছেও মারধর করার অভিযোগ জানিয়েছে ওই তিন নির্যাতিত। তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। জেলাশাসক জানিয়েছেন তিনি ঘটনার তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন। সেই সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া নাবালকের খোজেও তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।

গত মে মাসে হোমের ঘরের দেওয়াল ভেঙ্গে পালিয়েছিল ৮কিশোর। তার আগেও একাধিকবার এই হোম থেকে আবাসিক পালানোর ঘটনা ঘটেছে। যদিও আবাসিক নাবালকদের মারধরের ঘটনা এর আগে সামনে আসেনি। যার ফলে ওই হোমে থাকা আবাসিকদের নিরাপত্তা নিয়ে এক বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন