chiranjib-paulচিরঞ্জীব পাল

বাজেমেলিয়া বাজারে একটা রাস্তা ডান দিকে ঢুকে গিয়েছে। রাস্তাটা আমার বড্ড চেনা। ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে জমি আন্দোলন শুরু হওয়ার পর অনেকবার গিয়েছি ওই রাস্তাটা দিয়ে। রাস্তার ম্যাপটাও আবছা হয়ে যায়নি মন থেকে। ওই ম্যাপটা ধরেই হাঁটছিলাম। ওই রাস্তাটা ধরে হাঁটলে টাটার কারখানার পাঁচিলের কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়। চোখ আঁতিপাঁতি করে খুঁজছিল কোনও চেনা মানুষকে।

প্রায় ১০ বছর পেরিয়ে গিয়েছে। কিছু মুখ আমার মনে থাকলেও ১০ বছর পর তাঁরা কেউ আমাকে মনে রাখবেন, এমনটা ভাবা কষ্ট-কল্পনা। কারণ সেই আন্দোলনের সময় কলকাতা থেকে বহু মানুষ এসেছেন, গিয়েছেন। আর সাংবাদিকের চেনা মুখ খুঁজে লাভই বা কী।

হাঁটতে হাঁটতে টাটার কারখানার পাঁচিলের কাছে চলে এসেছি। সেখানে এখন চরম ব্যস্ততা। জমি জরিপের ও সাফাইয়ের কাজ চলছে জোর কদমে। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে পুলিশি ব্যবস্থা। কয়েক জন সিভিক পুলিশ গার্ড দিচ্ছে। টাটার কারখানার পাঁচিল লাগোয়া রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে কয়েকটা ছবি তুললাম। সাইকেল নিয়ে একজন পুলিশ আধিকারিক যাচ্ছিলেন তিনি আমাকে দেখতে  পেয়ে বললেন, এখানে দাঁড়াবেন না বারণ আছে। অনুরোধের ভঙ্গি। ২০০৬ সালের সঙ্গে পার্থক্যটা অনুভব করলাম। তখন ঠিক ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে কয়েকটা ছবি তুলছিলাম। এক পুলিশ আধিকারিক এসে ঝাঁঝালো গলায় বলেছিলেন, “যান যান এখান থেকে। ছবি তুলবেন না।” কথা না বাড়িয়ে চলে এসেছিলাম।

Security
সাফাই ও জরিপের কাজ চলছে

ছবি তোলা শেষ। অন্য দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছি, দেখলাম এক চেনা মুখ। নামটা মনে নেই, মুখটা খুব চেনা। এই জায়গায় এলে তাঁর সঙ্গে দেখা হতই। ঝর্ণা দাস। গৃহবধূ। সিঙ্গুর জমি আন্দোলনের সক্রিয়কর্মী ছিলেন। পুলিশের মার খেয়েছেন, জেল খেটেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, জমি তো ফেরত পাচ্ছেন, কেমন লাগছে?

মুখে এক চিলতে হাসি লেগে রয়েছে (কথা বলার সময় তখনও এমনটাই লেগে থাকত)। বললেন, “ভালো লাগছে। আবার চাষ করতে পারব।” টাটার কারখানা এলাকায় নিজস্ব কিছু জমি ছাড়াও ৬ বিঘা জমিতে ভাগে চাষ করতেন। সেই সব ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা নিজেই স্মৃতিচারণ করলেন।

Jharna-Das
ঝর্ণা দাস

আরও একটু এগোতেই দেখলাম, একজন বয়স্ক মানুষ নারকেল পাতা ছেঁচে ঝাঁটার কাঠি বার করছেন। কথা বললাম তাঁর সঙ্গে। নাম জয়দেব দাস। সিঙ্গুর জমি আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ৭ বিঘে মতো জমি বর্গাচাষ করতেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর মনের মধ্যে একগুচ্ছ প্রশ্ন। তাঁর বর্গার কোনও রেকর্ড নেই। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, অনিচ্ছুক চাষিদের পাশাপাশি বর্গাদারও ক্ষতিপূরণ পাবেন। জয়দেব দাসের বর্গার কোনও রেকর্ড নেই। তাই তাঁর মনে প্রশ্ন, তিনি কি ক্ষতিপূরণ পাবেন? শুধু জয়দেব নয়, সিঙ্গুরে এ রকম অনেক বর্গা এবং ভাগচাষি আছেন যাঁদের কোনও রেকর্ড নেই। এই প্রশ্ন তাঁদের মনে রয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘ ১০ বছরে কেটে যাওয়ায় অনেক সম্পর্কের অদল-বদল হয়েছে। যাঁর জমিতে বর্গা চাষ করতেন, জয়দেবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। কারণ সে সময় টাটার কারখানার জন্য ওই জমির মালিক জমি দিয়েছিলেন। ফলে নতুন সম্পর্ক জোড়া লেগে আবার বর্গা চাষ করতে পারবেন কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে জয়দেব দাসের মনে। অনেক ভাগচাষির মধ্যেই এমন প্রশ্ন রয়েছে যে, তাঁর আগের জমিতে আদৌ কি ভাগচাষ করতে পারবেন?

Joydev-Das
জয়দেব দাস

মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, জমি চাষযোগ্য করেই ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু এত দিন পর টাটার কারখানার জমি আদৌ কি চাষযোগ্য হবে? প্রশ্নটা  করেছিলাম এক বর্ষীয়ান কৃষক হরিপদ দাসকে। তিনি বললেন, “কেন হবে না। যদি পাহাড় কেটে চাষ হয়, তবে এখানেও হবে। মাটি তৈরি করলেই হবে। আগামী বছর আবার এসে ছবি তুলে নিয়ে যাবেন। দেখবেন কেমন চাষ হয়েছে।”

যুক্তিটা আরও স্পষ্ট করলেন কৃষক তরুণ দাস, “১০ বছর ধরে জমি পড়ে থাকায় বৃষ্টির জল খেয়েছে। ফলে জমি আরও উর্বর হয়েছে। টাটার কংক্রিট অংশ মাটির উপরিভাগে রয়েছে। তাকে বুলডোজার দিয়ে সরিয়ে নিলেই হবে।”

Haripada-Das
হরিপদ দাস

যাঁরা আগেই ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে সেই সব ‘ইচ্ছুক’ চাষিদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা ফেরত নেওয়া হবে না। ‘অনিচ্ছুক’ চাষিদের মধ্যে এ নিয়ে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। তাঁদের বক্তব্য, “আমরা পুলিশের লাঠি খেলাম, জেলে গেলাম আর যারা এ সব কিছুই করল না বরং উল্টে আমাদেরই গালি-গালাজ করেছিল, তারা ক্ষতিপূরণ পেল, এখন আবার জমিও ফেরত পাবে।”

তবু আদালতের রায়। সেই রায়কেই মেনে নিয়েছেন তাঁরা। এই আশায়, আবারও তো সবুজ ফসল ফলবে। গ্রামের ছেলে বা মেয়েদের পেট চালানোর জন্য দূরে কোথাও কাজ করতে যেতে হবে না।

সাংবাদিকরা আসছেন, কলকাতা থেকে বুদ্ধিজীবীরা আসছেন, নিয়মিত মিটিং মিছিল হচ্ছে। ১৪ তারিখ মুখ্যমন্ত্রী সভা করবেন। সিঙ্গুর আবার আলোচনা-চর্চায়।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম কালো করে আসছে। ঝেঁপে বৃষ্টি নামবে। তাই কথাবার্তা গুটিয়ে ফেললাম। এই রায়ের পর সিঙ্গুরের তরুণ প্রজন্মের মনে ‘শিল্প’-এর দাবিটা যে একেবার মুছে গেছে এমনটা নয়। কথা গভীরে ঢুকলেই তা স্পষ্ট হয়। অনেকই তো আবার টাটার কারখানায় কাজ করার জন্য ট্রেনিং নিয়েছিলেন। ফলে ‘শিল্প না কৃষি’ এই বির্তকটা যে শেষ হয়ে গিয়েছে এমনটা নয়। অন্তত মানুষের মনে প্রশ্নটা থেকেই গিয়েছে। তবে এটা ঠিক, সিঙ্গুর-রায়ের পর শিল্পের জন্য কৃষিজমি নিতে গেলেই শিল্পপতিরা ‘সিঙ্গুরে মেঘ’ দেখবেন।  

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here