নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : বাবা একটি দড়ি ছুঁড়ে দিয়ে বছর চোদ্দ-র মেয়েটিকে বলেছিলেন, ‘মর গিয়ে’। বয়স কম হলেও, মেয়েটি সে দিন বুঝতে পেরেছিল, এই বাড়িতে আর ঠাঁই নেই তার। পরিবার থেকেও ‘অনাথ’ এই কিশোরীটি অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়ায় সে দিনই।

গত বছর ২৬ ডিসেম্বর, সাত সকালে এক ব্যাক্তি রাজগঞ্জ থানায় এসে অভিযোগ জানান, তাঁর নাবালিকা মেয়ে ‘অপহৃত’ হয়েছে। পরিচত এক যুবক তাকে অপহরণ করেছে বলে অভিযোগ করেন রাজগঞ্জের মালিপাড়ার বাসিন্দা ধনরাম বিশ্বাস (পরিবর্তিত নাম)। প্রায় সাড়ে চার মাস পর উদ্ধার হয় সেই নাবালিকা। তার অভিযোগ, বাবা-মা-দাদার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল সে। আর বাবা-মার কাছে ফিরতে চায় না — কান্না ভেজা আর্তি তার।

জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের মালিপাড়ায় বাড়ি ওই পরিবারের। বাড়ির সেজো মেয়ে রুপালি (পরিবর্তিত নাম) সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। তবে নামেই ছাত্রী। স্কুলে যেতে দিলেও, বাড়িতে ফিরে এলেই শুরু হয়ে যেত মায়ের গঞ্জনা। বাড়ির কাজকর্ম করাই মেয়েদের ধর্মকর্ম। ও সব ‘কেতাব’ পড়ে লাভ হবে না, বক্তব্য ছিল তার মা যমুনাদেবীর। পড়ার বইয়ের বদলে তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হত হাতা-খুন্তি। আর তাতে আপত্তি করলে মিলত বেধড়ক মার। শুধু মা নয়,কাজ সেরে বাড়ি ফিরে মেয়েকে গালাগালি করাই ছিল বাবা ধনরাম বিশ্বাসের একমাত্র বিনোদন। বাদ যেত না এক মাত্র দাদাও। সুযোগ পেলেই ছোট্ট বোনের গায়ে হাত তোলা ছিল তার নিত্যকর্ম। সেই সঙ্গে কিশোরী মেয়েকে ‘সিধে’ করার দাওয়াই হিসেবে ছিল না খাইয়ে রাখা, মাটির মেঝেতে শুতে দেওয়ার ব্যবস্থা। সব মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছিল অসহায় কিশোরীটি। কোথায়ই বা যাবে সে? কিন্তু যে দিন বাবা দড়ি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তার দিকে, সে দিনই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আর নয়…..।

২৫ ডিসেম্বর, দিনটা ছিল রবিবার। বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে সন্ধ্যায় এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়ে সে।

পরদিন তার বাবার ‘অপহরণ’-এর অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে এক যুবককে গ্রেফতারও করে পুলিশ। কিন্তু তার কাছ থেকে কোনো সূত্রই পাওয়া যায়নি। তখনই তদন্তকারী অফিসারের ধারণা হয় ঘটনার পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। ওই নাবালিকা পাচার হয়ে গেছে কিনা তা নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিল পুলিশ। তদন্তের জন্য দিল্লি পর্যন্ত পাঠানো হয়েছিল পুলিশের একটি বিশেষ দলকে। যদিও ঘটনার কিনারা হয়নি। তবুও হাল না ছেড়ে তদন্ত চলিয়ে গেছেন রাজগঞ্জ থানার ওসি সৈকত ভদ্র। অবশেষ সুফল মেলে। এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সূত্র ধরে খোঁজ মেলে নাবালিকার। সেই সূত্র ধরেই শনিবার শিলিগুড়ির এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে আশ্রিতা মেয়েটিকে উদ্ধার করা হয়।

নাবালিকা নিজের মুখেই জানিয়েছে, বাবা-মা-দাদার অত্যাচারে বাড়ি ছেড়ে পালানোর ঘটনা। পালানোর পর ভাগ্যক্রমে শিলিগুড়ির এক মহিলার কাছে আশ্রয় পেয়েছিল রুপালি। পরে ওই মহিলার পরিচিত এক ব্যবসায়ীর কাছে আশ্রয় পেয়ে সে যে ভালোই ছিল। কিন্তু পুলিশ তাকে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতির কাছে তার কান্না ভেজা আর্তি, বা-মার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বদলে তাকে ফাঁসি দিয়ে দেওয়া হোক। ঘটনায় হতচকিত পুলিশ সুপারও। তবে আইনের কাছে তিনি বাঁধা। রবিবার আদালত কী নির্দেশ দেয় এখন সে দিকে তাকিয়ে তিনিও। তবে যথেষ্ট ক্ষোভের সঙ্গে তিনি এ-ও জানিয়েছেন, রুপালি বাবা-মাকে ডেকে পাঠিয়ে মেয়ের অভিভাবক হওয়ার ‘দায়িত্ব’ তার বাবা-মাকে ‘বোঝাবেন’।

ঘটনার কথা শুনে রীতিমত ক্ষুদ্ধ জলপাইগুড়ি শিশুসুরক্ষা সমিতির চেয়ারপার্সন বেবি উপাধ্যায়ও। তিনি জানিয়েছেন, মেয়েটি যদি বাড়ি ফিরতে না চায় তা হলে আপাতত তাকে হোমে আশ্রয় দেওয়া হবে। মেয়েটির সঙ্গে সঙ্গে তার বাবা-মা-দাদারও কাউন্সিলং প্রয়োজন।

আর যাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ তাদের কিন্তু খুব একটা হেলদোল নেই।রুপালির বাবা ধনরাম বিশ্বাস নির্বিকার গলায় জানিয়েছেন, তাঁদের বদনাম করে পালিয়ে যাওয়া মেয়ের কোনো ঠাঁই নেই বাড়িতে।

প্রশ্ন এখন একটাই, সবকিছু থাকা সত্বেও ‘অনাথ’ এই কিশোরীর তা হলে ভবিতব্য কী?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here