রাজাবাজার, কলাবাগানে দেবদেবীদের বডিগার্ড হিন্দু-মুসলমান সবাই

0
812

শিখা দত্ত

মহানগরীর মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে রয়েছে বেশ কিছু হিন্দু মন্দির। সেখানে ভালোই আছেন দেবদেবীরা। এখানকার দেবদেবীদের গায়ে কখনও হাত পড়েনি। হিন্দু-মুসলমান সবাই ওঁদের বডিগার্ড।

মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে শিবঠাকুরের বাজার বেশ ভালো। কলাবাগান থেকে রাজাবাজার পর্যন্ত হাঁটলে গোটা চারেক শিবমন্দির পাবেন, সাইজে যেগুলি অফিসের বসের কামরার মতো নির্জন। চটি খুলে হাতজোড় করে প্রণাম করছেন অনেকেই। রাস্তার মানুষজনের মধ্যে কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে খ্রিস্টান কিংবা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী – তার খোঁজখবর করাটা বদ্ধ উন্মাদের কম্মো।

চেক চেক লুঙ্গি পরা কয়েক জনকে দেখি বাবার মন্দিরের দেওয়ালে মাথা ঠুকতে। জঘন্য একটি প্রশ্ন মনে উঁকি দিল। লজ্জায় কুঁকড়ে যাই। হিন্দু পুরুষ লুঙ্গি পরলে মুসলমান বনে যাবেন নাকি!

আসলে যখন যেমন তখন তেমনই হবে, এই বলে সংস্কারাচ্ছন্ন বাসি মনকে প্রবোধ দিই। এখন একের পর এক হাঙ্গামা, খুন, রাহাজানি, জোর করে মুখ বন্ধ করিয়ে দেওয়ার যে কুরাজনীতি চলছে, তাতে যদি এক তিলও মদত দিই, তা হলে লুঙ্গিতে আপনি মুসলমান, দাড়িতে আপনি মুসলমান, পাজামায় আপনি যেমন মুসলমান হয়ে যাবেন, তেমনই অতিরিক্ত গরম পড়‌লে স্বাস্থ্যসম্মতকারণে মুসলমান বাবা-মা যদি মাথার চুল কাটিয়ে তাঁদের শিশুটিকে ন্যাড়া করান, তা হলে তো সেই শিশুটি হিন্দুমতে সন্ন্যাসী হয়ে যাবে! এ ধরনের রটনার জেরেই সারা ভারতবর্ষ জুড়ে আপাতত খুন হচ্ছেন নিরীহ মানুষ।

কেশবচন্দ্র স্ট্রিটের শিবের মন্দিরে বাবার মাথায় ফণাতোলা সোনালি সাপটিকে প্রণাম ঠুকি। রটনার জেরে যে ঘটনাগুলি ঘটছে, তা স্মরণ করে কেমন পাগল-পাগল লাগে।

আজানের সুর ভেসে আসে। কাছেই মসজিদ। কলকাতার বেশির ভাগ রাস্তাই আসলে খুব গরিব। মুসলমান অধ্যুষিত কলাবা‌গান বা রাজাবাজার আরও গরিব। আজান বন্ধ হয়ে গেল।

ওদিকে হনুমান মন্দিরের কাছেই রয়েছে পর পর বেশ কয়েকটি মাংসের দোকান। সেখানে বিকোচ্ছে গরুর মাংস।

দেবী মন্দির, রাজাবাজার।

রাজাবাজার, কলাবাগানে মাতৃমন্দির খুঁজে পেতে খানিক বেগ পেতে হল। নেই নাকি? রাজাবাজার মোড়ের মদের দোকান সংলগ্ন এলাকায় মায়ের মন্দির। মা কালী হাত বাড়িয়ে যেন কিছু চাইছেন। দুপুরবেলায় মন্দিরের গেটে তালা।

মায়ের মন্দিরের উলটো দিকে মসজিদ।

– তোমরা কি মায়ের মন্দিরে প্রণাম জানাও? এলাকার মুসলমান অধিবাসীদের এই কথাটা জিজ্ঞেস করতে সাহস না পেয়ে বেজায় অস্বস্তিতে ভুগি। আর মায়ের বাড়ানো হাতে অর্পণ করি আমার প্রশ্ন না করতে পারার অক্ষমতা।

মন্দিরের পুরোহিতকে খুঁজে পেতে আনি। পুরোনো মন্দির। প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো। নাতিপুতির হাতে এখন মন্দির পরিচালনার দায়ভার। তরুণ পুরোহিত প্রশ্নটা শুনে খানিক অবাক হলেন। তার পর ইতস্তত করে বললেন, কলিকালে তো অনেকেই মাকে তাদের জীবনের পাপ অর্পণ করেন। মাকে আমি তাই নিত্যস্নান করাই।

এক সাধুর সঙ্গে দেখা হল রাজাবাজারে। তিনি মন্দিরের  চাতালে বসে চিঁড়‌ে চিবোচ্ছেন। আর কী জানি বিড়বিড় করছেন। সাধু কাছে ডাকলেন। ভাবলাম প্রণামী চাইবেন। সাধুর পোশাক পরা একজন মানুষকে প্রণাম করার সময়ে লাভক্ষতির হিসাব করাটা বাহুল্যই। সাধুকে শুধোই, তুম সাধু হো?

লোকটা বেজায় খেপে গেলেন। লোকও জমে যায়। মসজিদের দিক থেকে কয়েকটি যুবক ছুটে এসে সেই উগ্রমূর্তি সাধুর হাত থেকে আমাকে বাঁচান।

সাধু চিত্কার করে নালিশ জানায়, সাধু কো দেখনে কে বাদ পুছতা হ্যায় সাধু হ্যায় কেয়া নেহি হ্যায়!

রাজাবাজার জমজমাট। ভিড় ঠেলে হাঁটতে বেশ খুশি খুশি লাগে। রাজাবাজার ব্রিজের ওপর যে ছোট্টো শিবমন্দিরটি সেখানে ফুটপাথে শুয়ে একটা গরু সত্যি সত্যিই ল্যাজ নাড়াচ্ছে। বাচ্চারা খেলছে। অনেকের মাথাতে ফেজটুপি।

এই শিবমন্দিরটি পশুপতিনাথের। সঙ্গে শনি, কালীও রয়েছেন। ১৩৩৬ সালে এখানে তৈরি হয় ছোট্টো মন্দিরটি। মন্দিরের পুরোহিত ভট্টাচার্যবাবু জানালেন, অনেক মুসলমানও এখানকার মন্দিরে পুজো দেন। মানে মানত করলে আমাকে বলেন, আমার হয়ে পুজোটা দিয়ে দিন।

এখানকার বাসিন্দা মইনুদ্দিন বললেন, দেবতা সবার। সে কথায় সায় দিলেন স্থানীয় বস্তিবাসীরা। আদতে সকলেই আমরা জাতে মানুষ। মনুষ্যত্বই আমাদের ধর্ম।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here