30 C
Kolkata
Friday, June 18, 2021

রবিবারের পড়া: ১৫ বছর আগে এ ভাবে সমুদ্র-পরিবেশ ধ্বংস দেখে যদি কেউ কাঁদতেন!

আরও পড়ুন

শ্রয়ণ সেন

পাঁচ বছর আগে শেষ বার যখন দিঘা গিয়েছিলাম, একটা ব্যাপার দেখে চমকে যাই। সাধারণ জোয়ারের সময়ই সমুদ্রের জল গার্ডওয়াল টপকে সৈকত সরণিতে চলে আসছে। গার্ডওয়ালের উপরে বসেই সমুদ্রস্নানের মজা লুটছেন পর্যটকরা। কংক্রিটের সৈকতে যেতেও হচ্ছে না।

Loading videos...
- Advertisement -

ভরা কোটালের সময় দিঘার সমুদ্রের গার্ডওয়াল টপকে রাস্তায় চলে আসা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু সাধারণ জোয়ারে এই পরিস্থিতি তো আগে কখনও দেখিনি। বিন্দুমাত্র বুঝতে দেরি হল না যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিঘায় পড়তে শুরু করছে। সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে।

বাঙালির আবেগ দিঘা। আমিও ব্যতিক্রম নই। পাঁচ বছর আগের ওই দিঘাভ্রমণ ছিল আমার দশম বার। এর পর দিঘায় আর থাকা না হলেও চাঁদপুর, তাজপুর, বগুড়ানে রাত্রিবাস করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। গত বছর অক্টোবরেই আবার দিঘা উপকূলে গিয়েছিলাম। সমুদ্রের চারিত্রিক পরিবর্তন চাক্ষুষ করে এসেছি।

আমি সমুদ্রবিজ্ঞানী নই, পরিবেশবিদও নই। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই সমুদ্রের জল বেড়েছে কি না, অত বিস্তারিত ভাবে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের চোখ তো ধোঁকা দিতে পারে না। মাত্র তিন বছরের মধ্যেই সমুদ্রের ধার দিয়ে গড়ে ওঠা একটা রাস্তা কী ভাবে সমুদ্রগর্ভে চলে যাচ্ছে, সেটাও দেখেছি অক্টোবরেই।

তাজপুর থেকে শঙ্করপুর সংযোগকারী এই রাস্তাটার এখন কার্যত কোনো অস্বিত্ব নেই। এটা ২০১৭-এর ছবি।

দিঘা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে এত বার গিয়েছি, যে তার পরিবর্তনটা নজরে পড়েছে। আর বলতে দ্বিধা নেই, সেটা যথেষ্ট দৃষ্টিকটু।

১৯৯৩ সালে দেড় বছর বয়সে প্রথম বার দিঘা যাওয়া আমার। ওইটুকু বয়সের ভ্রমণের স্মৃতি কারই বা মনে থাকে। আমারও নেই সে ভাবে। কিন্তু ১৯৯৮-এ দ্বিতীয় বার যখন দিঘা গেলাম, তার স্মৃতি মোটামুটি রয়েছে আমার।

আমরা তখন থাকতাম নিউ দিঘায় অমরাবতী পার্কের কাছে এক জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকের হলিডে হোমে। অর্থাৎ নিউ দিঘার সৈকত থেকে প্রায় সাড়ে ৮০০ মিটার দূরে। পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। অমরাবতী পার্কের দিক দিয়ে এসে মূল সড়কটা পেরিয়ে তার পর সৈকতে যাওয়ার রাস্তা। রাস্তার ধার দিয়ে পর পর ছোটো ছোটো দোকান। রেস্তোরাঁ। ব্যাস এইটুকুই।

বাকিটা শুধুই ঝাউবন আর ঝাউবন। ঝাউবনের সেই সারি পেরিয়েই নিউ দিঘার সৈকত। ভাটা থাকলে তো সমুদ্র এমনিতেই অনেক দূরে। আর জোয়ার হলে কিছুটা কাছাকাছি। বিকেলের দিকে সৈকতে এলে বেশিক্ষণ থাকতাম না। অন্ধকার হয়ে গেলেই কেমন যেন গা ছমছম করা ব্যাপার। চারিদিক নির্জন। যদিও নিরাপত্তা নিয়ে কখনও কোনো প্রশ্ন ওঠেনি, তবুও ভয় লাগত।

এখন দিঘা গেলে ওল্ড দিঘায় থাকি। ঘুরতে যাই নিউ দিঘায়। কিন্তু তখন হত উল্টোটা। নিউ দিঘায় থাকতাম আর ঘুরতে আসতাম ওল্ড দিঘায়।

জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দারমনির একটি হোটেলের ঘর।

এক পরিচিত ভ্যানজেঠু ছিলেন, উমা জেঠু। নিশ্চয়ই এখনও আছেন, কিন্তু ১৯৯৮-এর পর যোগাযোগ আর হয়ে ওঠেনি। উমা জেঠুর ভ্যানে আমরা পুরো দিঘা চষে বেড়াতাম তখন। তখন নিউ দিঘা আর ওল্ড দিঘার মাঝখানে দু’ কিলোমিটার রাস্তাটা কী অদ্ভুত সুন্দর ছিল। সমুদ্রের দিকটা পুরোটাই ঝাউবন। আর অন্য দিকে তখন দু’একটা বাড়ি। তার মধ্যে দিঘার স্টেশনবাড়িটা ভীষণ নজর কাড়ত। ওটা তো অনেক আগেই তৈরি।

ওল্ড দিঘায় বিখ্যাত একটা রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া করতাম – এখনও করি। রাতের খাবার খেয়ে যখন নিউ দিঘায় ফিরতাম, তখন একটা অন্য রকম গা ছমছম করা অভিজ্ঞতা হত। ওল্ড দিঘার বাসস্ট্যান্ডটা পেরিয়ে যেতেই চারিদিকে শুধুই নিস্তব্ধতা। একমাত্র সমুদ্রের গর্জনেই সেই নিস্তব্ধতা ভাঙছে। হ্যাঁ, দিঘার মূল সড়ক থেকেই তখন সমুদ্রের গর্জন পাওয়া যেত।

এর পর সময় এগিয়ে গেল। আমরাও দিঘায় আমাদের ঠাঁই বদল করলাম। নিউ দিঘা থেকে সরে এলাম ওল্ডে। কারণ তখন মনে ধরেছে যে ঘর থেকেই সমুদ্র উপভোগ করব। ওল্ড দিঘার ব্যারিস্টার কলোনিতে জনপ্রিয় এক বেসরকারি হোটেলের সি-ফেসিং ঘর প্রায় বাধা হয়ে গেল আমাদের জন্য। এর পর যত বারই দিঘা গিয়েছি, ওই হোটেলেই উঠেছি।  

আর এর মধ্যে দিয়ে চাক্ষুষ করেছি দিঘার পরিবর্তন। প্রথম বার যখন ওই হোটেলে উঠি, আশেপাশে কার্যত কোনো হোটেল ছিল না। ব্যারিস্টার কলোনিতে বেশির ভাগই গৃহস্থ বাড়ি, হোটেল হাতেগোনা। শেষ বার গিয়ে দেখলাম হোটেলের ভিড়ে গৃহস্থবাড়ি আর দেখাই যাচ্ছে না।

আমরা যে হোটেলটায় উঠতাম, তার সমুদ্রমুখী গেট দিয়ে বেরিয়ে বাঁ দিকে ঘুরলে সুন্দর একটা বালির সৈকত রয়েছে। প্রথম বার ভীষণ মনে ধরেছিল সেটা। কিন্তু শেষ বার গিয়ে দেখলাম বালির সৈকতটা অক্ষত থাকলেও তার ধারের ঝাউগাছগুলোর মৃত্যু হয়েছে। কিছু নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এখন তো ওখান দিয়ে সৈকত সরণিকে বিস্তারও করে দেওয়া হয়েছে।

তবে ঝাউবন ধ্বংসের কথা বলতে গেলে সবার প্রথমেই আসবে নিউ দিঘার কথা। ১৯৯৮-এ যে নিউ দিঘায় সন্ধ্যার পরেই গা ছমছম করত, তার কোনো চিহ্নই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ঝাউগাছগুলোর আর কার্যত কোনো অস্তিত্ব নেই। নির্বিচারে তাদের ধ্বংস করে কংক্রিটের জঙ্গল বানানো হয়েছে। দু’একটা ঝাউগাছকে যেন মনে হচ্ছে সুভেনির হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে।

হোটেল তৈরি করার জন্য ঝাউবন অনেকটাই নষ্ট হয়েছে দিঘায়।

আর ওল্ড দিঘা-নিউ দিঘার মধ্যে তো কোনো পার্থক্যই খুঁজে পাওয়া যায় না। ওল্ড দিঘা কখন শেষ হল আর কখন যে নিউ দিঘা শুরু হয়ে গেল বোঝাই যায় না।

আমরা কী ভাবে ঝাউবনের গুরুত্বের কথা ভুলে গেলাম? এই ঝাউবনই সামুদ্রিক ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস থেকে গোটা দিঘা উপকূলকে রক্ষা করত। এর আগেও ঘূর্ণিঝড় হয়েছে দিঘায়, জলোচ্ছ্বাস হয়েছে, কিন্তু কখনও কি এই রকম সুনামিসুলভ ঘটনা সৈকতনগরীতে ঘটেছে? মনে করে দেখুন তো!

ব্যবসার স্বার্থে পরিবেশ ধ্বংসের কথা যদি বলতেই হয়, তা হলে অবশ্য দিঘার থেকেও আগে আসবে মন্দারমনি।

২০০৫-০৬ সাল থেকে বাংলার সমুদ্র পর্যটনের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে শুরু করে মন্দারমনি। দিঘা-শঙ্করপুরের পর বাংলার নবতম সৈকত। যথেষ্ট উত্তেজনা বাঙালি পর্যটকদের মধ্যে।

সৈকতের উপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে মন্দারমনি – এই ব্যাপারটা মানুষকে যেন আরও বেশি করে উৎসাহিত করে তোলে। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই মন্দারমনি নিয়ে রূঢ় সত্য সামনে আসতে শুরু করে। জানা যায় সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে মন্দারমনিতে গড়ে উঠছে একের পর এক হোটেল, পরিবেশের তোয়াক্কা না করেই।

২০০৬-এর আগস্টে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কাছে অভিযোগ আসে যে মন্দারমনির সমুদ্রসৈকতে কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই বেশ কয়েকটি হোটেল গড়ে উঠছে।অভিযোগে বলা হয় যে হোটেল করতে গিয়ে সমুদ্রসৈকতের কেয়া গাছের বন ধ্বংস করা হয়েছে, লাল কাঁকড়াদের বাসস্থান আক্রান্ত, আক্রান্ত সমুদ্রসৈকতের বাস্তুতন্ত্র, ভেঙে পড়েছে সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ।

বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ হোটেলগুলি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় সে সময়ই। কিন্তু লাভ হয়নি। ১৫ বছর পেরিয়ে মন্দারমণির অবস্থা আরও শোচনীয় হয়েছে। ২০০৬-এ মন্দারমনিতে তা-ও ছিল মাত্র ছ’টি হোটেল ও বিলাসবহুল রিসর্ট। ২০১৬-এ সেই সংখ্যাটা হয় ৫৩। এখন যে সেটা আরও বেশি, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

দিঘায় কার্যত সুনামি। শহরের ভেতরে সমুদ্রকে এ ভাবে ঢুকে আসতে কোনো দিনও দেখেননি দিঘাবাসী।

আগে তাও সৈকতের কিছুটা পেছনে হোটেল-রিসর্টগুলি হত। কিন্তু এখন তো মন্দারমনিতে এমন কয়েকটি রিসর্টও তৈরি হয়েছে যেখানে সাধারণ জোয়ারেই সমুদ্রের জল উঠোনে চলে আসে। হ্যাঁ, এটাই তাদের প্রধান আকর্ষণ।

অথচ কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৯১ সালে সৈকত পরিবেশের সুরক্ষায় একটি বিশেষ পদক্ষেপ করে। ‘পরিবেশ সুরক্ষা আইন ১৯৮৬’-এর অন্তর্গত ‘উপকূল নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল’ তথা Coastal Regulation Zone (CRZ) নিয়ে আসে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক। এই সিআরজেড আইন অনুযায়ী বছরের বৃহত্তম জোয়ারের (হাই টাইড) জল সমুদ্রতটের ভিতরে যেখানে স্পর্শ করে, তার পরেও ৫০০ মিটার এলাকার মধ্যে কোনো রকম নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু নয়া এই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, তট লন্ডভন্ড করে হোটেল গড়ে তোলার এক অশুভ প্রতিযো‌গিতা শুরু হয় যায় এই মন্দারমনিতে।

২০০৯ সালে কলকাতা হাইকোর্ট ফের সমুদ্র রক্ষা করার পরিবেশ আইনকে কার্যকর করতে নির্দেশ দেয়। হাইকোর্টের সেই আদেশ সবাইকে জানানোর জন্য বিজ্ঞাপিত করার আদেশও জারি হয়। কিন্তু লাভ হয়নি। ২০০৬ থেকে ২০২১ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ভাবে পরিবেশ আইন, হাইকোর্টের আদেশ ভেঙে গড়ে ওঠে পরিবেশ দুর্নীতির এক অনন্য নজির।

এই চরম অত্যাচারের ফলেই মন্দারমনির সমুদ্র সৈকতে হারিয়ে গিয়েছে জীববৈচিত্র্য। সমুদ্রসৈকত দাঁড়িয়ে আছে পরিবেশ-হত্যার বধ্যভূমি হয়ে। আইন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার চরম পরিণতিতে মন্দারমনির সৈকত ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

কতকটা একই কথা বলতে হয় তাজপুরের ক্ষেত্রেও। মন্দারমনির মতো পরিবেশ ধ্বংসের নজির কিন্তু তাজপুরে প্রথম দিকে ছিলই না। বরং সিআরজেডকে মান্যতা দিয়ে তাজপুরের প্রথম দিককার হোটেল-রিসর্টগুলো সমুদ্রের তীর থেকে অনেকটাই দূরে তৈরি হয়েছিল। হোটেল এবং সৈকতের মধ্যে ঝাউবনের সারি থাকত।

ঝাউবনের সেই সারি এখন আর তাজপুরেও দেখা যায় না। তাজপুরেও একটু একটু করে মন্দারমনির ছোঁয়া লেগেছে। কয়েকটি রিসর্ট তৈরি হয়েছে সমুদ্রের এক্কেবারে নাকের ডগায়। এই প্রসঙ্গেই নিজের ক্ষোভ চেপে রাখতে পারেননি তাজপুরেরই এক রিসর্টের কর্ণধার। তিনি নিয়ম মেনে নিজের রিসর্ট বানিয়েছিলেন সমুদ্র থেকে বেশি কিছুটা দূরে। তাঁর কথায়, “আমি প্রথমে যখন তাজপুরে গিয়েছিলাম, আমার কাছে সুযোগ ছিল বালিয়াড়ির একদম উপরে নিজের রিসর্টটা তৈরি করা। কিন্তু আমি সিআরজেড মেনেই রিসর্ট তৈরি করি।”

সেই সঙ্গেই তিনি যোগ করেন, “মানুষের অশিক্ষা আর লোভ সাংঘাতিক বিপদ ডেকে আনছে।”

একটা কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। প্রকৃতির উপরে অত্যাচার করলে প্রকৃতি তার বদলা নেবেই। এর অজস্র উদাহরণ আগে আমরা দেখেছি। হ্যাঁ, সে ভাবে পশ্চিমবঙ্গে হয়তো প্রথম বার দেখলাম। ফলে ‘ইয়াস’-এর তাণ্ডবে যেটা হয়েছে, সেটা একদিন না একদিন হওয়ারই ছিল।

পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলে বিশেষ করে মন্দারমনিতে সমুদ্রের তাণ্ডবের পর পর্যটন ব্যবসায়ীদের কান্না দেখে খারাপ লাগছে। কিন্তু একটা কথা বলতেই হয়, আজ থেকে ১৫ বছর আগে যখন পরিবেশ ধ্বংস করে মন্দারমনি গড়ে উঠছে, তখন পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে এই কান্নাটা যদি কেউ কাঁদতেন, তা হলে আজকের এই পরিস্থিতিই তৈরি হত না।

আরও পড়ুন: এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দক্ষিণবঙ্গ

- Advertisement -

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

- Advertisement -

আপডেট

পড়তে পারেন