নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : খুনের অভিযোগ ঝুলছে মাথার ওপর। প্রাণ বড়ো বালাই! তাই প্রেম ভুলে এ বার নিজের প্রাণ বাঁচাতে  রাজসাক্ষী হতে চান অনির্বাণ।

উত্তম মোহন্ত খুনে অন্যতম মূল অভিযুক্ত অনির্বাণ রায় শুক্রবার জলপাইগুড়ির মুখ্য বিচার বিভাগীয় বিচারকের কাছে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর এই আবেদন ঘিরে জন্ম নিয়েছে বেশ কিছু প্রশ্নও।

গত ২৯ জুন জলপাইগুড়িতে নিজের ফ্ল্যাটে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় জীবনবিমা নিগমের ডেভেলপমেন্ট অফিসার উত্তম মোহন্তর। তাঁর দাদা স্বপন মোহন্ত উত্তমবাবুর স্ত্রী লিপিকা এবং লিপিকার প্রেমিক অনির্বাণ রায়ের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ দায়ের করেন।

ঘটনার পর দিনই গ্রেফতার হন লিপিকা। ১৩ দিন পরে গ্রেফতার হন মেয়ে শ্বেতাও। কিন্তু পালিয়ে যান অনির্বাণ। ৫৬ দিন ফেরার থাকার পর ‘টোপ’ ফেলে হাওড়ার গোলাবাড়ি থেকে তাঁকে ধরা হয়। বারো দিন পুলিশ হেফাজতের শেষে আপাতত তাঁর ঠিকানা জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার। বৃহস্পতিবার তাঁকে শুনানির জন্য আদালতে আনা হয়। সেখানে বিচারক দেবপ্রিয় বসুর কাছে রাজসাক্ষী হতে চাওয়ার আবেদন জানান অনির্বাণ। আদালতের সরকারি আইনজীবী প্রদীপ চ্যাটার্জী জানিয়েছেন, অনির্বাণ রাজসাক্ষী হতে চেয়ে লিখিত ভাবে আবেদন জানিয়েছেন।

অনির্বাণ রাজসাক্ষী হলে বিপদ বাড়বে অভিযুক্ত লিপিকা এবং তাঁর মেয়ে শ্বেতা মোহন্তর। কারণ এই খুনের ঘটনায় এই তিন জনই মূল অভিযুক্ত। সে দিন ওই ফ্ল্যাটে কী ঘটেছিল, তা লিপিকা এবং শ্বেতার পাশাপাশি জানে শুধু অনির্বাণ। গ্রেফতারির পর সংশোধনাগারে মুখোমুখি জেরার সময় লিপিকা এবং শ্বেতার দিকেই খুনে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন অনির্বাণ। এখন রাজসাক্ষী হয়ে যদি তাঁদের বিরুদ্ধে বয়ান দেন অনির্বাণ,  তা হলে লিপিকা এবং শ্বেতার বিপদ আরও বাড়বে।

anirban taken to court
আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অনির্বাণকে।

এখন প্রশ্ন কেন হঠাৎ রাজসাক্ষী হতে চাইছেন অনির্বাণ?  যে প্রেমিকার সঙ্গে ঘর বাঁধতে চেয়ে তাঁর স্বামীকে খুনের ছক কষেছিলেন ঠান্ডা মাথায়, তাঁর বিরুদ্ধে কেন বয়ান দিতে চাইছেন তিনি?

এর একমাত্র কারণ, নিজেকে বাঁচানো,  বলছে পুলিশমহল। ১২ দিন পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন তাঁর স্বভাব-আচরণ খুঁটিয়ে লক্ষ করেছিলেন তদন্তকারী অফিসাররা। ধুরন্ধর এই যুবক অর্থের লোভে বয়সে অনেকটাই বড়ো লিপিকার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল উত্তম মোহন্তকে সরিয়ে দিতে পারলে তাঁর অগাধ সম্পত্তির কিছুটা ভাগে পাবেন। কিন্তু লিপিকা এবং তিনি নিজে গ্রেফতার হওয়ায় সে আশায় জল পড়েছে। তা ছাড়া তাঁর একাধিক নারী-সংসর্গের কথা জানতে পেরে মুখোমুখি জেরার সময় লিপিকার কটুবাক্যও শুনতে হয়েছে অনির্বাণকে। ফলে ‘প্রেম’ এখন হাওয়া,  এ বার শাস্তি এড়ানোর ছক কষছেন তিনি।

যদিও তাতে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। কারণ সূত্রের খবর,  পুলিশ অনির্বাণকে রাজসাক্ষী করতে আগ্রহী নয়। এর আগে গ্রেফতার হওয়ার পর শ্বেতা মোহন্তকে রাজসাক্ষী করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাতে ফল মেলেনি। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে জামিনে মুক্তি পেয়ে যান শ্বেতা মোহন্ত।

তাই এখন কত তাড়াতাড়ি এই কেসের চার্জশিট তৈরি করা যায়,  সে দিকেই নজর তদন্তকারী অফিসারদের। তাঁদের লক্ষ্য,  এক অভিযুক্ত জামিন পেলেও বাকি দু’ জনের যাতে ‘কাস্টোডি ট্রায়াল’ করা যায়। রাজসাক্ষী হলে শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ থাকে অভিযুক্তের। কিন্তু অনির্বাণ দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি পাক,  চাইছে পুলিশ। তাই আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ৯০ দিনের আগেই চার্জশিট জমা পড়বে আদালতে, খবর পুলিশ সূত্রে। লিপিকার আইনজীবী সন্দীপ দত্ত জানিয়েছেন,  অনির্বাণ রাজসাক্ষী হতে পারবে কি না তা অনেকটাই নির্ভর করছে পুলিশের সিদ্ধান্তে ওপর। তাই শাস্তির খাঁড়া এড়াতে রাজসাক্ষী হতে চাইলেও সব দিক খতিয়ে দেখে কী সিদ্ধান্ত নেয় আদালত তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী শুনানির দিন পর্যন্ত।

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন