সাহিত্যিক অদ্রীশ বর্ধন প্রয়াত

0

ওয়েবডেস্ক: মারা গেলেন সাহিত্যিক অদ্রীশ বর্ধন। মঙ্গলবার সকালে নীলরতন সরকার হাসপাতালে প্রয়াত হলেন ‘প্রফেসর নাটবল্টুচক্র’-এর স্রষ্টা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮। বার্ধক্যজনিত কারণে বেশ কয়েক বছর ধরেই ভুগছিলেন অদ্রীশ। তাঁর সৃষ্টি ডিকেটটিভ ইন্দ্রনাথ রুদ্র, লেডি ডিটেকটিভ নারায়ণী, ফাদার ঘনশ্যাম, প্রফেসর নাটবন্টু চক্র ইত্যাদি চরিতে শুধু ছোটোদের নয়, বড়োদেরও সমান ভাবে আকর্ষণ করে। সায়েন্স ফিকশনের বাংলা প্রতিশব্দ তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন – কল্পবিজ্ঞান।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

বাংলায় কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ ও একাধিক কল্পবিজ্ঞান পত্রিকার সম্পাদক এবং কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ অদ্রীশ বর্ধনের জন্ম কলকাতায়, এক শিক্ষক পরিবারে, ১৯৩২-এর ১ ডিসেম্বরে। বাবা অনিল বর্ধন ছিলেন স্কুলশিক্ষক, ঠাকুরদা চণ্ডীচরণ বর্ধন বউবাজারের সার্পেন্টাইন লেনে ‘হিন্দু বয়েজ স্কুল’ নামে একটি বিদ্যালয় চালাতেন। সেই স্কুলেই বিদ্যারম্ভ অদ্রীশের। পরবর্তী কালে পড়াশোনা বিজ্ঞান নিয়ে।

ছোটোবেলা থেকেই অজানার প্রতি দুর্নিবার টানা। শিব্রাম চক্রবর্তীর ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ পড়ে কুড়ি বছর বয়সেই বোম্বে (মুম্বই) পলায়ন। হরেক চাকরি করে শেষ পর্যন্ত ‘ক্যালকাটা কেমিক্যাল’-এ। পোস্টিং ব্যাঙ্গালোরে (বেঙ্গালুরু)। কর্মসূত্রে দক্ষিণ ভারতের নানা জায়গা দেখা। অবসর সময়ে লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এক জায়গায় আটকে থাকার মানসিকতা ছিল না অদ্রীশের। চাকরি পালটাতে পালটাতে নামী কোম্পানির পারচেজ ম্যানেজার ও ডিরেক্টরের বিশেষ সচিব। শেষ পর্যন্ত সেই চাকরিতেও ইস্তফা দিয়ে কলকাতায় ফিরে আসা। আর চাকরি নয়, এ বার দেওয়াল পত্রিকা দিয়ে সাহিত্য সাধনা শুরু। লিখলেন ভূতের গল্প ‘পোড়োবাড়ির খাঁড়া’। এর আগেই অবশ্য ‘উল্টোরথ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল গোয়েন্দা গল্প, ‘আমার বান্ধবী সুনন্দা’, বোম্বে থেকে পাঠানো।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী অস্ত্রময়/ প্রথম পর্ব

বিদেশে তখন সায়েন্স ফিকশনের স্বর্ণযুগ। বাংলায় তখন ‘বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনি’র তেমন কদর নেই। অদ্রীশের মাথায় এল বিষয়টা। ষাটের দশকের গোড়াতেই কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখতে শুরু করলেন অদ্রীশ। “ভূতের গল্প যেমন ভূতেদের জন্য নয়, ঠিক তেমনি কল্পবিজ্ঞানও বৈজ্ঞানিকদের জন্য নয়” – এমন আপ্তবাক্য মাথায় রেখেই ১৯৬৩-এর জানুয়ারিতে আকাশ সেন ছদ্মনামে অদ্রীশ বর্ধন সূচনা করেন ভারতের প্রথম কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা মাসিক ‘আশ্চর্য!’। একই সঙ্গে স্থাপন করেন একটি প্রকাশনা সংস্থাও, ‘আলফা-বিটা পাবলিকেশন্‌স্‌’। অল্প দিনেই পত্রিকা জনপ্রিয় হয়ে উঠল। কিছু দিনের মধ্যে বুঝতে পারলেন, নিজস্ব প্রেস না থাকলে পত্রিকা ঠিক সময়ে প্রকাশ করা সমস্যার। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। বাড়ির একতলাতেই বসিয়ে ফেললেন ‘দীপ্তি প্রিন্টার্স’। ‘আশ্চর্য!’ পত্রিকার প্রথম দিন থেকেই প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সত্যজিৎ রায়। ‘আশ্চর্য!’ পত্রিকায় কল্পবিজ্ঞানের সাহিত্য ছাড়াও প্রকাশিত হত বিজ্ঞানের নানা খবর, দেশবিদেশের বিচিত্র সব ঘটনার কথা। এক সময় ছদ্মনাম ছেড়ে স্বনামে পত্রিকা সম্পাদনা করতে থাকেন অদ্রীশ।

বিবাহের দু’ বছরের মাথায় ১৯৭২ সালে এক বছরের সন্তানকে রেখে মারা যান অদ্রীশ বর্ধনের স্ত্রী। মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন অদ্রীশ। পত্রিকার ভার যায় দাদা ড. অসীম বর্ধনের হাতে। সেই বছরেই অনিয়মিত হয়ে পড়ে পত্রিকা প্রকাশনা। শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় ‘আশ্চর্য!’। পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেই জুল ভের্নের রচনাবলি অনুবাদের কাজে হাত দেন অদ্রীশ। স্ত্রীবিয়োগের পর থেকেই মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যেত অদ্রীশবাবুর। বাকি রাতটা ঘুমোতে না পেরে জুল ভের্ন অনুবাদ করে কাটিয়ে দিতেন। এই ভাবেই সমগ্র রচনাবলি অনুবাদ হয়ে গেল।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী অস্ত্রময়/ শেষ পর্ব

১৯৭৫ সালে স্বনামেই শুরু করলেন ‘ফ্যানটাসটিক’ পত্রিকা সম্পাদনার কাজ। এই প্রসঙ্গে সম্পাদক গল্পচ্ছলে বলেছিলেন, “‘আশ্চর্য!’র পরে ‘অত্যাশ্চর্য’ বের করার উপদেশ দিয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। চন্দ্রনাথ দে প্রচ্ছদও এঁকে ফেলেছিলেন। কিন্তু অনুমতি পাওয়া গেল ‘ফ্যানটাসটিক’ নামের।” উপযুক্ত লেখার অভাবে ‘ফ্যানটাসটিক’ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ১৯৮৩ সালে আরও একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশে উদ্যোগী হন অদ্রীশ। কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৮৪ সালের জুলাইয়ে ইত্যাদি প্রকাশনীর ‘কিশোর মন’ পত্রিকা সম্পাদনার কাজে যোগ দেন। ১৯৮৬-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ওই পত্রিকার ৫০টি সংখ্যা সম্পাদনা করার পর ইস্তফা দিয়ে চলে আসেন ‘ফ্যানটাসটিক’-এর কাজে।

সারা জীবনে দেড়শোরও বেশি বই লিখেছেন ও অনুবাদ করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চার খণ্ডে ‘জুলে ভের্ন সমগ্র’, ১৩ খণ্ডে ‘গোয়েন্দা ইন্দ্রনাথ রুদ্র সমগ্র’, ৩ খণ্ডে ‘আমার মা সব জানে’, ২ খণ্ডে ‘প্রফেসর নাটবল্টুচক্র সংগ্রহ’, ২ খণ্ডে ‘শার্লক হোমস সমগ্র’, ৩ খণ্ডে এডগার অ্যালান পোর রচনা সংগ্রহ’ ইত্যাদি। সারা জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার আর সম্মান। বয়সের ভারে আজ হারিয়েছিলেন কর্মক্ষমতা, হারিয়েছিলেন স্মৃতিশক্তিও। আজ তিনি চিরতরে চলে গেলেন। তবে যত দিন বাংলা কল্পবিজ্ঞান থাকবে, তত দিন অদ্রীশ বর্ধনের নাম বিনম্র শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here