স্ত্রী-র পর মেয়ে ধৃত, জলপাইগুড়ির উত্তম মোহন্ত খুনের মামলায় নতুন মোড়

0
5381
শ্বেতাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: বাবার খুনের ঘটনায় গ্রেফতার কলেজপড়ুয়া মেয়ে। বিস্ফোরক মোড় নিল জীবনবিমা  নিগমের ডেভেলপমেন্ট অফিসার উত্তম মোহন্তর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা। বৃহস্পতিবার বিকেলে উত্তমবাবুর মেয়ে শ্বেতা মোহন্তকে গ্রেফতার করে জলপাইগুড়ির কোতোয়ালি থানার পুলিশ। তার বিরুদ্ধে খুনে মদত দেওয়ার এবং সত্য গোপন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

গত ২৯ জুন নিজের ভাড়া ফ্ল্যাটেই মৃত্যু হয় উত্তম মোহন্তর। জীবনবিমা নিগমের ডেভেলপমেন্ট অফিসার ছিলেন তিনি। আদতে কোচবিহারের বাসিন্দা হলেও কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ধরে জলপাইগুড়িতে স্ত্রী লিপিকা ও একমাত্র মেয়ে শ্বেতাকে নিয়ে ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতেন উত্তমবাবু। মেয়ে শ্বেতা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী এবং একটি নামী মডেলিং-অভিনয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও ছাত্রী।

উত্তম মোহন্ত।

উত্তম মোহন্তর মৃত্যুর পর দিন জলপাইগুড়ি কোতোয়ালি থানায় খুনের অভিযোগ দায়ের করেন মৃতের দাদা স্বপন মোহন্ত। চাঞ্চল্যকর অভিযোগে আনেন উত্তমবাবুর পরিবার। তাদের অভিযোগ ছিল, তালমার বাসিন্দা অনির্বাণ রায় নামে এক যুবকের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে লিপিকার। সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে এবং উত্তমবাবুর অঢেল সম্পত্তি পাওয়ার লোভেই ছক কষে খাবারে বিষ মিশিয়ে তাঁকে খুন করেছেন লিপিকা ও অনির্বাণ। ১ জুলাই লিপিকাকে গ্রেফতার করে দু’ দফায় ১৩ দিনের জন্য নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ। তাঁকে জেরা করে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

পুলিশ সূত্রে খবর, জেরায় লিপিকা দেবী জানিয়েছেন মদ্যপ ও অত্যাচারী ছিলেন উত্তম মোহন্ত। তার জেরেই অনির্বাণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়। স্বামীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে অনির্বাণকে দিতেন তিনি। দু’ বার অনির্বাণের সঙ্গে ভিন রাজ্যে চলে গিয়েছিলেন লিপিকা। সেই সময় স্বামীর অ্যাকাউন্ট থেকে ৯ লক্ষ টাকা নিয়ে যান, যার অনেকটা চলে গিয়েছিল অনির্বাণের হাতে। পরে স্বামীর কাছে ফিরে আসার পরও প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে গিয়েছেন তিনি। সব চেয়ে চাঞ্চল্যকর ব্যাপার, বেডরুমে স্বামীকে বেঁধে রেখে, পাশের ঘরে প্রেমিক অনির্বাণকে নিয়ে রাত কাটাতেন লিপিকা, জেরায় স্বীকারোক্তি তাঁর। এমনকি উত্তমবাবুর মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে থেকে ওই বাড়িতেই ছিলেন অনির্বাণ। মৃত্যুর পর দিন সে গা ঢাকা দেয়। পুলিশ জানতে পেরেছে নিয়মিত লিপিকার কাছ থেকে টাকা নিত অনির্বাণ। টাকার জন্যই লিপিকার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিল সে, এমনটাই ধারণা পুলিশের। প্রয়োজনে অনির্বাণ ভয় দেখিয়ে একাধিকবার লিপিকার কাছ থেকে মোটা টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে জেরায় সামনে এসেছে। পলাতক অনির্বাণের খোঁজে হন্যে হয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।

গ্রেফতারের পর লিপিকা মোহন্ত।

জেরায় জানা গিয়েছে, উত্তমবাবুর মৃত্যুর পর ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য তাঁর দেহ নিয়ে জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালেও যান লিপিকা ও অনির্বাণ। কিন্তু ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে মৃতদেহ নিয়ে পালিয়ে আসেন হাসপাতাল থেকে। এক অ্যাম্বুলেন্স চালকের সাহায্যে ধনঞ্জয় চতুর্বেদী নামে এক আয়ুর্বেদিক চিকিৎসককে টাকা দিয়ে ডেথ সার্টিফিকেটও বানিয়ে নেয় তারা। যদিও উত্তমবাবুর পরিবারের বাধায় সেই মৃতদেহ সৎকার করা যায়নি। পরে উত্তমবাবুর দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা পরীক্ষার জন্য পাঠায় পুলিশ। ভুয়ো ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে আপাতত জেলে আছেন ওই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকও। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, আম-দুধের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে উত্তম মোহন্তকে খাওয়ানো হয়েছিল। যদিও ময়নাতদন্তের পুর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এবং ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়ার পরেই মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।

এ দিকে এই ঘটনায় মায়ের সঙ্গে মেয়ের দিকেও আঙুল তুলছিলেন উত্তমবাবুর দাদারা। পুলিশ তাঁকেও লাগাতার জেরা করছিল। ঘটনার দিন তিনি ওই ফ্ল্যাটেই ছিলেন। তাই বেশ কিছু প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলেছিল পুলিশকে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে কেন মায়ের অবৈধ সম্পর্ক দিনের পর দিন মেনে নিলেন? তদন্তকারী অফিসারের ধারণা, মৃত্যুর দিনের সব ঘটনা পুলিশের কাছে জানাননি শ্বেতা। মায়ের বয়ান এবং মেয়ের বয়ানে বিস্তর অসংগতিও রয়েছে বলে দাবি পুলিশের। তাঁকে জেরা করলে অনেক তথ্যই সামনে উঠে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই কারণেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি।

মা-মেয়েকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করলে অনেক সত্যই সামনে আসবে বলে ধারণা পুলিশের। তাই আগামী কাল শুক্রবার তাকে জলপাইগুড়ি আদালতে তুলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

মডেলিং-এর ছাত্রী শ্বেতা।

যদিও এ দিন শ্বেতা মোহন্ত দাবি করেছেন, তাঁর জেঠা-কাকারা সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে তাঁকে আর তাঁর মাকে ফাঁসিয়েছেন। তাঁর বাবার মৃত্যু খুন নয় বলেও দাবি শ্বেতার। এ দিকে শ্বেতার আইনজীবী সন্দীপ দত্ত জানিয়েছেন, অনির্বাণকে ধরতে না পেরে উত্তমবাবুর পরিবারের চাপে পড়ে শ্বেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আগামী কাল তাঁর জামিনের জন্য আবেদন করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। শ্বেতার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে উত্তম মোহন্তর দাদা স্বপন মোহন্ত জানিয়েছেন, শ্বেতাকে জেরা করলেই খুনের ঘটনার সত্যতা সামনে আসবে বলে ধারণা তাঁদের।

প্রায় দু’ সপ্তাহ আগে একটি মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে, সম্পর্কে অবিশ্বাস, জটিলতা, অর্থের লোভ এবং সামাজিক অবক্ষয়ের যে চিত্র ধরা পড়েছে তা নাড়িয়ে দিয়েছে শহরবাসীকে। এর পর তা কোন দিকে মোড় নেয়, তাই নিয়েই জোর আলোচনা চলচ্ছে শহরের রাস্তার মোড়ে, চায়ের আড্ডায়, এমনকি অফিসের কাজের মধ্যেও।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here