মহারণ বাংলায়, তবে ১৩ বছর পর নন্দীগ্রাম থেকেই কি ফের যুদ্ধের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে?

0

খবরঅনলাইন ডেস্ক: বিধানসভা ভোটের আগে হাতে মাত্র মাস চারেক সময়। তার আগেই উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে রাজ্য-রাজনীতিতে। বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নতুন মোড় বিধানসভার মহারণে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে অনেকেই মনে করছেন, প্রায় ১৩ বছর পর নন্দীগ্রাম থেকেই ফের যুদ্ধের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে।

২০০৭ সালের ৭ জানুয়ারি নন্দীগ্রামের (Nadigram) জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনে সোনাচূড়ায় তিন জনের মৃত্যু হয়। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের (Left Front government) বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল এই গণআন্দোলন। অনেকের মতে, এই আন্দোলনই ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) রাজ্যের ক্ষমতা দখলের দিকে এক ধাক্কায় এগিয়ে দিয়েছিল। ২০০৮ সাল থেকে এই দিনটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর স্মরণ অনুষ্ঠান করেন শুভেন্দু অধিকারী। এ বার সেই একই দিনে নন্দীগ্রামের আন্দোলনকে স্মরণ করে সভা করবেন মমতা।

নয়া রাজনৈতিক চিত্রনাট্য

গত ১৯ ডিসেম্বর শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দিতেই রাজনৈতিক ব্যাকরণ বদলে গিয়েছে আচমকাই। ২০১১ সালের পর থেকে নন্দীগ্রামে মমতার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন শুভেন্দু। ২৪ ডিসেম্বর কাঁথির সভা থেকে শুভেন্দু বলেন, “রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর থেকে দল নন্দীগ্রামের দায়িত্ব আমার হাতেই ছেড়ে দিয়েছিল। এখন ভোটের আগে ফের তাঁদের নন্দীগ্রামের কথা মনে পড়ছে। আপনি (মমতা) এত দিন কোথায় ছিলেন? আমি কিন্তু এখানকার মানুষকে কখনোই ভুলে যাইনি”।

একই সঙ্গে শুভেন্দু বলেন, “নন্দীগ্রাম ভারতের মধ্যে একটা জায়গা। তাই মুখ্যমন্ত্রী সভা করতে আসতেই পারেন। তাঁকে আমি বহিরাগত বলব না”। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর সভার পর দিনই (৮ জানুয়ারি) নন্দীগ্রামে পালটা সভা করার কথা ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু। সব মিলিয়ে ১৩ বছর আগের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের রেশ ধরে রাজ্য-রাজনীতিতে নতুন করে চিত্রনাট্য রচনা হতে চলেছে।

নন্দীগ্রাম নিয়ে টানামানি

তৃণমূলের (TMC) বিশ্বাস, নন্দীগ্রামের মানুষ এখনও মমতার দিকেই ঝুঁকে রয়েছেন। কারণ তিনি ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার পর থেকেই তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। নন্দীগ্রাম আন্দোলন ছিল প্রকৃত অর্থে গণআন্দোলন। স্থানীয় মানুষই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। নিজের নিরাপত্তার কথা মাথায় না রেখে স্থানীয় মানুষের সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মমতা। শুভেন্দু সেখানে ছিলেন না। সেই আন্দোলন খেজুরিতে ছড়িয়ে পড়ার পর শুভেন্দু যোগ দেন। প্রকৃত ইতিহাসকে কেউ বিকৃত করতে পারবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তৃণমূল।

আবার বিজেপির (BJP) দাবি, নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় লালকৃষ্ণ আডবাণী, সুষমা স্বরাজের মতো নেতানেত্রীরা এসেছিলেন। ফলে, নন্দীগ্রামের সঙ্গে বিজেপি-র সম্পর্ক নেই, এটা বলা ভুল। শুভেন্দু নিজের ভূমিকার সঙ্গে বাড়তি সংযোজন করছেন এই ব্যাখ্যাকেও। তিনি বলেছেন, প্রতি বছর এই দিনটাতে (শহিদ দিবসে) তিনি যোগ দেন। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, “ওনার (মমতার) সভায় সরকারি ক্ষমতায় লোক জড়ো করা হবে। আমার সভায় লোক আসবে ভালোবাসায়-আবেগে”।

চ্যালেঞ্জের নাম নন্দীগ্রাম

গেরুয়া শিবিরে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তৃণমূল নেতৃত্ব শুভেন্দুকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন – হিম্মত থাকলে প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী নন্দীগ্রাম থেকেই প্রার্থী হয়ে দেখান। এমনকি সদ্য বিজেপি থেকে তৃণমূলে নাম লেখানো সুজাতা মণ্ডল খাঁ (যিনি বিজেপি সাংসদ সৌমত্র খাঁর স্ত্রী) প্রকাশ্য সভায় নন্দীগ্রামে শুভেন্দুকে প্রার্থী হওয়ার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।

২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের ভোটে নন্দীগ্রামে প্রার্থী হয়েছিলেন ফিরোজা বিবি। ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ পুলিশের গুলিচালনায় নিহত ‘শহিদের মা’ হিসাবে পরিচিত তিনি। ওই ভোটে তিনি ৬১.২১ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। পরের বার, ২০১৬ সালে ওই কেন্দ্রে প্রার্থী হন শুভেন্দু। শেষবারে সমর্থন আরও বেশ কিছুটা বেড়ে যায়। ৬৭.২০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন শুভেন্দু।

নন্দীগ্রামের আশীর্বাদ

২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে ২৩৫ আসনে জিতে মহাকরণে ফিরে যান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বামফ্রন্টের নির্বাচনী স্লোগান ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’ রূপায়ণে জোর কদমে কাজে নেমে পড়েন তিনি। কিন্তু হুগলির সিঙ্গুরে টাটা মোটর্সের ছোটোগাড়ি কারখানা এবং নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব নিয়ে জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয় তাঁকে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরের ‘আশীর্বাদ’ নিয়েই ২০১১ সালে রাজ্যের শাসনক্ষমতার বদল হয়। জমি-অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বামফ্রন্টের রাজ্যপাট রীতিমতো ছিনিয়ে নেন মমতা। এখন তারই একটি আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়েই চলছে ভাগাভাগি। মাঝখানে থেকে শুভেন্দুকে জালে তুলে নিয়ে মাথা গুঁজতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। এক সময় বামফ্রন্ট বনাম তৃণমূল লড়াই জমে উঠেছিল এই নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে। এখন কার্যত তা তৃণমূল বনাম প্রাক্তন তৃণমূলের। কে কতটা এগিয়ে তার ইঙ্গিত মিলতে পারে আগামী ৭-৮ জানুয়ারি।

নন্দীগ্রাম আন্দোলন

নন্দীগ্রামে প্রস্তাবিত কেমিক্যাল হাব গড়ার বরাত পেয়েছিল সালেম গোষ্ঠী। একাধিক উচ্চপর্যায়ের প্রকল্পের জন্য সালিম গোষ্ঠীকে মোট ৩৫ হাজার একর জমি দেওয়ার কথা হয়। হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদ ২০০৭ সালের ৩ জানুয়ারি জমি অধিগ্রহণের নোটিশ জারি করে। ২০০৭ সালের ৫ জানুয়ারি এই অঞ্চলের তিনটি সেজ-বিরোধী সংগঠন যৌথ ভাবে আন্দোলন পরিচালনার লক্ষ্যে একত্রিত হয়ে কমিটি গড়ে তোলেন।

ঘটনায় প্রকাশ, ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিন হাজার পুলিশ সমন্বিত এক বিশাল বাহিনীর অভিযান চালানো হয়। কমিটি প্রায় দু’ হাজার গ্রামবাসীকে একত্রিত করে প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলে। প্রতিরোধ বাহিনীর উপর পুলিশ গুলি চালালে কমপক্ষে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। চরম বিতর্কের মুখে পড়ে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। (তথ্য:সংগৃহীত)

আরও পড়তে পারেন: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করতে সিপিএমের লাইনেই খেলছেন শুভেন্দু অধিকারী

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন