tanmoy with his parents
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

“ছেলেটা নিজের চেষ্টায় এত দূর এল। কিন্তু এর পর আর কী ভাবে লেখাপড়া শেখাব জানি না” – মাটির দাওয়ায় বসে কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন তাপসী পাল বসাক। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ছেলে তন্ময়। মাথা নিচু করে মায়ের কথাগুলো শোনার মাঝেই চোয়াল শক্ত হয় বছর ষোলোর কিশোরের – “আমি নিজে কাজ করে যে ভাবেই হোক পড়াশোনা চালাব।”

আত্মবিশ্বাসটা আর যা-ই হোক অহেতুক নয়, তা টের পাওয়া যায় মাধ্যমিকের মার্কশিটে নজর মেলালেই। বাংলা ও জীবন বিজ্ঞানে লেটার নিয়ে ৪৬১ নম্বর পেয়ে সদ্য মাধ্যমিক পাস করেছে তন্ময়। চোখে স্বপ্ন আরও বড়ো হওয়ার। আর সেই স্বপ্নে যে বাদ সাধবে দারিদ্র্য তা বিলক্ষণ জানা আছে তার। তবুও হাল না ছেড়ে কখনও প্রতিমা গড়ার কাজ করে আবার কখনও তাঁতশ্রমিক বাবার সঙ্গে কাজে হাত লাগিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তন্ময়।
শান্তিপুর থানার ফুলিয়া টাউনশিপ গ্রাম পঞ্চায়েতের ফুলিয়া কলোনি পালপাড়ার বাসিন্দা শ্রীবাস পাল। টিনের ছোট্টো একরত্তি বাড়িতে স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে সংসার। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বড়ো ছেলে বিশ্বজিৎ বাবার সঙ্গেই তাঁতশ্রমিকের কাজ করে। নিদারুণ অনটনের সংসারে অবশ্য ছোটো ছেলে তন্ময়কে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে পরিবার।
tanmoy engaged in his work
মাটির কাজে ব্যস্ত তন্ময়।

ফুলিয়া শিক্ষানিকেতনের ছাত্র তন্ময় নিজেও জানে তার পড়াশোনা চালানোর প্রতিবন্ধকতা। এর মধ্যে নিরলস পরিশ্রমে বড়ো হওয়ার স্বপ্ন বুনে চলে সে। পড়াশোনা করার পাশাপাশি সে তাঁতশ্রমিকের কাজে সাহায্য করেছে বাবাকে। আবার স্কুল থেকে ফিরে বসে গিয়েছে প্রতিমা গড়ার কাজে। তার বয়সি আর পাঁচটা ছেলে যখন স্কুল বা প্রাইভেট পড়ার ফাঁকে খেলাধূলা করে, তখন সে ব্যস্ত জীবনসংগ্রামে। বাড়িতে বই নিয়ে বসার ফাঁকেও ছেদ পড়েনি সেই রুটিনে। মাত্র চার নম্বরের জন্য লেটার হাতছাড়া হয়েছে ভূগোলে। তা নিয়ে আপশোশ যাচ্ছে না পরিবারেরও। আসলে পরীক্ষার মধ্যেও প্রতিমা তৈরি এবং তাঁতের কাজ করেছে তন্ময়, যাতে সংসারে আরও কিছু অর্থ আসে।

তন্ময়ের মা তাপসী দেবী এবং বাবা শ্রীবাসবাবু বলছেন, ছেলেটা নিজে কাজ করে পড়াশোনা চালিয়েছে। কিন্তু এ ভাবে আর কত দিন চালানো যাবে জানি না। গৃহশিক্ষক ও স্কুলের শিক্ষকেরা নানা ভাবে সাহায্য করেছেন।” স্থানীয় বাসিন্দা এবং পেশায় একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ভানুদয় মণ্ডল বলেন, “যে ভাবে নিজে কাজ করে পড়াশোনা চালিয়ে যাবতীয় অভাবকে হারিয়ে এগিয়ে যাওয়ার লড়াই করছে তন্ময় তা চোখের সামনে দেখেছি। আমরা সবাই ওর পাশে দাঁড়াব।”
মাধ্যমিকে তার অন্যতম বিষয় ছিল অটোমোবাইল। ভবিষ্যতে অটোমোবাইল নিয়ে পড়তে চায় সে। উচ্চশিক্ষার খরচ অনেক তা জানে তন্ময়ের পরিবার। পরিবারের কথায়, এখন কেউ যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তো ভালো, নইলে যে কী হবে জানা নেই। আর তন্ময় নিজে বলছে, লড়াই করে পড়াশোনা চালাচ্ছি। অটোমোবাইল নিয়ে পড়তে চাই। আমি বড়ো হয়ে সংসারের হাল ধরতে চাই। কিন্তু …….। সামনে লড়াইটা অনেক কঠিন তা জানে তন্ময় নিজেও।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন