শৈবাল বিশ্বাস

শুধুমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতা করে এ রাজ্য‌ে কোনো লাভ হচ্ছে না। মেরুকরণের রাজনীতিতে সমস্ত ক্ষীরটুকু ভাগাভাগি করে নিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপি। এই পরিস্থিতিতে দলের রণকৌশল কিঞ্চিৎ বদলে বিজেপির বিরুদ্ধেই সব চেয়ে বেশি চড়া সুরে মাঠে নামতে চলেছে সিপিএম। মে মাস থেকেই বিজেপি-বিরোধী একগাদা কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নামা হবে।

গত ১৮-১৯ এপ্রিল দিল্লিতে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গে দলের ভোট ক্রমশ কমে যাওয়া ও বিজেপির ভোটবৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। শ্য‌ামল চক্রবর্তী, নৃপেন চৌধুরী প্রমুখ পশ্চিমবঙ্গের একাধিক নেতা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তাতে স্থির হয়েছে, বিজেপি-বিরোধী আন্দোলন ও প্রচারের গতি আরও বাড়াতে হবে। শুধু তা-ই নয়, সেই সব আন্দোলনকে বাস্তবমুখী করে তুলতে হবে যাতে মানুষ বুঝতে পারেন বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের একমাত্র বিকল্প বাম-গণতান্ত্রিক শক্তি, তৃণমূল কংগ্রেস নয়। অর্থাৎ আগামী দিনে এ রাজ্য‌ে সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলন এবং কেন্দ্র-বিরোধী আন্দোলন – এই দু’টি ক্ষেত্রেই ঝাঁঝ আনতে হবে।

সামনে ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচন। তার আগে এমন কোনো বিধানসভা নির্বাচন নেই যেখানে সিপিএম বা কোনো বামদলের পাওয়ার কিছু আছে। ফলে এই মুহূর্তে প্রধান লক্ষ্য‌ হওয়া উচিত কী ভাবে কেন্দ্র থেকে বিজেপিকে সরানো যায় তার চেষ্টা করা। সেই লক্ষ্য‌ে পৌঁছতে গেলে কংগ্রেস-সহ সমস্ত বিরোধী দলকে একত্র হতে হবে। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসও থাকতে পারে।

এ বারের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি এবং সিপিএমের বঙ্গ ব্রিগেড খুব সুকৌশলে দলের সবাইকে একটি ব্য‌াপারে একমত করাতে পেরেছেন। সেটা হল এখন দেশের গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে্ প্রধান বিপদ বিজেপি। পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত দলের রাজনৈতিক লাইনে যদিও বলা হয়েছে কংগ্রেস ও বিজেপি দু’জনেই প্রধান শত্রু, কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের কথা ভুলে গেলেও চলবে। সমস্ত শক্তি সংহত করে এখন দেশ জুড়ে বিজেপির জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে পথে নামতে হবে। এবং রাজ্য‌ের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কী ভাবে বিজেপি-বিরোধী লড়াইকে সংহত করা যায় সেটি দলের রাজ্য‌ কমিটিগুলিই স্থির করবে। অর্থাৎ এ রাজ্য‌ে বিজেপি-বিরোধী আন্দোলনে কোন কোন গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতে হবে সেটা এ রাজ্য‌ের নেতৃত্ব স্থির করবে। অতএব আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে সিপিএম কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাবে কিনা সেটা যথাসময়ে রাজ্য‌ নেতৃত্ব স্থির করবে। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির বা পলিটব্য‌ুরোর আলাদা করে কিছু বলার থাকবে না। দলের এক রাজ্য‌ কমিটির নেতার কথায়, “রাজ্য‌ কমিটি যে প্রয়োজনে রণকৌশলগত সিদ্ধান্তে স্থান-কালের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ বদল আনতে পারে তা তো আগেই স্বীকৃত। ফলে এ নিয়ে নতুন করে আলোচনার কোনো অবকাশই নেই।”

কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলানোর এই কৌশল কেরলের নেতৃত্ব মেনে নিল কেন?

বক্তব্য রাখছেন সীতারাম ইয়েচুরি

এর পিছনে কয়েকটি কারণ আছে।

১) সামনে ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচন। তার আগে এমন কোনো বিধানসভা নির্বাচন নেই যেখানে সিপিএম বা কোনো বামদলের পাওয়ার কিছু আছে। ফলে এই মুহূর্তে প্রধান লক্ষ্য‌ হওয়া উচিত কী ভাবে কেন্দ্র থেকে বিজেপিকে সরানো যায় তার চেষ্টা করা। সেই লক্ষ্য‌ে পৌঁছতে গেলে কংগ্রেস-সহ সমস্ত বিরোধী দলকে একত্র হতে হবে। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসও থাকতে পারে।

২) পশ্চিমবঙ্গ-সহ বেশ কয়েকটি রাজ্য‌ে সংখ্য‌ালঘু সম্প্রদায়ের কাছে কেন্দ্রে বিজেপির বিকল্প বলতে কংগ্রেস। কংগ্রেস ক্ষমতায় আসতে পারে এমন একটা বিশ্বাসযোগ্য‌ প্রচারের জায়গা তৈরি হয়ে গেলে তাদের সঙ্গে থাকা আঞ্চলিক শক্তি ও বামেদের ভোটও বাড়বে।

৩) ত্রিপুরায় এখন কংগ্রেসকে ভাঙিয়ে প্রধান বিরোধী হয়ে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেস। আগামী দিনে তারা ত্রিপুরায় ক্ষমতায় আসতে বিজেপির সাহায্য‌ নিতে পারে বা বিজেপি যদি ক্ষমতায় আসার মতো জায়গায় যায় তা হলে তাদের দিকে সাহায্য‌ের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। সুতরাং ত্রিপুরার প্রশ্নেও বিজেপিই সব চেয়ে বড়ো আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৪) কেরলেও হুহু করে আরএসএসের শক্তি বাড়ছে। ধারে কাছে বিধানসভা নির্বাচন নেই। অতএব সেখানেও কংগ্রেস ভেঙে যাতে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি না হয় সে দিকে নজর রাখতে হবে।

এই ক’টি কারণে স্থির হয়েছে আগামী দিনে দেশ জুড়ে কেন্দ্র-বিরোধী নির্দিষ্ট কর্মসূচিগুলিতে কংগ্রেস-সহ অন্য‌ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির কাছেও যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। সব ব্য‌াপারে কংগ্রেসকে অচ্ছুত করে রাখার লাইনের যে জন্য‌ কিছু জরুরি পরিবর্তন দরকার।

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন বামেদের কাছে অ্য‌াসিড টেস্ট। তৃণমূল যে অধিকাংশ পঞ্চায়েত দখল করবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্ত প্রশ্ন হল দ্বিতীয় স্থানটি কার দখলে থাকবে? যে হেতু লড়াইটা বিজেপিকে বেঁধে রাখার, তাই প্রতি দিনের লড়াইয়ে মে মাস থেকেই বামেদের প্রধান শত্রু হতে চলেছে তারাই।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here