শ্রয়ণ সেন

“আমাদের জীবনটা একটু অন্য রকম। একটা বাঁধাধরা গণ্ডির মধ্যে দিয়ে চলে। সেই গণ্ডির বাইরে যখন বেরোতে পারি, তখন মনে হয় এক ঝলক সুন্দর বাতাস আমাদের জীবনে এল। আজ তেমনই একটা সন্ধ্যা।”

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেললেন কৃষ্ণা দেবনাথ। পেশায় তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি। তাঁর এবং আরও বিশিষ্ট অতিথির উপস্থিতিতে সকল সাহিত্যপ্রেমীর কাছেই সুন্দর একটা বাতাস যেন খেলে গেল শনিবার সন্ধ্যায়। আর কী কাকতালীয় ব্যাপার! এই সুন্দর বাতাসটা যখন বয়ে এল, ঠিক তখনই তীব্র দহন কাটিয়ে স্বস্তির বৃষ্টি ঝেঁপে শুরু হয়েছে কলকাতা জুড়ে।

শনিবার সন্ধ্যায় শ্যামবাজারে সেরাম অডিটোরিয়ামে আয়োজিত হয়েছিল সাহিত্যপত্রিকা ‘বনপলাশি’র প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান। পুস্তক প্রকাশ, সাহিত্য সম্মাননা প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সব মিলিয়ে এক মনোজ্ঞ সন্ধ্যা উপভোগ করলাম আমরা সবাই।

মাত্র এক বছর হল পথ চলা শুরু করেছে বনপলাশি। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলার সাহিত্য জগতে একটা জায়গা করে নিয়েছে তারা। ফলে তাদের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে যে চাঁদের হাট বসবেই, তা বলাই বাহুল্য। এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এক একজন মহীরুহ।

প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা।

১৯৯৫ সালে সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার এবং ২০০৫ সালে বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাহিত্যিক তথা শিক্ষক সাধন চট্টোপাধ্যায় এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট নাট্যকার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় আরও এক বিশিষ্ট নাট্যকার সুদীপ সিংহ, শিক্ষক এবং চিত্রকর সুশান্তকুমার রায়। সবাই বনপলাশি পরিবারেরই সদস্য। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি একাধারে সাহিত্যিক তথা ‘বনপলাশি’ পরিবারের একনিষ্ঠ অভিভাবক।

এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়েই বিশেষ সম্মাননা জানানো হয় সাহিত্যিক সাধন চট্টোপাধ্যায়কে। ‘বনপলাশি’ পত্রিকার পক্ষ থেকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় সাহিত্যিক শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে উৎসর্গীকৃত শচীন্দ্রনাথ সাহিত্য অর্ঘ্য ২০২২। এই পুরস্কার যিনি তুলে দেন, তিনি শচীন্দ্রনাথবাবুর ছেলে, সাহিত্যিক শুভেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

শচীন্দ্রনাথ সাহিত্য অর্ঘ্য ২০২২ তুলে দেওয়া হচ্ছে সাধন চট্টোপাধ্যায়ের হাতে।

‘বনপলাশি’র সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যাঁরা জড়িত, তাঁরা কখনোই এটাকে শুধুমাত্র পত্রিকা হিসেবে দেখতে রাজি নন। তাঁদের মতে, এটা একটা পরিবার, যেখানে তিনটে প্রজন্ম এক সঙ্গে হাতে হাত ধরে এগিয়ে যায়। ঠিক সেই কথাটাই ফুটে ওঠে এই পত্রিকার উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য সুশান্ত রায় কর্মকারের কথায়। তিনি বলেন, “বনপলাশি একটি সাহিত্য পরিবার, যেখানে তিনটে প্রজন্ম হাতে হাত ধরে চলার চেষ্টা করছি। আমরা জানি আমরা সফল হবই”।

বক্তৃতা করছেন সুশান্ত রায় কর্মকার।

এই অনুষ্ঠানেই উন্মোচিত হল ‘বনপলাশি’র ত্রৈমাসিক পত্রিকার ‘এপ্রিল-জুন ২০২২’ তথা ‘বৈশাখ-আষাঢ় ১৪২৯’ সংখ্যাটি। পত্রিকা উন্মোচনের মুহূর্তে এসে গিয়েছেন বনপলাশি পরিবারেরই আরও এক সদস্য সংগীতশিল্পী সুতপা ভট্টাচার্য। তাঁর সঙ্গেই ছিলেন কৃষ্ণা দেবনাথ এবং তাঁর কৃষ্ণাদেবীর স্বামী বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী স্বপন দত্ত। তাঁদের উপস্থিতিতেই এই পত্রিকার মোড়ক উন্মোচিত হয়।

‘বনপলাশি’র ত্রৈমাসিক পত্রিকার মোড়ক উন্মোচন।

সুশান্ত রায় কর্মকারের কথার সূত্র ধরেই বলতে হয় এই পত্রিকায় তিন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চাই স্থান পেয়েছে। সংবৃতা রায় কর্মকারের সম্পাদনায় শিশুদের জন্য একটি বিভাগ রয়েছে এখানে, ‘ছোটোদের অমলতাস।’ খুদেদের লেখা গল্প, কবিতা, কমিক্স, নান্দনিক চিত্রকথা ফুটে উঠেছে এখানে। পাশাপাশি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়েছে নারায়ণ দেবনাথকেও।

এ ছাড়া আরও নানান বিষয় ফুটে উঠেছে এ বারের পত্রিকায়। তবে সব থেকে আকর্ষণীয় বিষয়টি হল ‘রাঙা হাসি রাশি রাশি।’ এই বিভাগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরশুরাম তথা রাজশেখর বসু, সুকুমার রায়, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, বনফুল তথা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী, বিধায়ক ভট্টাচার্য, আশাপূর্ণা দেবী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নবনীতা দেবসেন এবং সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা এক একটি ছোটো গল্প এই বিভাগে স্থান পেয়েছে। এই পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্বে রয়েছেন ভার্গবী বসু।

বীথি করের বই, ‘পশ্চিমে উড়ে যায় যত খোলা চিঠি’র মোড়ক উন্মোচন।

‘বনপলাশি’র নতুন এই পত্রিকা ছাড়াও উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ বসু এবং বীথি করের বইয়ের মোড়ক উন্মোচনও এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়েই হয়। তার পরেই ছিল সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। ছোটোদের একটি শ্রুতিনাটকের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দফা। এই শ্রুতিনাটকে অভিনয় করে দুই খুদে অনমিত্র বসু এবং সন্মিত্র রায় কর্মকার।

সংগীতশিল্পী সুতপা ভট্টাচার্যের কণ্ঠে অসাধারণ কয়েকটা গান এবং সরোদবাদক ভবানীশংকর দাশগুপ্তের হাতের জাদুতে মোহিত হয়ে যান অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। গোটা অনুষ্ঠানটির সুন্দর ভাবে সঞ্চালনা করেন পোখরাজ চক্রবর্তী।

সুতপা ভট্টাচার্যের গান।

সব মিলিয়ে অসাধারণ সুন্দর একটা অনুষ্ঠান উপহার দিল বনপলাশি।

আরও পড়তে পারেন

একটি উত্তরণ: এক অজানা প্রণম্য কাহিনি

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন