jalpaiguri laxmi puja
আখ নিয়ে বসেছেন এমনই এক ব্যবসায়ী। নিজস্ব চিত্র।

রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়, জলপাইগুড়ি: ওঁরা সারা বছর ব্যবসা করেন না। ওঁরা কেবল দু’দিনের ব্যবসায়ী। সকলেই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে এসেছেন। কেউ স্বামী-স্ত্রী, কেউ গৃহবধু, কেউ অসুস্থ, কেউ অন্য কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত, আবার কেউ বেকার। কিন্তু লক্ষ্মীপুজো এবং অন্যান্য পুজোর সময় তাঁরা এক বা দু’দিনের জন্য সব কিছু ছেড়ে পুজোর সামগ্রী নিয়ে বিক্রির জন্য বসে পড়েন। উদ্দেশ্য অতিরিক্ত উপার্জন। এই দু’দিনের আয় উৎসবের মরশুমে তাঁদের পক্ষে অনেক।

দিনবাজার সেতুর ওপর রাস্তার দু’পাশে লক্ষ্মীপুজোর আগে যে অস্থায়ী বাজার বসেছে সেখানে স্ত্রী পিঙ্কি এবং মেয়ে সংগীতাকে নিয়ে আখ বিক্রি করছেন নীলতরন সরকার। পেশায় ক্ষুদ্র চাষি নীলরতনের বাড়ি দোমহনির মরিচবাড়িতে। ৫০০ আখ ছাড়াও বাড়ির ধানখেত থেকে নিয়ে এসেছেন ১৫ আঁটি ধানের শিষ। তিনি বলেন, “আমরা তিন জনে মিলেই আসি। যা রোজগার হয় তা-ই দিয়ে কিছু কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফিরি।” ওঁর স্ত্রী পিংকি সাত সকালে উঠে রান্না করে নিয়ে এসেছেন। দুপুরে কাজের ফাঁকে খেয়ে নেবেন।

জলপাইগুড়ির ইন্দিরা কলোনির গৃহবধু আহ্লাদি তেলিও আখবিক্রেতা। তাঁকে সহায়তা করছিলেন স্বামী গোবিন্দ তেলি। ওঁদের দুই ছেলে চেন্নাইতে মিষ্টির কারিগর। এক মেয়ে স্কুলে পড়ে। আহ্লাদি সারা বছরই বিভিন্ন পুজোর সময় দিনবাজার সেতুর ওর ফলের দোকান দেন। এ বার যেমন লক্ষ্মীপুজোর সময় আখের দোকান দিয়েছেন, তেমনই এর পর কালীপুজো, ছটপুজোর সময়ও দোকান দেবেন। আহ্লাদি বলেন, “বিভিন্ন পুজোয় মরশুমি ফলের দোকান দিয়ে যা একটু টাকার মুখ দেখতে পাই ওটাই আমাদের আনন্দ।” বছরের বাকি সময় আহ্লাদি গৃহবধু।

আরও পড়ুন সাঁতরাগাছির ঘটনায় আশঙ্কাজনক আরও ৩, উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন রেলের

জলপাইগুড়ির সুকান্তনগর কলোনির হরিবলা মণ্ডল দু’বছর আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর শরীরের বাঁ-দিকটায় সাড় কম। এক ছেলে গাড়ি চালায়। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। স্ত্রী আগমনী মণ্ডল বাড়ি বাড়ি কাজ করেন। কোনো রকমে সংসার চলে। তিনি কিছু কলা নিয়ে বসেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের মতো পরিবারে লক্ষ্মীপুজোয় কলা বিক্রি করে যা আয় হবে তা-ই দিয়েই লক্ষ্মীপুজো হবে।”

temporary business
মরশুমি বিক্রেতা। নিজস্ব চিত্র।

সুকান্তনগর কলোনির আর একজন গৃহবধু সাবিত্রী সরকার ছোটো ডাব, ধানের শিষ, পদ্মের কুঁড়ি, গাঁদাফুল, বেলপাতা, শোলার তৈরি কদম ফুল নিয়ে বসেছেন। তাঁর স্বামী তাপস সরকার টোটো চালান। তিনি বলেন, “লক্ষ্মীপুজোয় পুজোর সামগ্রী বিক্রি করা আমার নেশা। বাড়তি আয় হয়। ভালো লাগে।” ওঁর পাশে বসে বাতাবি লেবু বিক্রি করছিলেন গৌরীহাট এলাকার বাসিন্দা পেশায় কাঠমিস্ত্রি সুজয় সাহা। বাড়ির গাছে প্রতি বছর বাতাবি লেবু ফলে। এ দিন তিনি কাঠের কাজ ছেড়ে বাড়ির গাছ থেকে ২১০টা বাতাবি লেবু নিয়ে এসেছিলেন। প্রতিটি ১০ টাকা করে বিক্রি করছিলেন। তিনি বলেন, “এই দু’দিন কাঠের কাজ বন্ধ। বাতাবিলেবু বিক্রি করব।”

জলপাইগুড়ির রবীন্দ্র কলোনির বাসিন্দা পেশায় দিনমজুর সঞ্জিত দেবনাথ স্বল্প পুঁজি জোগাড় করে পুজোর সামগ্রী যেমন পঞ্চশষ্য, তিল, হরিতকী, ঘি, মধু, সিঁদুর, ছোটো ছোটো গামছা, লক্ষ্মীর পা, খড়িমাটি, ছোটো ছোটো ডাব নিয়ে বসেছিলেন। তিনি বলেন, “এই দু’দিন কাজে যাইনি। এগুলো বিক্রি করব। ইচ্ছে আছে ভবিষ্যতে এই সব জিনিসের বড়ো দোকান দেব।”

কাদোবাড়ির বাসিন্দা বিশ্বজিৎ আচার্য এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ে এখন বেকার। বাবা পুরোহিত। আগে কখনও ব্যবসা করেননি। জলপাইগুড়ির ষ্টেশন বাজারে এ বারই প্রথম বেলপাতা, আমের পল্লব, ধানের শিষ, কয়েকটা নারকেল নিয়ে বসেছিলেন। এগুলো কিনতে তার কোনো মূলধন লাগেনি। গাছ থেকে যেমন পেরেছেন পেড়ে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, “এই প্রথম লক্ষ্মীপুজোর উপকরণ নিয়ে ব্যবসা করতে বসেছি। দেখি কেমন লাভ হয়। লাভ হলে পরের বার আরও বেশি উপকরণ নিয়ে আসব।”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here