তিতাস পাল, জলপাইগুড়ি : ভুয়ো চিকিৎসক কাণ্ডে এ বার উত্তরবঙ্গের তিনটি জেলার স্বাস্থ্য দফতরে হানা দিল সিআইডি। বুধবার জলপাইগুড়ির জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন ভবনে আসে চার সদস্যের সিআইডির তদন্তকারী দল। তদন্তকারীরা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন নথি খতিয়ে দেখেন। কথা বলেন মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জগন্নাথ সরকারের সঙ্গে। স্বাস্থ্য দফতরের অ্যাকাউন্টস অফিসার, রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের সদস্য জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিককেও এক প্রস্থ জিজ্ঞাসাবাদ করেন। চিকিৎসক নিয়োগ সংক্রান্ত বহু নথি বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যান তাঁরা।

মঙ্গলবার আলিপুরদুয়ার জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক পূরণ শর্মাও সিআইডির দীর্ঘ জেরার মুখে পড়েছিলেন।

গত ৩ মে উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া থেকে প্রথম গ্রেফতার হন কাইজার আলম নামে এক ভুয়ো চিকিৎসক। তিনি জেলার একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছিলেন। পর দিন সিআইডির জালে পড়েন খুশিনাথ হালদার নামে আরও এক জাল চিকিৎসক। তিনি আলিপুরদুয়ার জেলার মধ্য রাঙালিবাজনা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের জেরা করে উঠে আসে আরও এক ভুয়ো চিকিৎসক স্নেহাশিস চক্রবর্তীর নাম।

ভুয়ো চিকিৎসক স্নেহাশিস চক্রবর্তী।

জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা ব্লকের ধূমপাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চুক্তিভিত্তিক মেডিক্যাল অফিসার পদের দায়িত্বে ছিলেন স্নেহাশিস চক্রবর্তী। ১০ মে তাঁকেও গ্রেফতার করা হয়। এর পর দক্ষিণবঙ্গে ও উত্তরবঙ্গে একের পর এক ভুয়ো ডিগ্রিধারী চিকিৎসক ধরা পড়েছেন পুলিশ বা সিআইডির হাতে। কিন্তু প্রথমে যে তিন চিকিৎসক উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং উত্তর দিনাজপুর থেকে ধরা পড়েন, তাঁরাই মূল মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান সিআইডির। কারণ এই তিন জনই সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। ভুয়ো ডিগ্রি নিয়ে চেম্বার খুলে রোগী দেখা এক রকম। কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ভুয়ো চিকিৎসকের উপস্থিতি অনেক বেশি আতংকের। বেশ কিছু দিন ধরেই রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের কাছে এই ভুয়ো চিকিৎসক নিয়ে অভিযোগ আসছিল। যেখানে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজার উদ্যোগ নিয়েছেন, সেই আবহে জাল চিকিৎসকদের উপস্থিতি তাঁর সু-পরিকল্পনাতে জল ঢেলে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর সিআইডিকে ভার দেয় এর কিনারা করার। তার পরেই একের পর এক জাল চিকিৎসক চক্রের জারিজুরি ফাঁস হতে থাকে। গ্রেফতার হন একের পর এক চিকিৎসক। কিন্তু তদন্ত হাতে নিয়ে সিআইডি বুঝতে পারে এই চক্রের জাল বহু দূর বিস্তৃত। তা না হলে এত দিন ধরে ভুয়ো ডিগ্রিধারী চিকিৎসকরা বহাল তবিয়তে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যুক্ত থাকতে পারতেন না।

তদন্ত চলছে সিআইডি-র।

কিন্তু কী ভাবে জাল ডিগ্রিধারী হয়েও এঁরা সরকারি হাসপাতালে চাকরি পেলেন তা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই জেলার স্বাস্থ্য দফতরগুলিতে হানা তদন্তকারীদের।

ইতিমধ্যে সূত্রের খবর অনুযায়ী জানা গিয়েছে, আলিপুরদুয়ার থেকে ধৃত খুশিনাথ হালদার এক সময় জলপাইগুড়ির বেলাকোবা হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। সেই সময় তাঁর কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে জেলা স্বাস্থ্য দফতর। বিপদ বুঝে খুশিনাথ হালদার কাজে ইস্তফা দেন। তদন্তও বন্ধ হয়ে যায়। সব জানা সত্ত্বেও সেই তাঁকেই কেন ফের সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ করলেন আলিপুরদুয়ার জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক পূরণ শর্মা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও এই বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি। পূরণবাবুর বক্তব্য, সমস্ত তথ্য তদন্তকারী দলকে দেওয়া হয়েছে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে ফাঁক রয়েছে তার প্রমাণ ধৃত আর এক জাল চিকিৎসক স্নেহাশিস চক্রবর্তী। ভাগলপুর থেকে জোগাড় করা ভুয়ো রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং জাল এমবিবিএস সার্টিফিকেট দেখিয়ে জলপাইগুড়ির ধূমপাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজে যোগ দেন তিনি। তবে যে সময়ে তিনি নিয়োগ হয়েছিলেন, সেই সময়ের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক এখন অন্য জেলায় কর্মরত। বর্তমান মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জগ্ননাথ সরকার জানিয়েছেন, তদন্তকারী দলকে সমস্ত রকম তথ্য দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার উত্তর দিনাজপুরে যাচ্ছে তদন্তকারী দলটি। এই জেলার চোপড়া থেকেই প্রথম গ্রেফতার হয়েছিলেন ভুয়ো চিকিৎসক কাইজার আলম। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রকাশ মৃধার সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি নিয়োগ সংক্রান্ত সমস্ত নথি খতিয়ে দেখবে সিআইডির দলটি। তিন জেলার স্বাস্থ্য দফতর থেকে পাওয়া নথি নিয়ে এই জাল চিকিৎসক চক্রের শেকড় খোঁজার চেষ্টা করবেন তদন্তকারীরা। এই চক্রের ঝুলি থেকে কোন বেড়াল বের হয়, এখন তার দিকেই তাকিয়ে ভুক্তভোগী আমজনতা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here