ক্লিনিক বন্ধ করে চলে গিয়েছেন ধূপগুড়ির ‘এমবিবিএস ডাক্তারবাবু’

0
636

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ির প্রত্যন্ত এলাকা নয়ারহাট। সেখানে এক ডাকে ড. শুভজিৎ মল্লিককে চেনেন সবাই। প্রায় ছ’ বছর ধরে এখানেই রমরমা প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এমনিতেই গ্রামগঞ্জে চিকিৎসকের আকাল। তাই ‘এমবিবিএস’ ডিগ্রিধারী ডাক্তারবাবুর পসারও মন্দ হচ্ছিল না। ভিজিটও কম। চাহিদা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে নিজের একটি ক্লিনিকও খুলে ফেলেছিলেন ড. শুভজিৎ মল্লিক। সেখানে স্যালাইন, ইনজেকশন, জীবনদায়ী নানা রকম ওষুধ থাকত। ছিল একটি বেডের ব্যবস্থাও। সব ভালোই চলছিল। কিন্তু বাধ সাধল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের ভূয়ো ডাক্তারের গ্রেফতারির খবর।

বৃহস্পতিবার যে সব রোগী ক্লিনিকে আসেন, তাঁরা দেখতে পান ক্লিনিকের সামনে এমবিবিএস (এম.এ.) (ক্যাল) লেখা বোর্ডটি নেই। তাঁরা ডাক্তারবাবুকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি আমতা আমতা করতে থাকেন। সন্দেহ হওয়ায় তাঁকে চেপে ধরা হয়। তিনি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে নিজেই গুপ্ত খবর ফাঁস করে দেন। বলে ওঠেন, এমবিবিএস না হতে পারেন, তাতে কি চিকিৎসা খারাপ করেন? এখনও কি তাঁর হাতে কোনো রোগী মারা গিয়েছে? তাঁর ঠিক কী ধরনের ডিগ্রি রয়েছে তা-ও পরিষ্কার করে বলতে পারেননি। তাই ডাক্তারবাবুর উত্তরে রোগীদের মন ভেজেনি। সংবাদমাধ্যমে ভুয়ো চিকিৎসকের খবর দেখে সকলেই পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কিন্তু তাঁরা নিজেরাই যে এত দিন ধরে এক জন ‘প্রতারকের’ খপ্পরে পড়ে আছেন, তা ভাবতে পারেননি। কিন্তু খুব বেশি কিছু বলতেও পারেনি তাঁরা। কারণ অনেকে ফিসফাস করছিলেন, স্থানীয় হোমরাচোমরাদের সঙ্গে দহরম-মহরম রয়েছে ডাক্তারবাবুর। সব কিছু জানা সত্ত্বেও তাদের ‘আশীর্বাদেই’ ডাক্তারবাবুর এত রমরমা। তাই অনেকে অসুখ না দেখিয়েই চুপচাপ ফিরে যান। তবে একদম চুপ করে থাকতে পারেননি ঠকে যাওয়া অনেকেই। রমেন ব্যাপারী নামে একজন স্বাস্থ্য দফতরে ব্যাপারটা জানিয়ে দেন।

এদিকে স্বাস্থ্য দফতরে মঙ্গলবার আরও দু’জন সন্দেহ প্রকাশ একই অভিযোগ জানিয়েছিলেন। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জগন্নাথ সরকার শুক্রবার জানান, সূত্র মারফত তাঁরা আগেই খবর পেয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। শুভজিৎ মল্লিকের চিকিৎসক হওয়ার কোনো নথিই পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর ক্লিনিকেরও কোনো বৈধ ছাড়পত্র নেই। জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ সুপারকে ঘটনার বিষয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য দফতরের তরফে। যদিও ধরা পড়ার আগেই তিনি হাওয়া।

ঝাঁপ বন্ধ ‘জয়গুরু ক্লিনিক’-এর।

শুক্রবার নয়ারহাটে গিয়ে দেখা গেল, ‘জয়গুরু ক্লিনিক’-এর ঝাঁপ বন্ধ। খোঁজ মেলেনি ‘ডাক্তারবাবুরও’। নাম প্রকাশে নারাজ স্থানীয় একজন জানালেন, বিপদ কাটাতে মা বিপত্তারিণীর পুজো দিতে বর্ধমানে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন ডাক্তারবাবু। তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল বছর ছয়েক আগে বর্ধমান ছেড়ে এখানে এসেছিলেন শুভজিৎ মল্লিক। তারপর হঠাৎ করেই একদিন এমবিবিএস বোর্ড ঝুলিয়ে ডাক্তারি শুরু করে দেন। বাইরে থেকে ওষুধ কিনে এনে তা রোগীদের বিক্রি করতেন। সেই রকম একজন ওষুধের ডিস্ট্রিবিউটার জানালেন, ক্লিনিকের নামে একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে ওষুধ নিতেন তিনি। তবে সেই রেজিস্ট্রেশন নম্বর যে ভুয়ো তা তাঁরা বুঝতে পারেননি।

এদিকে সংবাদমাধ্যমের লোক দেখে দু-একজন স্থানীয় ‘দাদা’ গোছের মানুষ এগিয়ে এসে অভিযোগ করলেন, আপনাদের ভয়ে ডাক্তারবাবু চলে গেলেন। এবার গ্রামে মানুষদের চিকিৎসা কে করবেন?

চিকিৎসার নামে এই ভাবে প্রতারণা করা যায় কি না, এ কথা জিজ্ঞেস করতেই সেই ‘দাদারা’ কিন্তু আর কিছু না বলেই চলে গেলেন। অনেকের ফিসফাস শোনা গেল, এঁদের দৌলতেই নাকি ডাক্তারবাবু এতদিন বহাল তবিয়তে ছিলেন।

তবে এই ঘটনা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জেলা স্বাস্থ্য দফতরের। কারণ এর আগে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ভুয়ো চিকিৎসক স্নেহাশিস চক্রবর্তী গ্রেফতার হয়েছিলেন। সেই ঘটনার তদন্ত করতে দিন কয়েক আগে সিআইডির একটি দল মুখ্যস্বাস্থ্য আধিকারিককে জিজ্ঞাসাবাদ করে গিয়েছেন। ফের শুভজিৎ মল্লিকের ঘটনা কত দূর গড়ায় সেটাই এখন দেখারয়। কারণ এই ঘটনা বলে দিচ্ছে যে জলপাইগুড়ির গ্রামেগঞ্জে এই ধরনের ‘প্রতারক’ চিকিৎসক আরও রয়েছেন। বেশ কিছু অভিযোগও আসছে। তাঁদের চিহ্নিত করে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা নিয়ে ভাবতে গিয়ে রাতের ঘুম উড়েছে জেলার স্বাস্থ্য দফতরের কর্তাদের। উদ্বিগ্ন জেলা প্রশাসনও। জেলাশাসক রচনা ভগত শুক্রবার জানিয়েছেন, চিকিৎসক এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে দু’টি বিশেষ টিম তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা গ্রামেগঞ্জে ঘুরে প্র্যাকটিস করা চিকিৎসকদের সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করে জেলা প্রশাসনকে জানাবেন। তার ওপর ভিত্তি করে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই পদক্ষেপে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই ‘ঘুণ’ কবে দূর হবে তার দিকেই তাকিয়ে ঠকে-চলা সাধারণ মানুষ।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here