উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুন্দরবন: সারা বিশ্বে যখন কন্যশ্রী প্রকল্প সমাদৃত এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের ডানায় ভর দিয়ে স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে কয়েক লক্ষ ছাত্রীর, তখন সেখানেই থাবা বসাল দুর্নীতি।

যে কন্যাশ্রী প্রকল্প বিশ্বের দরবারে খ্যাতি অর্জন করেছে, সেই কন্যাশ্রী প্রকল্পে কালিমালিপ্ত হল এবং সেই নিয়ে বড়োসড়ো দুর্নীতির ঘটনা সামনে আসায় চাঞ্চল্য ছড়াল এলাকায়। যেখানে সরকারি বিধি অনুযায়ী, ছাত্রীরাই কন্যাশ্রীর টাকা হাতে পান, সেখানে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার প্রত্যন্ত সুন্দরবনের ঝড়খালি এলাকার দেখা গেল আদ্যন্ত বিপরীত ঘটনা।

অভিযোগ, এলাকার বহু বিবাহিতা  মহিলা, যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ স্কুলের চৌহদ্দিতেই পা রাখেননি, তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই ঢুকে পড়েছে কন্যাশ্রীর জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা। তবে সেই টাকার সামান্যতম অংশ তাঁরা হাতে পেয়েছেন। কারণ, কাউকে দু’হাজার বা কাউকে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছে নারান মণ্ডল নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। বিষয়টি জানাজানি হতেই গা ঢাকা দিয়েছেন ঝড়খালি হেড়োভাঙা বিদ্যাসাগর বিদ্যামন্দিরের অশিক্ষক কর্মচারী নারান। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে অভিযোগ জমা পড়েছে। আর সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।

জানা যায়, ঝড়খালি ৪ নম্বর মাস্টারপাড়ার বহু মহিলা, যাঁদের বয়স ৩০ থেকে শুরু করে ৬০ বছর, তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাক্যাউন্টেই কন্যাশ্রী প্রকল্পের ২৫ হাজার করে টাকা ঢুকে পড়ে কিছুদিন আগে। ভুতুড়ে কাণ্ড ভেবে অবাক হলেও পরে জানা যায়, প্রকল্পের টাকা হাতানোর জন্য কিছু অসাধু ব্যক্তি এমন কাজ করেছেন।

এই গ্রামেরই বাসিন্দা পেশায় অশিক্ষক কর্মচারী নারান কয়েকমাস আগে গ্রামের প্রতিবেশী মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর চেয়ে নেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে কিছু কিছু করে টাকা ঢুকবে। সেই টাকা সকলে তুলে তাঁকে দিলে তার বিনিময়ে প্রত্যেককে কিছু করে টাকা দেবেন বলে জানান নারান। কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় সকলের অ্যাকাউন্টেই ২৫ হাজার করে টাকা ঢোকে রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী প্রকল্পের। শর্ত মতো সকলেই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নারানের হাতে তুলে দেন। পরিবর্তে নারানও তাঁর কথা মতো কাউকে দু’হাজার, কাউকে আড়াই হাজার দিয়ে বাকিটা আত্মসাৎ করে নেন।

kanyashree

কিন্তু গ্রামের এক মহিলা জয়া ঘোষ ও তাঁর স্বামী বনমালী ঘোষ এই টাকা দিতে অস্বীকার করলে ঝামেলা বাঁধে নারানের সঙ্গে।  বনমালিবাবু বলেন, লোকজন নিয়ে বাড়িতে চড়াও হয়ে প্রাণনাশ ও বাড়িঘর লুটপাটের হুমকিও দেয় অভিযুক্ত নারান। এমনকী স্থানীয় ক্লাবের ছেলেদের নিয়ে এসে টাকা অনাদায়ে তার বাড়ি লিখিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ। এর পর এই দুর্নীতি ফাঁসের জন্য উঠে পড়ে লাগেন বনমালীবাবু। গ্রামের সেইসব মহিলাদের সঙ্গে নিয়েই নারানের দুর্নীতি ফাঁসের জন্য সরকারের বিভিন্ন দফতরে চিঠি পাঠানো শুরু করেন তিনি। এমনকী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরেও অভিযোগ জানান মিলিত ভাবে। স্থানীয় সূত্রে খবর, এই ঘটনায় শুধু নারান মণ্ডল নন আরও বেশ কয়েকজন জড়িত রয়েছেন।

প্রাথমিক ভাবে ১০ জন মহিলার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করার কথা জানা গেলেও এই সংখ্যা অন্তত চল্লিশ হবে বলে শোনা গেছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন। স্থানীয় সূত্রে খবর, কন্যাশ্রীর টাকা তছরুপের বিষয়টি সামনে আসতেই গা ঢাকা দিয়েছেন মূল অভিযুক্ত।

এ ব্যাপারে ঝড়খালি হেড়োভাঙা বিদ্যাসাগর বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক শংকরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেন, “নারান আমাদের স্কুলের কর্মী বটে, তবে টাকাটা রানাঘাট কলেজের”।

আরও পড়ুন: ইন্দিরা গান্ধীর ৩৪তম মৃত্যু বার্ষিকী, কিছু অজানা কথা, অদেখা ছবি

ফলে কলেজের প্রসঙ্গ চলে আসায় ঘটনাটি নিয়ে জটিলতা আরও বাড়ল বলেই মনে করা হচ্ছে। জানা গিয়েছে, ঝড়খালি কোস্টাল থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। পাশাপাশি বাসন্তীর বিডিও কল্লোল বিশ্বাস ঘটনার তদন্ত করছেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here