West bengal violence
প্রতীকী ছবি

ওয়েবডেস্ক: ভারতে সম্ভবত এই প্রথম কোনও রাজ্যে ৩২৪ ধারা প্রয়োগ করল নির্বাচন কমিশন। সেই প্রসঙ্গ টেনেই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে ৩৫৬ ধারার কথা!

বঙ্গে ভোট মানেই রাজনৈতিক হিংসা। লোকসভা ভোটের গায়ে গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসবের মতো জমকালো যত পোশাকই চড়ানো হোক না কেন, এটাই যেন অলিখিত পরম্পরা। একই সঙ্গে ভোটের আগে অথবা পরের রাজনৈতিক হানাহানির প্রেক্ষিতেই বারবার ঘুরেফিরে আসে রাষ্ট্রপতি শাসনের কথাও। ২০১৯ লোকসভা ভোটে ‘গণতন্ত্র হরণ’-এর অভিযোগে ইতিউতি সেই ৩৫৬ ধারার কথাই উড়ে বেড়াচ্ছে। তা হলে কি ফের বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হচ্ছে?

৩২৪ ধারার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগের দাবি মাসখানেক আগেই তুলেছেন বিজেপির প্রবীণ নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। তিনি জানিয়েছিলেন, “হিংসাত্মক ঘটনার রোধে রাজ্যের পুলিশ যদি তাদের কাজ সঠিকভাবে না করে তবে সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হওয়া উচিত”।

একই ভাবে এ বারের লোকসভা নির্বাচনের ছ’দফা ভোটে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত অশান্তি, খুনের ঘটনাকে সামনে রেখে বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের কথায় পুনরায় উঠে আসছে রাষ্ট্রপতি শাসনের প্রসঙ্গ। যদিও সরকারি ভাবে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানা যায়নি। কিন্তু গত মঙ্গলবার কলকাতায় বিজেপি সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহের রোড শো-কে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পর যে ভাবে সপ্তম দফার নির্বাচনী প্রচারের দিন কমানো হয়েছে, একই সঙ্গে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবকে অপসারণ করা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই রাষ্ট্রপতি শাসন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবকে অপসারণের ঘটনায় বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, “নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া উচিত ছিল। আগের দফাগুলিতে যে ভাবে ভোট লুঠ হয়েছে, তা আটকানো যেত। অন্য দিকে বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ, বাবুল সুপ্রিয়, ভারতী ঘোষদের এ ভাবে শারীরিক হেনস্থার শিকার হতে হতো না”।

একই সঙ্গে সায়ন্তন বলেন, “রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা যে একেবারে ভেঙে পড়েছে, তা স্বরাষ্ট্র সচিবের অপসারণেই স্পষ্ট। আগামী ২৩ মে ফলাফল ঘোষণার পরই এই সরকারের পতন শুরু হয়ে যাবে, মিলিয়ে নেবেন”।

এখান থেকেই প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে, তা হলে কি দ্বিতীয় বারের জন্য কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার ফিরলে রাজ্যের প্রতি কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে কেন্দ্র? তা হলে কি কেন্দ্রীয় সরকার আইন-শৃঙ্খলার অবনতির কারণ দেখিয়ে রাজ্য সরকারের হাত থেকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিজের হাতে তুলে নিতে পারে?

এমন প্রশ্নের জবাব বসিরহাটের বিজেপি প্রার্থী সায়ন্তন বলেন, “এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখন নয়”।

অন্য দিকে কলকাতা হাইকোর্টের এক বিশিষ্ট আইনজীবী এ প্রসঙ্গে বলেন, “রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলারক্ষার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের হাতে। কিন্তু ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার কারণে রাজ্যপালের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে বা প্রশাসক নিয়োগ করা হবে, এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও অনেকটা গুরুত্ব রাখে। অতীতে এই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে একাধিক। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কী হবে, সে ব্যাপারে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়”।

প্রসঙ্গত, ভারতীয় সংবিধানের ৩৫৬ ধারা বা রাষ্ট্রপতি শাসনের অর্থ হল কোনও নির্দিষ্ট রাজ্য সরকার সাংবিধানিক শর্ত অনুসারে রাজ্য শাসনে অসমর্থ হলে সেই সরকারকে বরখাস্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যের শাসনভার প্রত্যক্ষভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দেওয়া। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

কিন্তু এ ব্যাপারে বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের বক্তব্য বেশ ইঙ্গিতবাহী বলেই ধারণা করছে ওয়াকিবহাল মহল। রাজ্যে ৩২৪ ধারা প্রয়োগ করে নির্বাচনী প্রচারের মেয়াদ কমানো এবং স্বরাষ্ট্র সচিব অত্রি ভট্টাচার্যের অপসারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার রয়েছে, তাই সচিবকে সরানো হল। তবে এই দফতরের মন্ত্রীকে সরানো হলে নির্বাচন আরও ভালো হতো। এখানে সরকার বলে কিছু নেই। প্রশাসন বলে কিছু নেই। কাশ্মীরের থেকেও ভয়ানক অবস্থা। এই সরকার থাকলে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট সম্ভব নয়। যেটা হয়েছে ভালোই হয়েছে”।

বাংলায় এর আগে পাঁচবার রাষ্ট্রপতি শাসনের জারি হয়েছে। ১৯৬২ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর, ১৯৬৮ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার মুখ থুবড়ে পড়ার পর, ১৯৭০ সালে অজয় মুখোপাধ্যায়ের ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকারের পতনের পর, ১৯৭১ এবং ১৯৭৭ সালে নির্বাচনের আগে মিলিয়ে মোট পাঁচ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল বাংলায়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দিলীপবাবু “সরকার নেই, প্রশাসন নেই” মন্তব্যের জের কত দূর গড়ায়, এখন সেটাই দেখার!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here