নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: শুরু হয়ে গেল ৪১তম  কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। চলবে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। অবশ্য মেলা তেমন জমে ওঠেনি, বেশির ভাগ দোকান এখনও স্টল তৈরিতেই ব্যস্ত। প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল মাঠ পেয়েছেন ২২ তারিখ, তাই গুছিয়ে উঠতে দেরি হয়ে গেল।

দেশ জুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে বইমেলা হয় মূলত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে। আর ২০১৬র নভেম্বর মানেই ডিমনিটাইজেশনের মাস। তাই এবছরের বইমেলাও অনেকটাই আলাদা। কলকাতা বইমেলার প্রথম সাংবাদিক বৈঠকেই বুক সেলার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স গিল্ডকে বেশ দিশাহীন মনে হয়েছিল। বেশ কিছু বড়ো প্রকাশন সংস্থার স্টলে গিয়ে বোঝা গেল, কলকাতার বইমেলার বাজার নিয়ে দ্বন্দ্বে আছেন কম বেশি সবাই।

সাহিত্য অ্যাকাডেমির স্টলে কোনো সোয়াইপ মেশিন নেই। দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে আবেদন করেও মেশিন পাননি, জানালেন আরুণি চক্রবর্তী। বললেন, নভেম্বর থেকে বই বিক্রির সংখ্যা কমে প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। কয়েকদিন আগেই বেহালা বইমেলায় স্টল তৈরির খরচটুকুও ওঠেনি তাঁদের। মিত্র ও ঘোষের পক্ষ থেকে শ্রীমতী ইন্দ্রাণী রায় জানালেন তাদের স্টলে থাকছে পেটিএম এবং সোয়াইপ মেশিনের ব্যবস্থা। বিমুদ্রাকরণের সাময়িক ধাক্কা একটু একটু করে কাটিয়ে উঠছে বই বাজার, এমনটাই জানালেন ইন্দ্রাণী দেবী। বললেন, “প্রকাশকদের সহায়তা করার ব্যাপারে, যথাযথ পরিকাঠামো তৈরিতে গিল্ডের চূড়ান্ত ব্যর্থতাই সামনে আসছে বারবার”। 

আনন্দ, পত্রভারতীর মতো বেশ কিছু নামী স্টলে শুরুর দিনেই যথেষ্ট ভিড়। তাই আগামী কয়েকদিনের বই এর বিক্রি নিয়ে তারা বেশ আশাবাদীও। তার ওপর সম্প্রতি এটিএম থেকে টাকা তোলার দৈনিক ঊর্ধ্বসীমা বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন বই বিক্রেতারা। 

রুপালি, সুপ্রকাশনি, সোপানের মতো মাঝারি এবং ছোট প্রকাশনী সংস্থার অবস্থাটা খুবই খারাপ। বেশির ভাগেরই কার্ড গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব। নভেম্বরের পর থেকে কলেজ স্ট্রিটের বেশ কিছু দোকান নাকি তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন, জানা গেল কথা বলে। বইমেলাতেও অংশ গ্রহণ করতে পারেনি বেশ কয়েকটি প্রকাশন সংস্থা। এক বছর অংশগ্রহণ না করলে আগামী বছর অনুমতি পেতে সমস্যা হতে পারে, শুধু এই কারণেই মেলায় স্টল দিতে হয়েছে বেশ কিছু সংস্থাকে। কলকাতার বাইরে রাজ্যের বাকি জেলার বইমেলাগুলোতে ঘুরে এসে তাদের অভিজ্ঞতা ভাল নয়। অন্য বছরের তুলনায় ব্যবসা কমেছে ৩০-৪০%। তাই কলকাতা বইমেলাতেও লাভজনক ব্যবসা হবে, এমন আশা তাঁরা করছেন না।

ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের ব্যবসার যে ছবি দিলেন শান্তনু ভট্টাচার্য, তা বাকিদের থেকে পুরোটাই আলাদা। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সংস্থা্র স্টলে নেই কোনও পয়েন্ট অব সেল মেশিন। তাতে একটুও চিন্তিত নন শান্তনুবাবুরা। জানালেন, নোট বাতিলের নাকি কোনো প্রভাবই পড়েনি বই বাজারে। এমনকি বিক্রিও নাকি গতবছরের তুলনায় বেড়েছে অনেকটাই। বই ছাপানো কতটা কমেছে জিগ্যেস করতে জানা গেল, সেই সংখ্যাটাও নাকি বেড়েছে এবছর। দেশের বাকি প্রকাশকরা যখন নভেম্বরের পর থেকে কম বেশি ক্ষতির মুখ দেখে চলেছেন, সেখানে ন্যাশানাল বুক ট্রাস্টের ব্যবসা বেড়ে যাওয়াটা রহস্যই রয়ে গেল।

আনন্দ-র স্টলে দেখা হয়ে গেল সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদারের সঙ্গে। নোট বাতিলের প্রসঙ্গ বদলে এবার একটু অন্য আলোচনা। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার চল কমেছে, মানতে রাজি নন তিনি। বললেন, কলকাতার বাইরে মফস্‌সলে এখনও নিয়মিত লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়ার চাহিদা আছে। যদিও বিনোদনের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে বইকে আর বেছে নেয় না নতুন প্রজন্ম। তবে বই থেকে মুখ ফিরিয়ে মানব সভ্যতা চলতে পারে না, খুব জোর দিয়ে বললেন লেখক। এই জোরটুকু থাক। বিশ্বাসটুকু থাক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here