nijalay stall

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : একটার নাম যদি হয় ‘অনুভব-সংকল্প’, আরেকটাকে বলা যেতে পারে ‘নিজলয়ের নিজস্বতা’। যাঁরা এক সময় জীবন-সমাজের নির্যাতন সহ্য করতে করতে হারিয়ে যেতে বসেছিলেন, তাঁদের হাত ধরেই হয়তো মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের ‘কর্মতীর্থ’ মঙ্গলবার পরিপুর্ণতা পেল এই দু’টি স্টল উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে।

anuvab girls are busy in their stall
কম্পিউটার আর ফটোকপিয়ারে ব্যস্ত ‘অনুভব’-এর মেয়েরা।

রাজ্য জুড়েই আজ কর্মতীর্থ দিবস পালিত হয়েছে। বাদ পড়েনি জলপাইগুড়িও। জলপাইগুড়ির জেলা পরিষদের দেওয়া জায়গায় জেলা গ্রামীণ উন্নয়ন সেলের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল কর্মতীর্থ ভবন। উদ্দেশ্য ছিল মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা সুযোগ দেওয়া। বেশ কয়েকটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে একটি করে স্টল দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা নিজেদের তৈরি জিনিস মানুষের কাছে নিয়ে যেতে পারে, বিক্রি করতে পারে।

আজ সেই কর্মতীর্থ ভবনে আরও নতুন দু’টি স্টলের পথ চলা শুরু হল।

তবে অন্য স্টলগুলির সঙ্গে এর পার্থক্য আছে বই-কি। যেমন, নমিতার কথাই ধরা যাক। মা-বাবাকে চোখে দেখেননি। বাড়ি কোথায় তা-ও মনে নেই। নির্যাতনের শিকার, বিভিন্ন হাত ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঠাই হোমে। সেখানেই পড়াশোনা শেখা আর আজ একটা স্টলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী। শুধু তিনি নন, দু’টি স্টল পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন হোমে থাকা মেয়েরাই। সেই মেয়েরা, যাঁরা কোনো না কোনো ভাবে নির্যাতনের শিকার, পরিবার ছাড়া, ঘর ছাড়া। যাঁদের ঠিকানা জলপাইগুড়ির দু’টি হোম ‘অনুভব’ এবং ‘নিজলয়’।

handicrafts in 'anuvab' stall
‘অনুভব’-এর মেয়েদের তৈরি হস্তশিল্প সামগ্রী।

‘অনুভব’-এর সংকল্পের কথাই ধরা যাক। এই হোমের পাঁচটি মেয়ে, যাঁদের এই স্টল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্টলটিতে রয়েছে কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফটোকপি করার মেশিন, খাতা-কলম এবং হস্তশিল্পের সম্ভার। ‘অনুভব’-এর কো-অর্ডিনেটর দীপশ্রী রায় জানিয়েছেন, যাঁদের বয়েস আঠারোর বেশি, তাঁদেরই এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা সাবলম্বী হন। যেমন কম্পিউটার চালানোর দায়িত্ব বর্তেছে অনামিকার (নাম পরিবর্তিত) ওপর। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া মেয়েটি কি-বোর্ডে বেশ দক্ষ। ফটোকপি করার মেশিনের ভার জয়িতার (পরিবর্তিত নাম) ওপর। এই ভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে দায়িত্ব।

nijalay girls are busy in making handicrafts
হস্তশিল্প তৈরিতে ব্যস্ত ‘নিজলয়’-এর মেয়েরা।

‘নিজলয়’ হোমের স্টলটিতে আবার নানা রকম হস্তশিল্পের সম্ভার। শাড়ি, দোপাট্টা থেকে শুরু করে শৌখিন কুশন বা ঘর সাজানোর জন্য পুতুল, সবই হাজির এখানে। হোমের বেশ কয়েক জন আবাসিক হস্তশিল্পসামগ্রী তৈরিতে বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছে। তাদের হাতের কারিকুরিতে গড়ে ওঠা জিনিসগুলি সরাসরি এই স্টল থেকে কিনতে পারবেন সাধারণ মানুষ। ‘নিজলয়’ হোমের ইন-চার্জ শিখা মিত্র জানিয়েছেন, শুধু অর্থ রোজগার নয়, জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসা এই মেয়েগুলোকে ফের জীবনে বাঁচার পথ দেখানোই তাঁদের মুল উদ্দেশ্য।
হোমের কাউন্সিলর অমৃতা চক্রবর্তী জানিয়েছেন, যে মেয়েরা স্টলের দায়িত্ব সামলাবেন বা যাঁরা হোমে হস্তশিল্প তৈরি করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই জীবনের একটা সময় ‘ট্রমা’র মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছেন। সেই ট্রমা থেকে বের করে জীবনের মূল স্রোতে নিয়ে আসার জন্যই এই উদ্যোগ জরুরি ছিল।
কথাটা যে সত্যি দেখা গেল স্টল দু’টিতে গিয়ে। প্রথম দিন থেকেই কাজের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন সকলে। অতীতের সেই ক্ষত আর গ্লানি কিছুই মনে রাখতে চান না বরং আলোর দিশা পেতেই এগিয়ে যেতে চান তাঁরা।
জেলা ‘গ্রামীণ উন্নয়ন সেল’-এর পক্ষ থেকেই প্রথম এই বিষয়ে উদ্যোগ নিয়ে স্টল দু’টি দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার কর্মতীর্থ দিবসে স্টল দু’টির উদ্বোধন করতে গিয়ে এই মেয়েদের জেদ ও লড়াই করার মানসিকতা দেখে আপ্লুত জলপাইগুড়ি সাংসদ বিজয় চন্দ্র বর্মণ, অতিরিক্ত জেলা শাসক সুমেধা প্রধান। তাঁদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ জেলা গ্রামীন উন্নয়ন সেলের প্রকল্প আধিকারিক কাজল দাশগুপ্ত এবং সংখ্যালঘু বিভাগের আধিকারিক সুদেষ্ণা মিত্রও। সকলেই চাইছেন অতীতের ‘কালো’ ভুলে আগামীর ‘আলো’র দিকে এগিয়ে যাক এই লড়াকু মেয়েরা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here