চিকিৎসকদের সংঘাত থানা হয়ে আদালতে, পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা

0
2377

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : চিকিৎসকদের মধ্যে সংঘাত। সেই সংঘাত এতটাই চরম আকার নিয়েছে যে,  থানা-পুলিশ হয়ে আদালতের দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা। জলপাইগুড়িতে আবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু চিকিৎসক মহল।

গত কয়েক মাস ধরে একের পর এক বিতর্ক তাড়া করছে জলপাইগুড়ির চিকিৎসকমহলকে। কখনও নার্সিংহোমে রোগীমৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ, যা শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্ট অবধি গড়িয়েছে। আবার সেই ঘটনাকে ঘিরে চিকিৎসকদের আন্দোলন, যার ফলে জেলার চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছিল।

আরও পড়ুন: নার্সিংহোমে গাফিলতিতে মৃত্যু: নতুন করে তদন্তের নির্দেশ হাইকোর্টের

এ বারের ঘটনার আরও বেশি বিতর্কিত। কারণ, নিজেদের মধ্যেই দন্দ্বে জড়িয়েছেন চিকিৎসকরা। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার অভিযোগ করছেন একপক্ষ  অপরপক্ষের বিরুদ্ধে। ফাটল ধরেছে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জলপাইগুড়ি শাখায়। যার জেরে সম্পাদক এবং সভাপতিকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গড়া হয়েছে। সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সম্পাদক এবং সভাপতি নির্বাচন করা হয়েছে অন্য দুই চিকিৎসকে। তালা ঝুলিয়ে দখল নেওয়া হয়েছে আইএমএ-র অফিসের।

মঙ্গলবার রীতিমতো সাংবাদিক সন্মেলন করে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেন আইএমএ-র সদস্যদের একাংশ। তাঁরা জানিয়েছেন, গত ১৬ জুলাই প্রায় ৯০% সদস্যদের উপস্থিতিতে সম্পাদক ডাঃ সুশান্ত রায় এবং সভাপতি ডাঃ নিতাই মুখার্জিকে অপসারিত করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি, যার সম্পাদক হয়েছেন ডাঃ কৃষেন্দু বোস এবং সভাপতি ডাঃ প্রদীপ কুমার বর্মা।

নিয়ম অনু্যায়ী ২০১৮-তে ফের নির্বাচন হওয়ার কথা আইএমএ-র জলপাইগুড়ি শাখায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে চলতি বছরের আগস্টেই নির্বাচন করার জন্য সংগঠনের রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সংগঠনের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের সদস্য ডাঃ কমলেশ বিশ্বাস।

আরও পড়ুন: জলপাইগুড়ির অভিযুক্ত চিকিৎসকদের আপাতত গ্রেফতার নয়, স্থগিতাদেশ কলকাতা হাইকোর্টের

বেশ কিছু দিন ধরেই আইএমএ-র জলপাইগুড়ি শাখার সম্পাদক ডাঃ সুশান্ত রায় এবং সভাপতি ডাঃ নিতাই মুখার্জির বিরুদ্ধে অসন্তোষ জমছিল সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে। ডাঃ সুশান্ত রায় পর পর তিন বার সম্পাদক নির্বাচিত  হয়েছন। অভিযোগ, সেই সুযোগ নিয়ে তিনি মৌরসিপাট্টা গেড়ে বসেছিলেন সংগঠনে। অভিযোগ, অন্য কোনো চিকিৎসক-সদস্যদের আমলই দিতেন না তিনি। সভাপতি ডাঃ নিতাই মুখার্জিও তাঁর কথামতোই চলতেন বলে অভিযোগ জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

মঙ্গলবার সাংবাদিক সন্মেলন করে সংগঠনের অন্তর্বর্তীকালীন সম্পাদক ডাঃ কৃষেন্দু বোস অভিযোগ করেছেন, অপসারিত সম্পাদক ও সভাপতির কাজকর্মে অস্বচ্ছতা ছিল এবং তা নিয়ে অনেক বার সরব হয়েছেন সদস্যরা, যদিও তাতে লাভ হয়নি। সংগঠনের সদস্য ডাঃ কমলেশ বিশ্বাস জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের দাবিদাওয়া পূরণের জন্যই আইএমএ তৈরি করা হয়েছে। অথচ কোনো চিকিৎসক বিপদে পড়লে বা চিকিৎসকদের কোনো আন্দোলনে তাঁদের পাশে দাঁড়াতেন না অপসারিত সম্পাদক ও সভাপতি।

আরও পড়ুন: জলপাইগুড়ি: আপাতত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ, হাইকোর্টের পথে চিকিৎসকরা

বস্তুত, সংগঠনে এই ফাটল দীর্ঘায়ত হয়েছিল মেরিনা নার্সিংহোম কাণ্ড ঘিরে। চিকিৎসায় গাফিলতি এবং মৃত্যুর অভিযোগে এই নার্সিংহোমের  তিন জন চিকিৎসক যাঁদের মধ্যে এক জন আবার জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালেরও চিকিৎসক, তাঁদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট ২০১৭-এর পাশাপাশি ভারতীয় দণ্ডবিধির  ৩০৪নং ধারায় (অনিচ্ছাকৃত খুনের ধারা) অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। সেই সময় চিকিৎসকদের সিংহভাগ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন। সেই সময়ও ডাঃসুশান্ত রায় তাঁদের পাশে এসে দাঁড়াননি বলে অভিযোগ জানিয়েছেন ডাঃ কমলেশ বিশ্বাস।

অভিযোগ, ডাঃ সুশান্ত রায় নিজেকে শাসকদল তৃণমূল ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। সেই সুবাদে সংগঠনে তাঁর আধিপত্য বজায় রাখতে তিনি নিজের কয়েক জন অনুগামী নিয়ে মর্জিমাফিক কাজ করতেন বলে অভিযোগ জানিয়েছেন চিকিৎসকদের সিংহভাগ।

আইএমএ-র জলপাইগুড়ি শাখার চিকিৎসকদের সিংহভাগই জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতাল এবং সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। ডাঃসুশান্ত রায়ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে এখানে রয়েছেন এবং সভাপতি ডাঃ নিতাই মুখার্জিও এই হাসপাতালের প্রাক্তন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ।

আরও পড়ুন: চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের প্রতিবাদ, বিক্ষোভে একজোট জলপাইগুড়ির চিকিৎসকরা

সব চেয়ে গুরুতর অভিযোগ, আইএমএ-র সম্পাদক এবং শাসকদল ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ডাঃ সুশান্ত রায় জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতাল ও সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের কাজকর্মেও হস্তক্ষেপ করতেন। জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ স্বস্তিশোভন চৌধুরী জানিয়েছেন, কোন চিকিৎসক কখন, কী ভাবে কাজ করবেন, হাসপাতাল সুপারের হয়ে বকলমে সেই ‘রোস্টার’ ঠিক করতেন ডাঃ সুশান্ত রায় এবং এতে তার পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ পেত। অর্থাৎ, নিজের অনুগামী চিকিৎসকদের তিনি সুবিধেমতো দায়িত্ব ভাগ করে দিতেন।

যদিও এই সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করেছেন ডাঃ সুশান্ত রায়। তাঁর দাবি, হাসপাতালকে সঠিক ভাবে চালনা করার জন্য তিনি শুধুমাত্র সুপারকে সাহায্য করতেন। কোনো প্রভাব খাটাতেন না। তাঁর পালটা অভিযোগ, কিছু চিকিৎসক হাসপাতালের ‘ডিউটি আওয়ার্সে’ নার্সিংহোমে গিয়ে চিকিৎসা-অপারেশন করে থাকেন। এই বেনিয়মে বাধা দেওয়াতেই তাঁর বিরুদ্ধে এই সব ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

তিনি আরও অভিযোগ জানিয়ে বলেছেন, যে ভাবে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে কতিপয় চিকিৎসক আইএমএ-র অফিসে তালা ঝুলিয়ে দখল নিয়েছেন তা সংগঠনের নিয়ম অনু্যায়ী অবৈধ। অভিযোগ, নতুন কমিটি সংগঠনের অফিসঘর থেকে রেজিস্টার, চেকবই এবং অন্যান্য নথি নিয়ে গিয়েছে। এর বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় একটি অভিযোগও জানিয়েছেন ডাঃ সুশান্ত রায়। সমস্ত ঘটনা জানিয়ে পালটা থানায় একটি ইনফরমেশন লেটার দিয়েছে আইএমএ-র অ্যাডহক নতুন কমিটি। মঙ্গলবার জলপাইগুড়ি আদালতে একটি ‘ক্যাভিয়েট’ও ফাইল করেছে নতুন কমিটি। তাদের আইনজীবী সন্দীপ দত্ত জানিয়েছেন, নতুন কমিটিকে না জানিয়ে অপসারিত সম্পাদক বা সভাপতি যাতে এক তরফা কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে না পারেন তার জন্যই এই ‘ক্যাভিয়েট’ ফাইল করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: জলপাইগুড়িতে ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট আইনে মামলায় জামিন খারিজ নার্সিংহোম মালিক, চিকিৎসকের

এই আবহাওয়ায় শংকিত সাধারণ মানুষ। এমনিতেই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে প্রায়ই পরিষেবায় গাফিলতির অভিযোগ উঠে থাকে, তার ওপর ক্ষমতার দখল নিয়ে যদি নিজেদের মধ্যে সংঘাতে চলে যান চিকিৎসকরা,  তা হলে চিকিৎসা পরিষেবার হাল কী হবে তা বুঝে উঠতে পারেছেন না কেউ। এই আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়েও দেননি অপসারিত সম্পাদক ডাঃ সুশান্ত রায়। যদিও অপর দিকে ডাঃ কমলেশ বিশ্বাস জানিয়েছেন, এই ঘটনা তাঁদের পরিষেবায় কোনো ছাপ ফেলবে না। বিষয়টির ওপর নজর রয়েছে জেলা স্বাস্থ্য দফতরেরও, যদিও কোনো স্বাস্থ্যকর্তা এ নিয়ে মুখ খুলতে চাননি।

এ দিকে ঘটনার কথা কানে গিয়েছে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য শাখারও। সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক ডাঃ শান্তনু সেন জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন মাধ্যমে সংঘাতের খবর তিনি শুনেছেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁকে কিছু না জানানোয় এখনি তিনি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। তবে ঘটনার দিকে তাঁরা নজর রেখেছেন বলে জানিয়েছেন ডাঃ শান্তনু সেন।

আপাতত এখন এটাই দেখার যে চিকিৎসকদের এই অভিযোগ, পালটা অভিযোগ, থানা-পুলিশ-আদালত এবং ‘ইগো’র লড়াই শেষ পর্যন্ত কী চেহারা নেয়।

 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here