তিতাস পাল, জলপাইগুড়ি:জটিলতা বাড়ছে জলপাইগুড়ি নার্সিংহোম কাণ্ড নিয়ে। আইনি জালে জড়ানোর বিরোধিতা করতে একজোট হচ্ছেন চিকিৎসকরা। নার্সিংহোম কাণ্ডে নাম জড়িয়ে যাওয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করলে চিকিৎসা পরিষেবা যে ব্যাহত হতে পারে তা নিয়ে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন জলপাইগুড়ির চিকিৎসকদের একটা বড়ো অংশ। শুক্রবার জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জগন্নাথ সরকারের কাছে যান ৫০জনেরও বেশি চিকিৎসক। এদের মধ্যে যেমন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ছিলেন, তেমনি ছিলেন প্রাইভেট প্র‍্যাকটিস বা নার্সিংহোমের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকেরাও। তাঁদের দাবি, যে ভাবে এক রোগিনীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইপিসির ৩০৪নং ধারা(অনিচ্ছাকৃত খুনের ধারা) প্রয়োগ করা হয়েছে তা অযৌক্তিক। এতে তাঁদের সামাজিক মর্যাদা নষ্ট করা হচ্ছে। প্রায় ১ঘন্টা তারা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের ঘরে ছিলেন। একটি স্মারকলিপিও দেন তাঁরা।

আরও পড়ুন: জলপাইগুড়িতে ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট আইনে মামলায় জামিন খারিজ নার্সিংহোম মালিক, চিকিৎসকের

অভিযোগ এই ঘটনার ফলে শুক্রবার শহরের চিকিৎসা পরিষেবা অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে। কারণ যারা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে স্মারকলিপি দিতে গিয়েছিলেন তারা অনেকেই জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল বা জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক। ওই সময় বহির্বিভাগের কাজ বন্ধ রেখে তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন। এই বিষয়ে মুখে কিছু না বললেও, অনেকের ধারণা চিকিৎসকরা বুঝিয়ে দিতে চাইছেন তাদের দাবি মানা না হলে এই ভাবে চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত হবে।

গত ১১ এপ্রিল জলপাইগুড়ি শহরের মেরিনা নার্সিংহোমে মৃত্যু হয় মীনা ছেত্রী নামে এক প্রৌঢ়ার। ভেন্টিলেশন মেশিন খারাপ থাকায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করে মৃতার পরিবার। ভেন্টিলেশন মেশিন খারাপ থাকার কথা তাদের কাছে চেপে যাওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন মৃতার ছেলে উদয় ছেত্রী। কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য দফতর এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও অভিযোগ জানায় মৃতা প্রৌঢ়ার পরিবার। একটি কমিটি গড়ে তদন্ত করে স্বাস্থ্য দফতর। সেই তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেণ্ট অ্যাক্ট’২০১৭এর ধারায় কেস শুরু করে পুলিশ। সেই সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় আইপিসি ৩০৪নং ধারা। গত বুধবার অভিযুক্ত নার্সিংহোম মালিক, দুই চিকিৎসক, নার্সিংহোমের ম্যানেজার এবং একজন টেকনিশিয়ানের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে জলপাইগুড়ি জেলা আদালত। এই ঘটনাতেই আশঙ্কিত চিকিৎসক মহল। জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা:স্বস্তিশোভন চৌধুরী জানিয়েছেন, গাফিলতির তদন্ত হতেই পারে,কিন্তু একজন চিকিৎসকের সঙ্গে অপরাধীর মতো ব্যবহার মেনে নেওয়া যায় না। হাসপাতালের আর একজন চিকিৎসক কমলেশ বিশ্বাস জানিয়েছেন, ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্টের সঙ্গে যে ভাবে ৩০৪ ধারা যোগ করেছে পুলিশ তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের বক্তব্য, এইভাবে যদি সমাজের কাছে চিকিৎসকদের অভিযুক্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়, তাহলে পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সুস্থ মানসিকতা নষ্ট হবে চিকিৎসকদের। নষ্ট হবে চিকিৎসক -রোগীর সম্পর্কও। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছে নিরাপত্তা ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশের দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। যদিও মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জগন্নাথ সরকার জানিয়েছেন, আইন আইনের পথে চলবে, এই বিষয়ে তার কিছু করার নেই। তবে চিকিৎসকদের কাছে তিনি আর্জি জানিয়েছেন, এই ঘটনার প্রভাব যাতে জেলার স্বাস্থ্য পরিষেবায় না পড়ে।

পরে সন্ধ্যায় জেলার পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতির সঙ্গেও দেখা করেন তারা। অভিযুক্ত চিকিৎসকদের যাতে গ্রেফতার না করা হয় সেই আর্জি জানিয়েছেন পুলিশ সুপারের কাছে।

এদিকে গ্রেফতারি পরোয়ানার জন্য আবেদন জানালেও,শুক্রবার পুলিশের সেই আবেদন খারিজ করে দেয় জলপাইগুড়ি আদালত।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে সম্প্রতি ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেণ্ট অ্যাক্টে সংশোধনী এনেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময়ই চিকিৎসক মহলের মধ্য থেকে আপত্তি উঠেছিল। জলপাইগুড়ির ঘটনায় যে ভাবে চিকিৎসক মহল একজোট হয়েছে, সেখানে এই আইনের প্রথম প্রয়োগ কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here