পাহাড়ের অশান্তি সমতলে যেন না আসে, মোর্চাকে ঠেকাতে একজোট ডুয়ার্স

0
388

নিজস্ব প্রতিনিধি, জলপাইগুড়ি: রাজ্য সরকারের কড়া মনোভাবে এমনিতেই চাপে রয়েছে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। হিংসাত্মক আন্দোলনে চালিয়ে গেলেও তা যে বেশিদিন সম্ভব নয় তা ভালো ভাবেই বুঝতে পারছেন বিমল গুরুং, রোশন গিরিরা। কারণ পাহাড় বিষয়ে রাজ্যকে এড়িয়ে কোন পদক্ষপে যে তারা করবেন না, তা বুঝিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রও। তাই পালটা চাপ বাড়াতে পাহাড়ের আন্দোলন সমতলে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছিল মোর্চা নেতৃত্ব। যদিও প্রথমদিনেই সেই চাপ বুমেরাং হয়ে ফিরে গেল মোর্চার দিকেই।

রবিবার ডুয়ার্সে সব থানায় বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল মোর্চার ডুয়ার্স কমিটি। পাহাড়ের অশান্তির দিকে লক্ষ্য রেখে পরিস্থিতি সামাল দিতে পর্যাপ্ত পুলিশি ব্যাবস্থাও রাখা হয়েছিল থানায় থানায় । কিন্তু তার কোনো প্রয়োজনই হয়নি। আলিপুরদুয়ার জেলার বীরপাড়া, কালচিনি ও জঁয়গা এই তিনটি মাত্র থানাতে মোর্চার কিছু সমর্থক কালো পতাকা হাতে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। তবে ওইটুকুই। ডুয়ার্সের অন্যান্য থানায় অভিযান চালানোর সাহসটুকুও পায়নি তারা। জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার, মেটেলি, নাগরাকাটা, বানারহাট থানা ছিল একেবারে স্বাভাবিক। তার কারণ যে শুধু পর্যাপ্ত পুলিশি ব্যাবস্থা তা নয়। ইতিমধ্যেই ডুয়ার্স-তরাইয়ে গোর্খাল্যান্ড বিরোধী জনমত তৈরি শুরু হয়ে গিয়েছে। সেখানে যেমন তৃণমূল কংগ্রেসের মতো রাজনৈতিক দল আছে। তেমনি আছে আদিবাসী বিকাশ পরিষদের মত গনসংগঠনও। আছে আমরা বাঙালি, বাংলা ভাষা বাঁচাও কমিটির মতো গণমঞ্চগুলিও।

রাজ্যের শাসকদল হওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস মোর্চার আন্দোলনের বিরোধিতা করবে এটাই স্বাভাবিক। আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মোর্চার তৈরি করা অশান্তির বাতাবরণ
ডুয়ার্সে ঢুকতে দেওয়া হবে না। মালবাজারের তৃণমূল কার্যকরী সভাপতি অমিত দে’র দাবি ডুয়ার্সের নেপালি ভাষাভাষি মানুষও তাদের সঙ্গেই আছেন।

গোর্খাল্যান্ডের বিরোধিতায় গর্জে উঠেছে অন্যান্য সংগঠনগুলিও। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে আদিবাসী বিকাশ পরিষদের রাজ্য সভাপতি বীরসা তিরকি রবিবারই দিল্লি থেকে উড়ে এসেছেন শিলিগুড়িতে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন ডুয়ার্স-তরাইয়ে মোর্চা অশান্তির চেষ্টা করলে, তারাও পথে নেমে তা প্রতিরোধ করবেন। সোমবার তিনি তরাইয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসছেন শিলিগুড়িতে। মঙ্গলবার বৈঠক করবেন ডুয়ার্সে। বীরসা তিরকি জানিয়েছেন, মোর্চার বিরোধিতায় আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হবে এই দুটি বৈঠকে। তবে শুধু পরিষদই নয়। পথে নামতে তৈরি হচ্ছেন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষও। এর আগে ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত মোর্চার যে আন্দোলন হয়েছিল তাতে উত্তপ্ত হয়েছিল ডুয়ার্স। সেই সময় মোর্চার বিরোধিতায় তৈরি হয়েছিল জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি। সেখানে রাজনৈতিক দল , অরাজনৈতিক সংগঠন থেকে শুরু করে সামিল হয়েছিল ব্যাবসায়ী সমিতি, বিভিন্ন গণমঞ্চগুলি। সেই জয়েণ্ট অ্যাকশন কমিটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় তারা প্রাথমিক বৈঠকও করেছেন। বিকাশ পরিষদের নেতা তথা কমিটির মুখপাত্র তেজকুমার টোপ্পো জানিয়েছেন, ডুয়ার্সে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করবে জয়েণ্ট অ্যাকশন কমিটি। রবিবার শিলিগুড়িতেও গোর্খাল্যান্ড বিরোধী বেশ কয়েকটি মিছিল হয়েছে। মাটিগাড়ায় বিমল গুরুং, রোশন গিরির কুশপুতুল পোড়ানো হয়েছে।

এই বেগতিক পরিস্থিতিতে মোর্চা নেতৃত্ব যে চাপে পড়েবে তা বলাই বাহুল্য। তাই নিজেদের শক্তি দেখাতে রবিবার ডুয়ার্সের সামসিং-এ একটি জনসভা করে মোর্চা। সেখান থেকে গোর্খাল্যান্ড আদায়ের জন্য শেষ শক্তি দিয়ে আন্দোলনের কথা বলেন মোর্চা নেতা উত্তম প্রধান। বুধবার থেকে কালচিনিতে অনশনে বসবে মোর্চা সমর্থকরা।

পাহাড়েও অশান্তি বাদ যায়নি। রবিবার বিকেলে একটি পুলিশ ক্যাম্পে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। সে ঘটনায় চার পুলিশ কর্মী আহত হয়েছেন। পোখরিবং-এ বিডিও অফিস এবং লোধমায় একটি হোটেলেও আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু এইভাবে হিংসাত্মক আন্দোলন চালিয়ে নিজেদের লক্ষ্যে কি আদৌ পৌছাতে পারবে মোর্চা? তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে মোর্চার অন্দরেই। কারণ যেভাবে গোর্খাল্যান্ড বিরোধী আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, তাতে পরিষ্কার যে সমতল বা ডুয়ার্সে মোর্চার জায়গা হবে না। আবার পাহাড়েও একদিকে রসদের ভাঁড়ারে টান, অন্যদিকে আন্দোলন দমাতে রাজ্য সরকারের মরিয়া প্রচেষ্টা। সব মিলিয়ে কোণঠাসা মোর্চা নেতৃত্ব এবার কি সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে মোর্চার ভবিষ্যৎ। কারণ সমতলে আন্দোলন ছড়ানোর পরিকল্পনা যদি ধাক্কা খায় তাহলে পাহাড়ে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বে মোর্চা। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রাসঙ্গিকতাও হারাতে পারে তাদের। সে কথা অজানা নয় মোর্চার শীর্ষ নেতৃত্বের। তাই দ্রুত কৌশল বদলের পথে বিমল গুরুং। এই কারণে ১৮ জুলাই যে সর্ব দল বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়েছিল পাহাড়ে, তা তড়িঘড়ি এগিয়ে ১১ জুলাই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন এই বৈঠকের ঝুলি থেকে কী বেড়াল বের হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন ও মোর্চার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here