পাশে নেই কেউ, পাহাড়ে কি সত্যিই গুরুং জমানার ইতি?

0

দার্জিলিং: গত দু’ তিন দিনে দু’দিক দিয়ে ধাক্কা খেয়েছেন একদা গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সুপ্রিমো এবং পাহাড়ের সর্বেসর্বা বিমল গুরুং। এক দিকে যখন গুরুং-এর গ্রেফতারির ওপর থেকে স্থগিতাদেশ তুলে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী পবন চামলিং। গুরুং-এর নিখোঁজ পর্বে সিকিমের তরফ থেকে অনেক মদত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু দুই মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের পরে সিকিম যে আর গুরুংকে কোনো রক্ষাকবচ দেবে না সেটা বলে দেওয়া যায়।

তাঁর প্রভাব যে তলানিতে, সেটা আন্দাজ করেই শনিবার একটি অডিও বার্তা প্রকাশ করেন গুরুং। সেখানে তিনি কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানান, যত শীঘ্র সম্ভব পাহাড় নিয়ে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ডাকা হোক। সেখানে তিনি বলেছেন, তাঁর এবং তাঁর দলের সমর্থকরা অপরাধী, দেশদ্রোহী বা জঙ্গি নন।

কিন্তু কেন্দ্র গুরুং-এর এই বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে চাইছে না। কারণ বিজেপি বুঝে গিয়েছে, পাহাড়ে বিজেপির যেটুকু প্রভাব ছিল সেটা গুরুং-এর জন্যই। দার্জিলিং-রাজনীতির পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাঁরা যে এখন বিজেপির সঙ্গে হাত মেলাবেন না সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোর্চার নতুন প্রধান বিনয় তামাং। শুধু তা-ই নয়, মোর্চার নতুন নেতৃত্ব হোক বা পাহাড়ের বাকি রাজনৈতিক দল, জেএনএলএফ বা হরকা বাহাদুর ছেত্রীর জন আন্দোলন পার্টি হোক, সবাই এখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই সখ্যতা রেখে চলতে চায়।

গুরুং-এর গ্রেফতারি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরে বিনয় জানান, “সুপ্রিম কোর্ট যা নির্দেশ দিয়েছে তাতে তাঁকে গ্রেফতার করার সমস্ত অধিকার এখন রাজ্যের রয়েছে।”

Shyamsundar

২০১১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত পাহাড় রাজনীতির একনায়ক ছিলেন গুরুং। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় গত বছর জুন থেকে যখন সরাসরি রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন গুরুং। পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবি নতুন করে শুরু করেন গুরুং। ডাকেন বন্ধ, অচল হয়ে যায় পাহাড়, আগুন লাগানো হয় বিভিন্ন জায়গায়। সেই সঙ্গে হয় নাশকতামূলক কাজকর্মও। দার্জিলিং, কালিম্পং, মিরিক এবং সুখিয়াপোখরিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই সব ঘটনার পেছনে গুরুংকে দায়ী করে তাঁর বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারায় মামলা করে রাজ্য।

কিন্তু গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে ফের বদলাতে শুরু করে পাহাড়ের রাজনীতির সমীকরণ। অস্থায়ী প্রধান হিসেবে গোর্খাল্যান্ড টেরিটরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (জিটিএ) মাথায় বসিয়ে দেওয়া হয় বিনয়কে। আসতে আসতে ভাঙতে শুরু করে মোর্চা। মোটামুটি দু’টি ভাগে শিবিরে হয়ে যায় মোর্চা – বিনয় শিবির এবং গুরুং শিবির। কিন্তু গুরুং-ঘনিষ্ঠ যে নেতা-কর্মী-কাউন্সিলর ছিলেন, ধীরে ধীরে তাঁরাও বিনয় শিবিরে যোগদান করতে শুরু করেন। ক্রমশ একা হয়ে যেতে শুরু করেন গুরুং।

প্রথম প্রথম সিকিমকেই পাশে পেয়েছিলেন গুরুং। গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন চলাকালীন চামলিং বারবার পৃথক রাজ্যের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। এর জন্য পশ্চিমবঙ্গ এবং সিকিমের সম্পর্কও ক্রমশ তলানিতে ঠেকেছিল। তবে সেই সময় এখন পেরিয়ে গিয়েছে। মমতা এবং চামলিং বৈঠকের পরে রাজ্যের পাশে থাকারই বার্তা দিয়েছে সিকিম। শেষ ‘প্রাণভোমরা’টিও হারালেন গুরুং।

দার্জিলিং-এর সাংসদ বিজেপির সুরিন্দর সিংহ আহলুওয়ালিয়া যতই বলুন পাহাড়ে বিজেপির প্রভাব এখনও রয়েছে, একমাত্র গুরুং-এর গুটিকয়েক সমর্থক ছাড়া সব দলই বিজেপি নিয়ে সন্দিহান। জিএনএলএফের মুখপাত্র নীরজ জিম্বা বলেন, “২০০৯ থেকে বিজেপি গুরুংকে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।” অন্য দিকে হরকা বাহাদুর ছেত্রী বলেন, “বাকি বাংলার দিকে নজর দিতে গিয়ে পাহাড়কে ভুলেই গিয়েছে বিজেপি। তারা পাহাড়ের মানুষকে ভালোবাসে না।”

গুরুং-এর বর্তমান অবস্থার জন্য তিনি নিজেই দায়ী বলে মনে করেন সিপিআইএম নেতা তথা শিলিগুড়ির মেয়র অশোক ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, “গুরুং নিজের রাস্তা থেকে সরে গিয়ে ভুলভাল কাজ না করলে পাহাড়ের রাজনীতি আজ অন্য রকম হত।”

সৌজন্য: হিন্দুস্তান টাইম্‌স

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন