Bikash Ranjan Bhattacharya
বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। নিজস্ব ছবি

বামফ্রন্টের প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পরেই পুরোদমে প্রচারে নেমে পড়েছেন যাদবপুরের সিপিএম প্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। এই প্রথম বার লোকসভায়, কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়েই সাধারণ মানুষের দাবি আদায়ের কথা পৌঁছে দিতে চান সংসদে। প্রচারের মাঝেই খবর অনলাইনের মুখোমুখি কলকাতার প্রাক্তন মহানাগরিক।

এ বারের লোকসভা ভোটের প্রচারে মূল ইস্যু হিসাবে কোন বিষয়গুলিকে তুলে ধরছেন?

মূল ইস্যু দেশের ঐক্য এবং সংবিধানকে রক্ষা করা, গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের অধিকারকে সুরক্ষিত করা, দেশের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করতে জাতীয় শিল্প গড়ে তোলা এবং বর্তমান সরকার দেশের জাতীয় শিল্পগুলিকে যে ভাবে বিক্রি করে দিচ্ছে, তাকে রুখে দেওয়া। একই সঙ্গে ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করা – এগুলিই হচ্ছে এ বারের ভোটে আমাদের প্রচারের মূল ইস্যু।

সংসদে গিয়ে যাদবপুরের মানুষের কোন কোন সমস্যার সমাধানের লক্ষ্য রয়েছে আপনার?

এটা লোকসভা নির্বাচন, যাদবপুর কেন্দ্রের মানুষেরও সুখ-দু‌ঃখ সব কিছুই নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গির উপর। দেশ যদি ধর্মীয় কারণে বিভাজিত হয়ে যায়, তা হলে যাদবপুরের মানুষও তার প্রভাব থেকে বাদ পড়বে না। সারা দেশেই যদি বেকারত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র হয়, বেকার যুবদের হাতে কাজ আসে, তা হলে যাদবপুরের বেকার ছেলেমেয়েরাও হাতে কাজ পাবে। গোটা দেশের কৃষক-শ্রমিকরা যদি ন্যূনতম আয়ের সুযোগ পান, তা হলে আমার যাদবপুর কেন্দ্রের অন্তর্গত যে সব কৃষক-শ্রমিক রয়েছেন, তাঁরাও ন্যূনতম আয় হাতে পাবেন। ফলে পুরোটাই সামগ্রিক নীতিভিত্তিক সমাধানের লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে বামফ্রন্ট।

২০১১-য় রাজ্যে পালাবদলের পর সিপিএমের সাংগঠনিক দুর্বলতা ধরা পড়ছে। প্রচারে বেরিয়ে দলীয় কর্মীসমর্থকদের মধ্যে থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

খুব ভালোই আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি। প্রত্যেকটা জায়গায় তাঁরা খুব উৎসাহের সঙ্গেই প্রচার কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সব জায়গাতেই তাঁরা সমবেত হচ্ছেন, মিছিলে অংশ নিচ্ছেন। কর্মীদের উৎসাহে বেশ ভালো ঝোঁক দেখতে পাচ্ছি।

নতুন প্রজন্মের উৎসাহ কতটা?

যথেষ্ট। গত মঙ্গলবার একটা মিছিল ছিল। ওই মিছিলে তো যাঁদের পা মেলাতে দেখলাম, তাঁদের ৬০ শতাংশই তরুণ প্রজন্মের। লম্বা-লম্বা মিছিল হচ্ছে, অতটা পথ তরুণরা তো বেমালুম হেঁটে চলেছেন।

যাদবপুরে রাজনৈতিক সচেতন মানুষের বাস। আপনার বিরুদ্ধে এমন একটি কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রাজনীতিতে নবাগতা। কী ভাবে দেখছেন বিষয়টাকে?

কে প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন, সেটা বড়ো কথা নয়। কারণ বিষয়টা তো ব্যক্তিগত নয়, বিষয়টা রাজনীতিগত। তিনি একটা রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। সেই রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি কী, তা নিয়েই আমি ভাবিত। আমি মনে করি, তৃণমূলের যে রাজনৈতিক কর্মসূচি, তা ভারতবর্ষের সংবিধানবিরোধী। এ প্রসঙ্গেই দু’টো ঘটনার কথা বলি, আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী রাফাল দুর্নীতি নিয়ে তদন্তে ভয় পাচ্ছেন, রা্জ্যের মুখ্যমন্ত্রীও তদন্তে ভয় পাচ্ছেন। চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে ডুবে রয়েছেন। তদন্তকারী সংস্থা তদন্তে করতে এসেছে, তার বিরুদ্ধে তিনি হুঙ্কার ছেড়েছেন, ধরনায় বসে পড়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

তার মানে কেন্দ্র এবং রাজ্যের শাসকদলের কর্মসূচিগুলোতে কি কোথায় মিল রয়েছে?

‘পদ্মাবত’ জাতীয় স্তরে মুক্তি পেলে তা দেখতে দেওয়া হয় না বিজেপিশাসিত রাজ্যে। আবার আমাদের এখানে ‘ভবিষ্যতের ভূত’ মুক্তি পেলে দেখতে দেওয়া হয় না। অর্থাৎ একই সূত্রে বাঁধা। এ রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। সংবাদ মাধ্যমে এগুলো নিশ্চয় দেখেছেন। এটা বাস্তব সত্য। ঠিক অনুরূপ ভাবে বিজেপিশাসিত ত্রিপুরাতেও নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্যদের জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে, পঞ্চায়েতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হয়নি। এরা আসলে একই পথের পথিক। কিন্তু সাধারণ মানুষকে ভুল বোঝানোর জন্য একটু ঝগড়া-ঝগড়া খেলে। যে কারণে সম্মিলিত ভাবে মোদী-মমতার বিরুদ্ধে প্রচার করতে হবে, সেই প্রচারই করছি।

কংগ্রেসের সঙ্গে বামফ্রন্টের একটা সমঝোতার রাস্তা তৈরি হয়েও তো ভেস্তে গেল?

আমরা দেশ জুড়ে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছি। আমরা জানি, আমাদের ক্ষমতা সীমিত, তা সত্ত্বেও আমরা ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতৃত্ব যদি একটা সমঝোতায় আসেন, সেটা খবুই ভালো। দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে যদি কেউ আসেন, সেটা ভালো। কিন্তু যদি না আসেন, তা হলে আর কী করা যাবে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আকাশে এটা একটা দুর্ভাগ্যের চিহ্ন হয়েই থাকবে।

কংগ্রেস তো বলছে, তারা সমস্ত দিক থেকেই স্বার্থত্যাগে রাজি ছিল?

আমি এটা বুঝতে পারছি না, দু’টো রাজনৈতিক দলই যদি সমঝোতা চায়, তা হলে কোনো বাধাই বাধার সৃষ্টি করতে পারে না। একটা-দু’টো আসন নিয়ে এত বড়ো একটা সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাবে, এটা ঠিক নয়। বামফ্রন্টের প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময়ই ফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু নির্দিষ্ট করে পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টের জেতা ছ’টি আসনে কোনো পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না। পাশাপাশি এখানেও দু’টি আসনে বামফ্রন্ট কোনো প্রার্থী দেবে না। এর পরেও যদি সমঝোতা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়, সেটাকে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কীই-বা বলা যেতে পারে?

গত কয়েক বছরে যাদবপুর লোকসভার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গিয়েছে, জয়ের ব্যাপারে কী ভাবছেন?

গত বার ভোটে আমাদের একটা বড়োসড়ো পরাজয় হয়েছিল ভাঙড় থেকে। আমি সে বার বামপ্রার্থীর ইলেকশন এজেন্ট ছিলাম। ফলে এ বার যদি সর্বতো ভাবে নির্বিঘ্নে ভোট হয়, তা হলে ভাঙড় থেকেই জিতব। ভাঙড়ে আরাবুল বাহিনীর বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়ে জমি জীবিকা কমিটির সদস্যরা লড়াই করেছেন, তাঁরা তাঁদের দাবি আদায় করেছেন। সরকারি ভাবেই আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। আমরা রুখে দাঁড়িয়েছি। আসলে পরিস্থিতিটা আমূল বদলে গিয়েছে। ভাঙড়ের মানুষ আর আরাবুলকে ভয় পাচ্ছে না। উলটে আরাবুল ভাঙড়ের মানুষকে ভয় পাচ্ছেন। সে দিক থেকে একটা বিশাল রাজনৈতিক এবং গুণগত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। ভাঙড়ের মানুষের সমর্থন যে কারণে বামপন্থীদের দিকেই।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন