leaders of two trinamul factions
তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর নেতা নিতাই কর ও কৃষ্ণ দাস।

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: পঞ্চায়েত যতই বিরোধীশূন্য করার চেষ্টা করুক তৃণমূল, নির্বাচনে তাদের কাছে বড়ো কাঁটা  হয়ে থাকছে গোষ্ঠীকোঁদল। শনিবার মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনেও যার সাক্ষী থাকল জলপাইগুড়ি।

এই গোষ্ঠী কাজিয়ার জের, তৃণমূলের দুই নেতার মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি, এক আদিনেত্রীর নির্দল হিসেবে ভোটে লড়ার সিদ্ধান্ত, আর বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মীদের বিজেপিতে যোগদান।

প্রথম ঘটনার সুত্রপাত সমীর দাস নামে এক তৃণমূল প্রার্থীকে কেন্দ্র করে। তিনি জলপাইগুড়ি সদর ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস ২-এর সভাপতি নিতাই করের ঘনিষ্ঠ। এ দিন তাঁকে প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দেয় তৃণমুলের এসসিএসটি সেলের জেলা সভাপতি কৃষ্ণ দাস। তাঁর অভিযোগ, সমীর দাসের পরিবার বিজেপি করে, তাই তাঁর প্রার্থী হওয়া উচিত নয়। যদিও ওই প্রার্থীর বাবা-মা নবীন দাস এবং শিবানী দাস ইতিমধ্যেই বিজেপির হয়ে মনোনয়ন জমা দিয়েও তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কিন্তু কৃষ্ণ দাস তবুও সমীর দাসকে প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ। এর পরেই কৃষ্ণ দাস এবং নিতাই করের মধ্যে বচসা শুরু হয়। এবং তা হাতাহাতিতেও পৌঁছোয়। দুই নেতার অনুগামীরা বিডিও অফিস চত্বরেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা থেকে বিশাল পুলিশবাহিনী ও র‍্যাফ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সবাইকে বিডিও অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়।

দুই নেতা পরোক্ষে নিজেদের মধ্যে কাজিয়ার কথা স্বীকারও করে নিয়েছেন। কৃষ্ণ দাস জানিয়েছেন, সমীর দাসের বাবা নবীন দাস দল সম্পর্কে কটু মন্তব্য করায় ঘটনার সূত্রপাত। নিতাই কর প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, কিছুক্ষণের জন্য ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। এ দিকে নিতাই কর জানিয়েছেন, একই পরিবারে থাকলে একটু ঠোকাঠুকি লাগে এবং তা মিটেও যায়।

আবার গোষ্ঠী কাজিয়ার জেরেই তৃণমূল নেত্রী যুথিকা রায় বাসুনিয়া এ দিন নির্দল হিসেবে তৃণমূল প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তফশিলি জাতি উপজাতি সেলের সভানেত্রীর পদ সহ দলের সমস্ত পদ থেকেও পদত্যাগ করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে দল করে আসা এই আদি তৃণমূল নেত্রী এ বারে জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদের ৮নং আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, রাজ্য নেতৃত্বের নির্দেশেই তিনি প্রার্থী হয়েছেন। যদিও ওই আসন থেকে গীতা দাস রাজবংশী নামে এক তৃণমূল নেত্রীও মনোনয়ন জমা দেন। শনিবার তাঁকেই দলীয় প্রতীকচিহ্ন দেওয়া হয়। তার পরেই ক্ষোভে পড়েন যুথিকা দেবী। সংবাদমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করে বলেন, তাঁর সভাধিপতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় জেলা সভাপতি সৌরভ চক্রবর্তী এবং সহ সভাপতি দুলাল দেবনাথের চক্রান্তের শিকার তিনি। দুলাল দেবনাথকে ‘গরুচোর’ বলেও মন্তব্য করেন যুথিকাদেবী। তাঁর দাবি, নির্দল হিসেবে লড়ে তৃণমূল প্রার্থীকে হারিয়ে দলের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন।

যদিও সৌরভ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, “রাজ্য নেতৃত্বের নির্দেশেই প্রার্থী ঠিক হয়েছে। অযথা অভিমান করে কোনো লাভ হবে না।”

এ দিকে পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়ায়  এ দিন নন্দনপুর-বোয়ালমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের  ৪০০ জন তৃণমূল নেতা-কর্মী বিজেপিতে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নন্দনপুর বুথ কমিটির সভাপতি যাত্রা রায় এবং যুব সভাপতি সজল সরকার। তাঁদের পরিষ্কার অভিযোগ, তৃণমূলে ব্যাপক গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যার জেরে ভালো প্রার্থীরা টিকিট পাচ্ছেন না। শুক্রবার রাতে এই নিয়ে বিস্তর ঝামেলাও হয়। জলপাইগুড়ির ৭নং ওয়ার্ডে তৃণমূল ব্লক কার্যালয়ে সদর ব্লক ১-এর সভাপতি হীরেন রায়কে গভীর রাত অবধি আটকে রাখে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মীরা। তাতেও সমাধান না মেলায় তাঁরা সবাই শনিবার জলপাইগুড়ি জেলা বিজেপি কার্যালয়ে এসে দলবদল করে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মত, নির্বাচনকে ঘিরে দলের অন্দরে যে ভাবে ফাটল ধরেছে, তাতে আখেরে সুবিধা পাবে বিরোধী শিবির। মুখে স্বীকার না করলেও তা ভালোই বুঝতে পারছেন জেলা নেতৃত্বও। তাই ভোটের আগে এই অন্দর-সমস্যা মিটিয়ে ফেলতেও উদ্যোগী হয়েছেন তাঁরা। জেলা সভাপতি সৌরভ চক্রবর্তী ও অন্য নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই বুথে বুথে ঘুরে কর্মীদের এক সাথে লড়াই করার বার্তা দিচ্ছেন। তবে আখেরে সেই বার্তা কতটা কাজ দেবে তা বলবে নির্বাচনের ফলাফল।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here